ফটিকছড়ি ও ভূজপুর থানার লাখো মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন অবশেষে আলোর মুখ দেখছে। হালদা নদীর বুকে দাঁড়াচ্ছে ‘পাঁচপুকুরিয়া সিদ্ধাশ্রম হালদা সেতু’। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই সেতুর নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে ৬৫ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। যেখানে বর্ষাকালে নৌকা আর গ্রীষ্মকালে বাঁশের সাঁকো ছিল যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম, সেখানে এখন মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে বিশাল ও দৃষ্টিনন্দন হালদা সেতু।
এ সেতু নির্মাণের ফলে সুন্দরপুরের সাথে নাজিরহাট পৌরসভা এবং সুয়াবিলবাসীর সেতুবন্ধনের পাশাপাশি নদীর পশ্চিম তীরের হারুয়ালছড়ি ইউনিয়ন ও পূর্ব তীরের ফটিকছড়ি পৌরসভা এবং উপজেলা সদরের সঙ্গে দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগ আরও সহজ হবে। সেতুটির পূর্ব পাশে চট্টগ্রাম–খাগড়াছড়ি সড়ক এবং পশ্চিম পাশে চট্টগ্রাম নাজিরহাট–কাজিরহাট–হেয়াকো সড়ক। সেতুটি নির্মিত হলে সিদ্ধাশ্রম সড়কটি সরাসরি সংযুক্ত হবে এ দুই আঞ্চলিক সড়কের সাথে। এতে করে হালদার দুই পাশের এলাকার মানুষের যাতায়াতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। দূরত্ব কমে যাবে প্রায় ১৫ কিলোমিটার।
নকশা জটিলতা, ভূমি অধিগ্রহণ এবং ওয়ার্ক অর্ডার সংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় শুরুর দিকে প্রকল্পটির কাজ প্রায় এক বছর বিলম্বিত হয়। তবে এখন দ্রুতগতিতে চলছে ৪৬ কোটি টাকায় নির্মিতব্য এ সেতুর কাজ। প্রকল্পের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান তাহের এন্ড ব্রাদার্স লিমিটেডের প্রজেক্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ শাহীনুল ইসলাম জানান, ২৪০.৪ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৯.৮ মিটার প্রস্থের এই সেতুর মূল ৮টি পিলারের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। আগামী ৫–৬ মাসের মধ্যে বাকি ৩৫ শতাংশ কাজ শেষ করে সেতুটি চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া সম্ভব হবে।
প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী, সেতুর সাথে মোট ৫০০ মিটার (৩৫০+১৫০ মিটার) অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণ করা হবে। তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী জনগণের দাবি–সেতুটির প্রকৃত সুফল পেতে হলে এই সংযোগ সড়কটিকে সরাসরি প্রধান সড়ক পর্যন্ত বর্ধিত করা প্রয়োজন। প্রজেক্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ শাহীনুল ইসলাম জানান, কারিগরি পরিকল্পনা অনুযায়ী সেতুর মূল অবকাঠামো ও পুরো কাজ শেষ হওয়ার পরপরই সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।
সেতুর কাজের মান ও অগ্রগতি নিয়ে ফটিকছড়ি উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) জুনায়েদ আবছার জানান, হালদা নদীর ওপর নির্মিতব্য পাঁচপুকুরিয়া সিদ্ধাশ্রম হালদা সেতুটির কাজ নিখুঁত ও টেকসইভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সেতুর সবগুলো পিলারের কাজ শেষ হয়েছে। ৬৫ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন। এখন শুধু নদীর মাঝের অংশে ৯০ মিটার স্ল্যাবের কাজ বাকি। এটি জটিল এবং ঝুকিপূর্ণ, তাই নদীর পানি একদম কমে গেলে কাজটি সম্পন্ন করা হবে।
তিনি বলেন, স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে সংযোগ সড়কটি প্রধান সড়ক পর্যন্ত বর্ধিত করার যৌক্তিকতা অনুধাবন করে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে জনগণের সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
স্থানীয় কৃষক সোহেল বলেন, হালদা নদীর এপারে আমাদের উৎপাদিত ফসল ও শাকসবজি বাজারে নিতে হয় দ্বিগুণ টাকা খরচ করে। অনেক সময় সঠিক সময়ে বাজারে পৌঁছাতে না পারায় আমাদের ফসল নষ্ট হয়ে যেত এবং লোকসান হতো। এই ব্রিজটি চালু হলে আমরা সরাসরি গাড়ি দিয়ে কম সময়ে, কম খরচে সবজি বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে পারব এবং ফটিকছড়ির সাথে যাতায়াত সহজ হবে। এটি আমাদের ভাগ্যই বদলে দেবে।
স্থানীয় নুরুল আবছার নুরী বলেন, সেতুটি ফটিকছড়ি ও ভূজপুর এলাকার যাতায়াত ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটাবে। এটি শুধু ১৫ কিলোমিটার পথই কমাবে না, বরং দুটি বৃহৎ অঞ্চলের অর্থনীতিকে এক সুতোয় বাঁধবে। তবে সেতুটির পূর্ণাঙ্গ সুবিধা ভোগ করতে হলে সংযোগ সড়ককে আরও বর্ধিত করে প্রধান সড়কের সাথে সংযুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
সুয়াবিল গ্রামের শহীদুল ইসলাম বলেন, এক বছর আগেও হালদা পার হতে গিয়ে সাকোঁ থেকে মোটরসাইকেলসহ নদীতে পড়ে এক যুবক নিহত হয়েছেন। অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে। সেতুটি আমাদের জন্য আর্শিবাদ।
উল্লেখ্য, হালদার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ সেতুর নকশায় রাখা হয়েছে বিশেষ সতর্কতা। সেতুর দুই প্রান্ত ও নদীর অন্যান্য অংশে মোট আটটি পিলার নির্মাণ করা হলেও নদীর স্রোতধারার ওপর মূল স্প্যানটি কোনো পিলার ছাড়াই নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে সেতুর কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ বা জলজ প্রাণীর কোনো ক্ষতি হবে না।










