প্রায় ছয় দশক পর চট্টগ্রাম মহানগরীতে নতুন করে দুটি সরকারি স্কুল ও কলেজ চালু হতে যাচ্ছে। নগরীর পূর্ব পতেঙ্গা ও উত্তর পতেঙ্গায় নির্মাণাধীন শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং মাস্টারদা সূর্যসেন সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠান দুটির ভবনের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটিতে দুজন শিক্ষক পদায়ন করা হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংকটে থাকা পতেঙ্গা ও আশপাশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন দুয়ার খুলতে যাচ্ছে সরকারি শিক্ষা। প্রতিষ্ঠান দুটিতে প্রয়োজনীয় আসবাব আসতে শুরু হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় ফার্নিচারগুলো রাখতে সমস্যা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠান দুটিতে নিয়োগ পাওয়া দুজন শিক্ষক ইতোমধ্যে ঢাকার মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে (মাউশি) গিয়ে নিজেদের সংকটের কথা জানিয়ে এসেছেন।
সূত্রে জানা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘৯টি সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ স্থাপন প্রকল্পের’ আওতায় নির্মিত হচ্ছে চট্টগ্রামের এই দুটি প্রতিষ্ঠান। প্রায় ৪৪৬ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের পুরো প্রকল্পটি ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে ‘৯টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প’ হিসেবে শুরু হয়। পরে ২০২২ সালে এর নাম পরিবর্তন করে ‘৯টি সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ স্থাপন প্রকল্প’ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম ছাড়াও রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, জয়পুরহাট ও মৌলভীবাজারে নতুন সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের দুটি প্রতিষ্ঠানেই ১০ তলা ভবন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৪০০ শিক্ষার্থীর পড়াশোনার সুযোগ থাকবে। আধুনিক অবকাঠামো ও শিক্ষা উপকরণ দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। থাকবে আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, আইসিটি ল্যাব, বিজ্ঞানাগার, লাইব্রেরি, সেমিনার হল, মাল্টিপারপাস হল, নামাজের কক্ষ, মিড–ডে মিল কক্ষ ও প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্র। ইন্টারনেট সুবিধা, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর এবং খেলাধুলার সরঞ্জামও থাকবে। এছাড়া শিক্ষক কমনরুম, শিক্ষার্থী কমনরুম, দর্শনার্থী কক্ষ, বিএনসিসি কক্ষ, গার্লস গাইড কক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের কক্ষ, অফিস কক্ষ, স্টোর, লিফট ও টয়লেট ব্লকের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রচলিত সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তুলনায় তুলনামূলকভাবে পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস হিসেবেই প্রতিষ্ঠান দুটি গড়ে তোলা হচ্ছে।
নগরীতে সর্বশেষ নতুন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। এরপর ১৯৭৪ ও ২০১৭ সালে দুটি বেসরকারি বিদ্যালয় সরকারিকরণ করা হলেও নতুন করে কোনো সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। ফলে প্রায় ছয় দশক ধরে নগরীর জনসংখ্যা, আবাসিক এলাকা ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও নতুন সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা কার্যত বাড়েনি।
এই দীর্ঘ সময়ে নগরীর জনসংখ্যা ও নগরায়নের চিত্র আমূল বদলে গেছে। বিশেষ করে পতেঙ্গা, হালিশহর, ইপিজেড, বন্দরসংলগ্ন এলাকা ও দক্ষিণ–পশ্চিম চট্টগ্রামে আবাসিক ও শিল্পাঞ্চল সম্প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সুযোগ সেভাবে বাড়েনি। ফলে সরকারি স্কুলে ভর্তির জন্য শিক্ষার্থীদের নগরীর অপেক্ষাকৃত দূরের এলাকাগুলোতে যেতে হয়। নতুন দুটি প্রতিষ্ঠান সেই চাপ কিছুটা কমাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
পতেঙ্গায় শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজটি পূর্ব পতেঙ্গায় এবং মাস্টারদা সূর্যসেন সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজটি উত্তর পতেঙ্গায় নির্মিত হয়েছে। এতদিন পতেঙ্গা এলাকায় সরকারি স্কুল না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পতেঙ্গায় একসাথে দুটি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল আজীজ বলেন, এলাকাটিতে সরকারি স্কুলের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। সরকার ঘনবসতিপূর্ণ বিস্তৃত এলাকার কথা বিবেচনা করেই ওখানে প্রতিষ্ঠান দুটি গড়ে তোলে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শুরুতে জমি সংকট ছিল প্রকল্প বাস্তবায়নের বড় বাধা। নগরীতে একসঙ্গে বড় আকারের জমি পাওয়া কঠিন হওয়ায় নতুন সরকারি স্কুল স্থাপনের জন্য উপযুক্ত জায়গা নির্বাচন করতে সময় লেগেছে। পরে পতেঙ্গায় জায়গা নির্ধারণ করা হয়। জমি নির্বাচন ও অন্যান্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সময় ব্যয় হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। করোনাকালেও প্রায় দুই বছর প্রকল্পের কাজ থমকে ছিল। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পের মূল মেয়াদ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল। পরে এক বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।
২০২৬ সাল থেকে এই দুটি প্রতিষ্ঠানে পাঠদান শুরু করার কথা থাকলেও নির্মাণকাজ ও আনুষাঙ্গিক কার্যক্রম সময়মতো শেষ না হওয়ায় তা পিছিয়ে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষকে লক্ষ্য করা হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিষ্ঠান দুটিতে পাঠদানের উপযোগী করে ফেলা হবে বলে সূত্র জানিয়েছে।
ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠান দুটির জন্য চট্টগ্রাম মুসলিম হাই স্কুল এবং সন্দ্বীপ থেকে মোহাম্মদ সাইফুল আজম ও মোহাম্মদ মজিবুর রহমান নামে দুজন শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। অবকাঠামোগত নির্মাণ প্রায় শেষ। এখন একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রতিষ্ঠান দুটিতে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল আজীজ।
প্রতিষ্ঠান দুটিতে শুধুমাত্র দুজন শিক্ষক পদায়ন করা হয়েছে। এছাড়া কোনো স্টাফ দেওয়া হয়নি। গত কয়েকদিন ধরে ফার্নিচার আসতে শুরু করেছে। এসব ফার্নিচার পাহারা দেওয়ার মতো লোকবল নেই। এছাড়া শিক্ষক ও অন্যান্য জনবল নিয়োগ, ভর্তি নীতিমালা, শ্রেণি কার্যক্রমের পরিধি এবং কোন শ্রেণিতে প্রথমবার শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে এসব বিষয় নিয়ে কাজ চলছে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে। বিভিন্ন সরকারি স্কুল ও কলেজ থেকে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও অন্যান্য লোকবল পদায়ন করা হতে পারে বলে সূত্রটি জানায়।
নগরে সরকারি স্কুল ও কলেজের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে সরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজে ভর্তিকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। নতুন দুটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ চালু হলে সেই চাপ কিছুটা কমে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
নতুন দুটি প্রতিষ্ঠানের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, বিজ্ঞান ও আইসিটি ল্যাব সচল রাখা, লাইব্রেরি কার্যকর করা, সহশিক্ষা কার্যক্রম চালু করা এবং নিয়মিত একাডেমিক তদারকি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে স্থানীয়রা।












