জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক নারী দিবস শুধু একটি প্রতীকী উদযাপন নয়, নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সমতার দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসকে স্মরণ ও প্রতিপালনের দিন। ১৮৫৭ সালের শ্রমজীবী নারীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন থেকে শুরু করে আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রায় দেড়শত বছরের পথচলায় নারীর অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও প্রকৃত অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি।
বাংলাদেশে নারী শিক্ষায়, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে ও সামাজিক পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন একাধিকবার বাংলাদেশের নারী উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের নারীর অগ্রগতি অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়ে, কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। এই অর্জন এসেছে সংগ্রামী চেতনা, অধিকার–সচেতনতা এবং নারীবান্ধব পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াসে।
তবু উন্নয়নের সমান্তরালে উদ্বেগজনক এক বাস্তবতা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর সামপ্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে গত ছয় মাসে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, আত্মহত্যা ও পারিবারিক সহিংসতার বহু ঘটনা। পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে এক একটি দুঃস্বপ্ন ও ভয়াবহ কঠিন বাস্তবতা, বেদনার্ত পরিবার, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন, আতঙ্কিত ভবিষ্যৎ। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময়গুলোতে নারীর ওপর সহিংসতা যে হারে বাড়ে এমন নির্মম বাস্তবতাও আমরা বহুবার প্রত্যক্ষ করেছি। আতংকিত হই এমন অনিরাপদ পরিবেশে আমাদের কন্যারা কীভাবে নির্ভয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করবে? রাজনীতি আর ধর্মের যাঁতাকলে বারবার নারীজাতিকে পিছিয়ে দেওয়ার মানসিকতা আর অধিকার বঞ্চিত করার গভীর ষড়যন্ত্রে নারীর এগিয়ে যাবার বাধা কোন সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। নারীদের একতাবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম, সোচ্চার ও সচেতন হওয়ার কোন বিকল্প নেই।
সমাজ নারী–পুরুষের সমন্বয়ে গঠিত। এক পক্ষকে পিছিয়ে রেখে অন্য পক্ষের একক উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না। সুযোগ ও যত্ন সমানভাবে নিশ্চিত হলে নারী–পুরুষ উভয়েই হয়ে উঠতে পারে দক্ষ মানবসম্পদ। সামপ্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নারীর সক্ষমতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখা গেছে। মহাকাশ মিশনে অংশ নিয়ে দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে দায়িত্ব পালন শেষে মার্চ মাসে পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তনের কথা রয়েছে নভোচারী সুনীতা উইলিয়াম ও বুচ উইলমোর। তাঁদের সাফল্যে সহজে অনুমেয় হয় সুযোগ পেলে নারী অসম্ভবকে সম্ভব করতে জানে।
শিক্ষাই ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রধান চাবিকাঠি। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে মানবিক, সহনশীল ও ন্যায়বোধসম্পন্ন করে। আমাদের যুবসমাজ যদি রাজনীতি ও সমাজ–পরিবর্তনের প্রশ্নে যৌক্তিক ও নৈতিক অবস্থানে অটুট থাকে, তবে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা কঠিন নয়। নারীর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নিরাপদ চলাচল, কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ ও আইনের কঠোর প্রয়োগ এসব নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিক সকলের সমন্বয় প্রয়োজন। নারী কেবল মমতাময়ী মাতা বা প্রেমিক সঙ্গী নন। নারী একজন সাহসী, সৃষ্টিশীল, নেতৃত্ববান ও সংগ্রামী এক মানবিক সত্তা। দায়িত্ব পেলে নিষ্ঠা ও সততায় তা পালন করার অসংখ্য উদাহরণ ইতিহাসে বিদ্যমান। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার থেকে নানা আন্দোলন সংগ্রামে, নেতৃত্বে, রাষ্ট্র পরিচালনায় ও মহাশূন্যে এককথায় সীমান্ত পাহারা থেকে এভারেস্ট শৃঙ্গে আরোহনে সকল পেশাগত দায়িত্বে নারীর সাফল্য অভাবনীয়। তাই নারীকে ক্ষুদ্র না ভেবে নারী–পুরুষ সমান সুযোগে মানবসম্পদে রূপান্তরিত করার নিরপেক্ষ দূরদর্শী পরিকল্পনায় জাতিকে সমৃদ্ধ করা ব্যতীত আর কোন বিকল্প পথ নেই। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রচিন্তায় নারীর বহুমাত্রিক অবদান বাঙালি জাতিকে সমৃদ্ধ করেছে। কথায় আছে, ‘রাজা রাজ্য শাসন করেন, কিন্তু রাজাকে শাসন করেন রানীমাতা’– এমন বহু প্রাচীন প্রবাদে নারীর প্রজ্ঞা, গ্রহণযোগ্যতা, স্বীকৃতি ও সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষমতা পরিলক্ষিত হয়।
২০২৬ সালের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো– ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’– এটা শুধু স্লোগান নয়, প্রয়োজন বাস্তব প্রয়োগ। ৮ই মার্চকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করে অন্তত একদিন সারাদেশে প্রান্তিক নারীদের অংশগ্রহণে আলোচনা, সভা, সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিনটির ইতিহাস, তাৎপর্য ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ নিয়ে খোলামেলা আলাপ–আলোচনা সামাজিক পরিবর্তনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার ঘটতে পারে।
আজকের কন্যাশিশুই আগামী দিনের মাতা, পেশাজীবী, জননেতা, জনপ্রতিনিধি ও নীতি–নির্ধারক। শিক্ষিত ও সচেতন মা একটি শিক্ষিত জাতি গঠনের ভিত্তি রচনা করবেন। তাই নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং মন মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠবে সহিংসতামুক্ত, মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ সমাজ।
আসুন, নারী–পুরুষ নির্বিশেষে সচেতন ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, অধিকার ও সমতার প্রশ্নে আর কোন আপোস নয়। নারী নিরাপদ, সম্মানিত, ক্ষমতাবান হলে তবেই জাতি সত্যিকার অর্থে উন্নত ও মানবিক হয়ে উঠবে। এভাবেই সমাজের সর্বত্রই সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার। বিশ্ব নারী দিবসে সকল নারী‘র প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন, শুভেচ্ছা ও অসীম ভালোবাসা।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও এনজিও কর্মী










