নতুন সম্ভাবনা নিয়ে নতুন সরকারের যাত্রা ও নতুন পরিপ্রেক্ষিত

নেছার আহমদ | মঙ্গলবার , ৩ মার্চ, ২০২৬ at ৬:৪৫ পূর্বাহ্ণ

দেশের ১৩ তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই সঙ্গে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্যরাও শপথ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী এবং তার মন্ত্রীসভার সদস্যদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। জন আকাঙ্ক্ষার নতুন বাংলাদেশ গড়তে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাক। সেটাই জনগণ প্রত্যাশা করে।

বাংলার জনগণ স্বাধীনতার পর থেকে স্বপ্নের জাল বুনছে। কিন্তু বুনন যেন আর শেষ হয়না। সরকার পরিবর্তনে আশা বাঁধে এই বুঝি সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় জনবান্ধব ব্যবস্থা কায়েম করবে কিন্তু চাহিদা ও জোগানে বিস্তার ফাঁক থেকে যায়। এবার একটা বিপ্লবোত্তর নির্বাচনের সরকার, ফলে প্রত্যাশা ও দায়বদ্ধতাও ব্যাপক। সবচেয়ে বড় কথা সরকার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে সঠিকভাবে অগ্রগতি করতে না পারলে দেশ পিছিয়ে যাবেএ ভাবনা নিশ্চয়ই সরকারের মাঝে জাগরুক থাকবে। ইতিমধ্যে নতুন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ‘বিজয়ীর কাছে পরাজিতরা নিরাপদ থাকলে আনন্দ মহিমান্বিত হয়।’ এতটুকু সহনশীলতা থাকলে উন্নয়নের সোপানে সবার অংশগ্রহণের পথ সুগম হয়। এ সুগমতা আমাদের এসডিজিরও একটা অন্যতম লক্ষ্য। রাষ্ট্র পরিচালনায় অনিয়ম, দুর্নীতি, দায়হীনতা ও সংঘাতের রাজনীতি অনেক হয়েছে। ১৯৭১ এ রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা অর্জনের জিম্মাদারি শহীদের রক্তের দলিলে আমাদের মনোভূবনে উৎকীর্ণ হয়ে আছে, এখন সবাই মিলে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। এটা কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটা ভবিষ্যতের জন্য এক পথ নির্দেশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ক্ষমা করে এবং ক্ষমা নিয়ে হাত ধরে পরস্পর এগিয়ে যাওয়াই উত্তম। রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা থাকবে। রণকৌশল থাকবে কিন্তু কুটকৌশল ও সংঘাতের পথকে পরিহার করা উচিত। যেকোন উপায়ে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা পরিহার করে অতীতের ভুলত্রুটি বিশ্লেষণ করেই কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যয় বিএনপি একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে মুসলমান এবং মুসলমানের মধ্যে সকল দলউপদল, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, পাহাড়ি, সমদলীয়দের পাশে সংশয়বাদী ও অবিশ্বাসীদের জন্যও নিরাপদ বাংলাদেশের কথা বলে দলের একটা বড় দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেছেন। এবার তা বাস্তবায়নের পথ দেখবে জনগণ। এসব দেখার জন্য সরকারকেও সময় দিতে হবে। সব সময় চাপে তাপে রাখলে সরকারের উন্নয়ন কর্ম বাধাগ্রস্ত হয়। এ বিষয়টিও দায়িত্বশীলতার বিষয়। জনগণ চায় সে পথটা উদার, সহনশীল ও গণকল্যাণকামিতায় যেন ভাস্বর হয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের সময়কালে মব সন্ত্রাস সংক্রামক হয়ে উঠেছিল। আমরা দেখেছি নিরীহ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে গুজব সৃষ্টি করে। বাউল সম্প্রদায়, ভিন্নমতালম্বী ব্যক্তি কিংবা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, মুক্তিযোদ্ধাদেরকেও হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। রাজবাড়িতে কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটেছে। দেশের বড় দু’টি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা অফিসে হামলা, ভাংচুর, অগ্নি সংযোগের ঘটনায় গণমাধ্যমের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আরও লক্ষ্য করা গেছে দাবিদাওয়া আদায়ের নামে রাজপথ দখল করে জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলেছে নিয়মিত। অর্থের বিনিময়ে হয়রানিমূলক মামলা বা গ্রেফতার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের চর্চা আইনের শাসনকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, গত দুই বছরে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনায় নিহত ও আহতদের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বঞ্চিত মানুষের ক্ষোভ যাতে সহিংসতায় না পৌঁছায় সেজন্য মানবাধিকার ও সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সরকারকে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতেও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আশা করছি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা ‘মব সন্ত্রাস’ নির্মূলে ভালো বার্তা দেবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। দেশ গঠনে নতুন সরকারের সামনে সবার আগে যে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, তা হলো অর্থনীতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনকে নাকাল করে তুলেছে। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, কর্মসংস্থানের সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ব্যাংক খাতের অনিয়মসবকিছু এক সঙ্গে সামাল দেওয়া কোনো সহজ কাজ নয়।

বিনিয়োগ পরিবেশ ও ব্যবসায়িদের মাঝে যে আস্থা সংকট সৃষ্টি হয়েছে সেই আস্থার সংকট কাটিয়ে আস্থার পুনর্গঠন করতে হবে। বিনিয়োগ পরিবেশ ও শিল্প বিনিয়োগের আস্থার সংকট দূর করার জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জ্বালানি সংকটের সমাধানও গ্যাস সংযোগ প্রক্রিয়া সহজীকরণের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বার্তা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। দেশে গ্যাস সংকটের দেড় দশকে নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো, এলএনজি আমদানির নতুন অবকাঠামো তৈরি, দুর্নীতি ও গ্যাস চুরি রোধ ও গ্যাসের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা। গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে না পারলে মানুষের ভোগান্তি যাবে না। শিল্পখাতে গ্যাস না পেলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাঁধা তৈরি হবে এবং নতুন সরকারের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য পূরণ ও সম্ভব হবে না। গ্যাসের সংকট নতুন নয়। সময়ে সময়ে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে। সংকট কাঠানোর কথা বলে আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যা অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। বড় অংকের দেনার মুখে পড়েছে দেশ। কিন্তু গ্যাস সংকট কাটেনি। শিল্পে গ্যাস সংযোগ খুবই জরুরি। জরুরিভাবে শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রকৃত অর্থ ব্যবহৃত হতে এক বছর সময়ের প্রয়োজন হয়।

বিএনপি সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। জনগণ এবার শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, শাসনের চরিত্র পরিবর্তন দেখতে চায়। প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের ব্যবধান যদি কমানো না যায় তবে জনপ্রত্যাশা খুব দ্রুত হতাশায় রূপ নেবে। সরকারের সফলতা নির্ভর করবে তারা ক্ষমতাকে কতটা দায়িত্ব হিসেবে নিতে পারে আর কতটা দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রকে অগ্রাধিকার দেয় তার উপর। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার দিকে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। দেশকে বিভাজন না করে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে। সকল রাজনৈতিক দল মত সকলকে মত প্রকাশ ও অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। আমাদের দেশে দুর্নীতি ও দলীয়করণ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা। উন্নত রাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও নজরদারি থাকায় উন্নয়ন প্রকল্প বা সামাজিক প্রতিশ্রুতি নির্দিষ্ট লক্ষ্যেই ব্যয় হয়। বাংলাদেশে সে জায়গায় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনেক প্রতিশ্রুতিই পথে হারিয়ে যায়। জনগণের জন্য ঘোষিত কর্মসূচি অনেক সময়ই দলীয় স্বার্থ বা ব্যক্তিগত লাভের যন্ত্রে পরিণত হয়। ফলে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বদলে তৈরি হয় আস্থাহীনতা, নতুন সরকারকে বিভিন্ন ধরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। বিভিন্ন সেক্টরে যেভাবে অন্তর্বর্তীকালিন সরকার আস্থাহীনতার পরিবেশ তৈরি করেছে সে অবস্থার পরিবর্তন করে জনগণের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করতে হবে। ব্যাংকিং সেক্টরে যে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষের জীবিকার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে তা ফিরিয়ে দিতে হবে।

সর্বোপরি নতুন সরকারের নতুন সময়ে নতুন প্রভাতের দিকে লক্ষ্য রেখে দেশের অর্থনীতিতে গতি ফিরে আসুক, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাক, শিল্পে বিনিয়োগের পরিবেশ সহজ হোক, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করে বেকারত্বের অভিশাপ হতে জনগণ মুক্তিপাক এ প্রত্যাশা করছি।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট; সম্পাদকশিল্পশৈলী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবৃদ্ধাশ্রম নয়, ঘরই হোক বাবা-মায়ের শ্রেষ্ঠ স্বর্গ
পরবর্তী নিবন্ধপাঠের অবারিত উৎসের সঙ্গে পাঠককে যুক্ত রাখা জরুরি