ইউক্রেনের আকাশে ভয় ধরানো শাহেদ ড্রোন এবার মধ্যপ্রাচ্যেও রাজত্ব করবে?

| বৃহস্পতিবার , ৫ মার্চ, ২০২৬ at ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ

কর্কশ শব্দের, ত্রিভুজাকৃতির ডানাবিশিষ্ট ৫০ হাজার ডলারের ইরানি শাহেদ ১৩৬ ড্রোন অনেকদিন ধরেই ইউক্রেনের আকাশে রাজত্ব করে আসা এক অনাকাঙ্ক্ষিত মারণাস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্রইসরায়েলের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক মিত্রদের ভয় দেখাতে, যুদ্ধের কষ্টের বোঝার ভাগ নিতে তেহরানের চেষ্টার মধ্যে গত চার দিনে এই বিশেষ অস্ত্রই আছড়ে পড়েছে বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে। খবর বিডিনিউজের।

বাইরাইনের এক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ত্রিভুজাকৃতির ডানাবিশিষ্ট একটি ড্রোন রাতে একটি বহুতল ভবনের দিকে উড়ে যাচ্ছে, ভবনে ভয়ঙ্কর আঘাত হানার আগে এর ইঞ্জিন থেকে ঘাস কাটার মেশিনের মতো কর্কশ শব্দও শোনা যায়; পরে বারান্দার জানালার ওপর জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষ পড়তে দেখা যায়। সরাসরি আঘাত হানলে ওই অ্যাপার্টমেন্টটির টিকে থাকার সুযোগ ছিল না।

শনিবার তেহরানে ইসরায়েলযুক্তরাষ্ট্র হামলা শুরুর পর গত কয়েকদিনে ইরান প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে এ ধরনের হাজারো ড্রোন পাঠিয়েছে, যার সিংহভাগই এমন কমদামি শাহেদ ১৩৬ বলে মনে করছে গার্ডিয়ান।

সোমবার বিকালে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, ইরান তাদের দিকে ৬৮৯টি ড্রোন ছুড়েছিল, যার মধ্যে ৬৪৫টিকে তারা ভূপাতিত করতে পেরেছে। অর্থ্যাৎ, ৪৪টি বা নিক্ষিপ্ত ড্রোনের ৬ শতাংশের সামান্য বেশি লক্ষ্যে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে।

সাড়ে তিন মিটার দৈর্ঘ্যের শাহেদ ১৩৬ ড্রোনের পাখার বিস্তার আড়াই মিটার। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে তুলনা করলে এটি দামে অনেক সস্তা, বানাতেও কষ্ট কম হয়। ইরান সাধারণত বছরে কয়েক ডজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বানাতে পারে, অন্যদিকে এ ধরনের ‘কামিকাজি’ বা আত্মঘাতী ড্রোন বানাতে পারে দিনেই কয়েকশ। অর্থাৎ, সামনের দিনগুলোতেও যুক্তরাষ্ট্রইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে এটাই ইরানের প্রধান হাতিয়ার হতে পারে।

বেশিরভাগ শাহেদ ১৩৬ই তুলনামূলক ধীরগতিতে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়। অবশ্য দ্রুতগতির ইঞ্জিনবিশিষ্ট শাহেদ ড্রোনের অন্য সংস্করণও ইউক্রেইনে দেখা গেছে। এগুলো ৫০ কেজির মতো বিস্ফোরক বহন করতে পারে। এ দিয়ে সুউচ্চ ভবনকে ধসিয়ে দেওয়া না গেলেও ব্যাপক ক্ষতি করা সম্ভব। কিন্তু তাদের কর্কশ শব্দ, বিশাল বপু এবং শেষ মুহূর্তে খাড়া নেমে আসা সহজেই আতঙ্ক সৃষ্টি করতে সক্ষম।

বাহরাইনের আরেকটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ত্রিভুজাকৃতি ডানার একটি ড্রোন মার্কিন পঞ্চম নৌবহর যে ঘাঁটিতে অবস্থিত তার ওপর দিয়ে অবাধে উড়ছে; এরপর সব বাধা সফলভাবে টপকে তীব্র গতিতে নিচে নেমে এসে সেটি একটি রেডারের গম্বুজ চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। কুয়েতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতেও শাহেদ আঘাত হেনেছে। সাইপ্রাসে ব্রিটিশ বাহিনীর ঘাঁটিতে যে ড্রোনটি আঘাত হেনেছে সেটিকেও শাহেদ ১৩৬ বলা হচ্ছে। এগুলোর পাল্লা সর্বোচ্চ দুই হাজার কিলোমিটার, জটিল উড়ালপথ অতিক্রমে সক্ষম প্রোগ্রাম করে দেওয়া হয়, শত্রুপক্ষের রেডার এড়াতে এরা যতটা সম্ভব নিচ দিয়ে উড়ে যায়। এগুলো সম্ভবত দূর থেকেও নিয়ন্ত্রণ করা যায় বলে ইউক্রেইন যুদ্ধ থেকে আন্দাজ মিলছে; সেরকম হলে দূরে বসে থাকা চালক একেবারে শেষ মুহূর্তেও এর লক্ষ্য বদলে দিতে পারেন।

গত দশকের শেষদিকে ইরান এই শাহেদ ১৩৬ ড্রোনগুলো বানাতে সক্ষম হয়। প্রথম এর উপস্থিতি ধরা পড়ে ২০২১ সালের জুলাইতে, ইসরায়েলি মালিকানাধীন তেলের ট্যাংকার মের্সের স্ট্রিটে হামলায়। ওই হামলায় এক ব্রিটিশ ও এক রোমানিয়ার নাগরিক নিহত হন।

সৌাদ আরবের আবকাইক ও খুরাইসে হামলায়ও এগুলো ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে বলে অনেকে মনে করেন। তবে শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ রিসার্চ সেন্টারের বানানো এ ড্রোনগুলো বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায় ২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেইন যুদ্ধে সেগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার শুরু করার পর। শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ রিসার্চ সেন্টারটি ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর (আইআরজিসি) একটি শাখা প্রতিষ্ঠান।

রাশিয়া চাওয়ার পর ইরানে প্রথমে তাদেরকে বিপুল পরিমাণ এ ড্রোন রপ্তানি করেছিল; পরে তারা তাদের ড্রোনের নকশাই রাশিয়াকে দিয়ে দেয়, যা রাশিয়াকে ভোলগা নদীর তীরে ইয়েলাবুগাতে একটি কারখানায় বিপুল সংখ্যক সস্তা ড্রোন বানানোর সুযোগ করে দেয়।

ইউক্রেইনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনাকে ব্যস্ত রাখতে রাশিয়া সাধারণত ঝাঁক বেধে একসঙ্গে ৮০০টি পর্যন্ত শাহেদ ড্রোন এবং সামান্য পরিমাণ ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। এতে প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সহজে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু এ সপ্তাহে উপসাগরের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া একাধিক শাহেদ ড্রোনকে ঝাঁক বেধে যাওয়ার বদলে একলা একলা উড়তে ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা অতিক্রম করে লক্ষ্যে আঘাত হানতে দেখা গেছে।

ইউক্রেনে শাহেদ ড্রোনকে স্থির নিশানায় আঘাত হানার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সফল হতে দেখা গেছে। যে কারণে রাশিয়া এগুলো দিয়ে ইউক্রেইনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে লাগাতার আঘাত হানতে পেরেছে। যার প্রভাবে শীতকালে অনেক এলাকায় লাখ লাখ মানুষকে বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় ঠাণ্ডায় দিন কাটাতে হয়েছে।

ইরানও সম্ভবত ওই সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে সোমবার সকালে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার রাস তানুরায় আঘাত হেনেছে। ড্রোনের আঘাতে আগুন ধরে যাওয়ার পর ওই শোধনাগার বন্ধ করে দিতে হয়। ধ্বংসক্ষমতা একই ধরনের হওয়ার পরও সেখানে আঘাত হানা ড্রোনটি শাহেদ কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

ইরানই সেখানে হামলা চালিয়েছে কিনা তা নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। তেহরান সমপ্রতি বলেছে, উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুদ্ধে জড়াতে ইসরায়েলই বিভিন্ন তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ইরানকে দায় দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ‘ই-হেলথ’ কার্ড চালুর নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর
পরবর্তী নিবন্ধশাহসুফি আমানত খান (রহ:) দরগাহ শরীফে মাহে রমজানের বিশেষ আলোচনা ও ইফতার মাহফিল