চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলো। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবার চট্টগ্রামে পা রাখছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর এই আগমনকে কেন্দ্র করে বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝেও বিরাজ করছে নতুন উদ্দীপনা। উজ্জীবিত চট্টগ্রামবাসী। সানন্দ অভ্যর্থনায় চট্টগ্রামবাসী একসুরে বলছেন, ‘বীর চট্টলায় স্বাগতম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’।
প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফরের তাৎপর্য দ্বিমুখী। দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক দায়বদ্ধতা এবং দলকে সংগঠিত করার রাজনৈতিক অঙ্গীকার–দুই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে চট্টগ্রাম আসছেন প্রধানমন্ত্রী। চট্টগ্রাম সফরকালে তারেক রহমান বাঁশখালী ও হাটহাজারী উপজেলায় সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর এ সফর মানবিক কারণে। আবার নগরের পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুতে চট্টগ্রামের তিন সাংগঠনিক জেলার (মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ) নেতাকর্মীদের নিয়ে করবেন সাংগঠনিক সভা। ফলে চট্টগ্রামবাসীর কল্যাণ এবং রাজনৈতিক রোডম্যাপ, উভয় দিক থেকে এই সফরটি গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
তারেক রহমানের বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক ও আত্মিক ইতিহাসের সাথে চট্টগ্রাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এখান থেকেই শুরু হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সেই অমর অধ্যায়, স্বাধীনতার ঘোষণা। আবার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার গোড়াপত্তনেও চট্টলা ভূমিকা রেখেছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির নেতারা। বিএনপির সাবেক চেয়ারপার্সন, জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে চট্টগ্রাম থেকে দেওয়া হয় ‘দেশনেত্রী’ উপাধি। তবে এই শহরের মাটিতে জিয়া পরিবারের যেমন গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতি জমা আছে, তেমনই জমা আছে গভীর বেদনাবোধ। কারণ ১৯৮১ সালে ‘কিছু বিপথগামী’ সেনা সদস্যের হাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন জিয়াউর রহমান। ফলে জিয়া পরিবারের প্রতিটি সদস্য, বিশেষ করে তারেক রহমানের কাছে চট্টগ্রাম কেবল একটি বিভাগীয় শহর নয়, বরং ইতিহাস, স্মৃতি ও অনুভূতির এক সংবেদনশীল মানচিত্র। তাই জিয়া পরিবারের সন্তান হিসেবে তারেক রহমানের আজকের সফর কেবল সাংগঠনিক বা মানবিক নয়, বরং গভীর এক অনুভূতির পুনর্মিলন।
চট্টগ্রামের প্রতি এ অনুভূতির টানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তারেক রহমানের মা বেগম খালেদা জিয়া বারবার ছুটে আসতেন চট্টগ্রাম। রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার সময় প্রাধান্য দিয়েছেন চট্টগ্রামের উন্নয়নে। চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করার প্রধান উদ্যোগ নেন খালেদা জিয়া। তারেক রহমানও তার নির্বাচনী ইশতেহারে চট্টগ্রামের উন্নয়নে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। চট্টগ্রামবাসীর প্রত্যাশা সেই প্রতিশ্রতি রক্ষা করবেন প্রধানমন্ত্রী।
জানা গেছে, গত ৯ জানুয়ারি তারেক রহমানকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। এরপর ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম আসেন তিনি। পরদিন পলোগাউন্ডে অনুষ্ঠিত জনসভায় বক্তব্য রাখেন। এর আগে ২০০৫ সালে দুইবার চট্টগ্রাম এসেছেন তারেক রহমান। ওই বছরের ৬ মে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের জন্য ভোট চেয়ে আয়োজিত সভায় উপস্থিত ছিলেন। এর প্রায় তিন মাস পর একই বছরের ২৪ জুলাই চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত উত্তর জেলা বিএনপির নির্বাহী কমিটির বিশেষ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন তিনি। তবে তখন তিনি ছিলেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব।
এদিকে আজ রোববার দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে পশ্চিম বাঁশখালী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর হেলিকপ্টারযোগে ফটিকছড়ি যাবেন। সেখানে বাবুনগর মাদ্রাসায় উপস্থিত হয়ে আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এরপর সড়কপথে হাটহাজারী মাদ্রাসায় পৌঁছে আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত করবেন। বিকালে হাটহাজারী কলেজ মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। এরপর আসবেন রেডিসন ব্লুতে।
বিএনপির নেতৃবৃন্দ বলছেন, রেডিসন ব্লুতে অনুষ্ঠেয় আজকের সাংগঠনিক সভাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বিএনপি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বড় ধরনের সাংগঠনিক সভাগুলোর ভেন্যু থাকে রাজধানী ঢাকা। এসব সভায় সাধারণত জেলা বা মহানগরের ‘সুপার ফাইভ’ সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। সেই চর্চায় ব্যতিক্রম ঘটিয়ে বিএনপির রাজনীতিতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন তারেক রহমান।
এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী আজাদীকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফরের উদ্দেশ্য মানবিক। একইসঙ্গে উনার যারা রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, সহকর্মী এবং উনার চট্টগ্রামের হাতিয়ার যারা তাদের সঙ্গে একটা বৈঠক করবেন। বৃহত্তর চট্টগ্রাম গত নির্বাচনে যে ফলাফল দিয়েছে সে ফলাফলটা শ্রেষ্ঠ ছিল। আমার ধারণা সেটার জন্য উনি (প্রধানমন্ত্রী) খুবই মুগ্ধ। তাই প্রধানমন্ত্রী মানবিক কারণে চট্টগ্রাম আসলেও উনার কর্মীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং মতবিনিময় করবেন। উনি (প্রধানমন্ত্রী) তাদের (বিএনপি নেতাকর্মী) চিন্তাধারা, তাদের অবস্থান, তাদের অভিযোগ শোনার জন্য বৃহত্তর চট্টগ্রামের সকলকে একটা সুযোগ করে দিয়েছেন।
বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকার আজাদীকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম চট্টগ্রাম সফরকে ঘিরে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মাঝেও প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। এটাকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মাঝে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হয়েছে। মতবিনিময় সভায় কর্মীরা সরাসরি কথাবার্তা বলবেন এবং তিনি (তারেক রহমান) গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখবেন। আমরা মনে করি, এ সভার পর থেকে চট্টগ্রামে দল চাঙ্গা হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে গোলাম আকবর খোন্দকার বলেন, জিয়া পরিবারের জন্য চট্টগ্রাম সংবেদনশীল জায়গা। জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। আবার জাতীয়তাবাদী দল–বিএনপি প্রতিষ্ঠাও করেছেন চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ থেকে। সার্কিট হাউজ ময়দানে ঘোষণা দিয়ে দল প্রতিষ্ঠা করেন। সৌভাগ্যক্রমে সেদিন সার্কিট হাউজে আমি উপস্থিত ছিলাম। তিনি বলেন, কিছু সংখ্যক দুষ্কৃতকারী সেনা সদস্যের হাতে এ সার্কিট হাউজেই জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণ করেন। সুতরাং চট্টগ্রামের সঙ্গে জিয়া পরিবারের অনুভূতি জড়িয়ে আছে।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মাহবুবের রহমান শামীম আজাদীকে বলেন, চট্টগ্রামে সাংগঠনিক সভা হবে, সেজন্য নেতাকর্মীরা খুব উজ্জীবিত। প্রায় ৭০০ নেতাকর্মী উপস্থিত থাকবেন।
বিএনপির সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক (চট্টগ্রাম বিভাগ) ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন আজাদীকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রথম চট্টগ্রাম আসছেন বিএনপি চেয়ারম্যান, তাও ১৮০ দিনের মধ্যে। প্রধানমন্ত্রীর এ আগমনে একটা সাজ সাজ রব পড়ে গেছে পুরো চট্টগ্রাম জেলায়। সরকারের মানবিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি দলীয় কর্মকাণ্ডের প্রোগ্রাম দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তার এত ব্যস্ততার মধ্যেও দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সময় দেবেন।
নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান আজাদীকে বলেন, বিএনপি চেয়ারম্যান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম আগমন করবেন। তিনি বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি শেষে বিএনপির সাথে যে সাংগঠনিক সভা করবেন তার সম্পূর্ণ প্রস্তুতি আমরা ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছি। এখন অপেক্ষা শুধু আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আগমন এবং সভা শুরুর। সভায় বিভিন্ন পর্যায়ের ৬০০ থেকে ৭০০ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন। উত্তর জেলায় কমিটি নেই। মহানগর ও দক্ষিণের পূর্ণাঙ্গ কমিটি থাকবে। অঙ্গসংগঠনের মধ্যে ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক, যুগ্ম আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবরা থাকবেন। যুবদলের কমিটি নেই, যুবদলের ২০ থেকে ২৫ জন ও অন্যান্য অঙ্গসংগঠনগুলো থেকে ৩ থেকে ৫ জন থাকবেন। থানা পর্যায়ের সিনিয়র যে লিডারশিপ আছে, যারা কমিটিতে আসার মতো যোগ্যতা রাখেন তারাও সভায় উপস্থিত থাকবেন।
দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব লায়ন হেলাল উদ্দিন আজাদীকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর দক্ষিণ চট্টগ্রামের রাজনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করবে। তাঁর আগমন নেতাকর্মীদের আরো ঐক্যবদ্ধ, সংগঠিত ও দায়িত্বশীল করে তুলবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও নতুন আশার আলো জ্বালাবে। প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে আমরা প্রস্তুত।
দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ফৌজুল কবির ফজলু আজাদীকে বলেন, চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সম্ভাবনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের মানুষের অনেক প্রত্যাশা অপূর্ণ রয়েছে। তারেক রহমানের সফরের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, শিল্প–বাণিজ্য ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
সফর শুরু মহেশখালী থেকে : জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী আজ সকাল ৯টায় কঙবাজারের মহেশখালীতে যাওয়ার মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু করবেন। সেখানে তিনি মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) কার্যক্রম পরিদর্শন করবেন। এরপর তিনি হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়ায় যাবেন। সেখানে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে ত্রাণ বিতরণ এবং ১০০ গৃহহীন পরিবারের হাতে নতুন ঘরের চাবি তুলে দেবেন। পরে ফটিকছড়ি ও হাটহাজারী সফর করবেন। এরপর নগরীতে দলীয় মতবিনিময় সভায় যোগ দেবেন।











