ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলে অর্থনীতির গতিচিত্র বদলে যাবে

| বুধবার , ১৭ জুন, ২০২৬ at ৮:১৮ পূর্বাহ্ণ

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের বেকারত্ব দূরীকরণ এবং অর্থনীতির চাকা আরও গতিশীল করতে আসন্ন ২০২৬২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, দেশের যুবসমাজকে উৎপাদনশীল কর্মে যুক্ত করা, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একাধিক কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তি খাতের আধুনিকায়ন থেকে শুরু করে গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ সবক্ষেত্রেই রাখা হয়েছে বিশাল কর্মযজ্ঞের রূপরেখা। এই মহাপরিকল্পনার আওতায় একদিকে যেমন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালুর মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে, অন্যদিকে ‘প্রবাসী কার্ড’ প্রবর্তনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হচ্ছে প্রবাসী শ্রমিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। অর্থনীতিবিদদের মতে, তৃণমূল থেকে বৈশ্বিক পর্যায় পর্যন্ত সাজানো সরকারের এই সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ দেশের শ্রমবাজারের চেহারা বদলে দিতে একটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, এসএমই খাতের বিকাশ ও উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে সহজ শর্তে ঋণ বিতরণের জন্য ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকারের আশা, এই তহবিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সমপ্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের ধারাবাহিকতায় ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে প্রযুক্তি খাতকে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের হাইটেক পার্কগুলোতে ১৫ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সার্বিক প্রযুক্তি খাতে আরও ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা দেশের শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণদের জন্য এক বিশাল সুযোগ সৃষ্টি করবে। তরুণদের আত্মকর্মসংস্থান ও বৈদেশিক আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে ফ্রিল্যান্সিং এবং অনলাইন মার্কেটিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে অর্থ বিভাগের অধীন চলমান কর্মসূচি স্কিলস ফর ইন্ডাস্ট্রি কম্পিটেটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশনস প্রোগ্রামের (এসআইসিআইপি) কর্মসূচির আওতায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে উচ্চ দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি ১২ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রযুক্তি খাতে নতুন ২ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা যুক্ত হলে মোট সম্ভাব্য কর্মসংস্থান দাঁড়ায় ১৪ লাখে। এছাড়া নতুন শিল্প পার্ক ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা তহবিল, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন পদক্ষেপ এবং বিভিন্ন শিল্প খাতে করশুল্ক ছাড়ের মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সরকারের আশা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অন্তত ২৫ লাখ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং ঋণনির্ভরতা কেটে অর্থনীতিতে স্বনির্ভরতা বাড়বে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথমত কর্মসংস্থানের সঙ্গে শিক্ষার মানের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। যে শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি দিচ্ছে, তা কর্মবাজারের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। ফলে বিপুলসংখ্যক তরুণ স্নাতক হয়েও এমন দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না, যা দিয়ে তাঁরা চাকরি পেতে পারেন। দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থানের দিক থেকে অঞ্চলভেদে ব্যাপক বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। তাঁরা বলেন, আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর উপায় হচ্ছে যথেষ্ট পরিমাণে কর্মসংস্থান বাড়ানো। আর এ জন্য প্রয়োজন নতুন বিনিয়োগ। বিনিয়োগের মাধ্যমে যেমন ব্যবসা ও শিল্প গড়ে ওঠে, তেমনি কাজের সুযোগও তৈরি হয়। তাতে মানুষের ভোগ বাড়ে, গতি আসে অর্থনীতিতে। তাই আগামীতে কর্মসংস্থান তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

তাঁরা বলেন, বেকারত্ব দূর করতে হলে অবশ্যই নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। সেজন্য বিনিয়োগের আরও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা একান্ত প্রয়োজন, জ্বালানি সংকট দূর করা ও অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। বিশেষত বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য এই দুটি ক্ষেত্রের উন্নতি সাধনের বিকল্প নেই। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দক্ষ ও শিক্ষিত শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। এভাবেই বেকার সমস্যা মোকাবিলার চেষ্টা করতে হবে। কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থায় বিশেষভাবে জোর দিলেই দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব হবে। দেশব্যাপী ও প্রবাসের মাটিতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিচিত্র বদলে যাবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে