মিয়ানমার সীমান্তে গোলাগুলি ও হতাহতের ঘটনায় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকে সতর্কাবস্থায় রাখার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব গতকাল ঢাকায় সশস্ত্র বাহিনী বিভাগসহ নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকের পর জানিয়েছেন, সীমান্তে সেনা পাঠানো হচ্ছে না। এদিকে সাংবাদিকদের প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, আমাদের বর্ডার গার্ড যথেষ্ট শক্তিশালী। তাদের মনোবল যথেষ্ট আছে। তারা আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র উভয় মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সঙ্গে সমস্যা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধানের পক্ষপাতি বাংলাদেশ। খবর বিডিনিউজের। মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা সঙ্কট অনিষ্পন্ন থাকার মধ্যে গত ২৮ আগস্ট থেকে ওপার থেকে গোলা এসে পড়ছে বাংলাদেশের ভেতরে, বাংলাদেশের আকাশ সীমায় চলে আসছে মিয়ানমারের হেলিকপ্টার। গত শুক্রবার রাতে মিয়ানমার থেকে আসা গোলা সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিস্ফোরিত হয়ে একজন নিহত ও ৫ জন আহত হয়। ওইদিন সকালে ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে ‘মাইন’ বিস্ফোরণে এক বাংলাদেশি যুবকের পা উড়ে যায়।
এসব ঘটনায় দেশটির রাষ্ট্রদূত উ অং কিয়াউ মো’কে গতকাল চতুর্থবারের মতো তলব করে প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশ। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে বসেন পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা, সেখানে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, বিজিবি, কোস্টগার্ডসহ প্রায় সবগুলো বাহিনীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল খুরশেদ বলেছেন, আমরা বিজিবি, কোস্টগার্ডকে বলে দিয়েছি, বর্ডারে সবসময় সজাগ থাকতে, রিইনফোর্সমেন্ট যতটুকু লাগে, সেখানে ততটুকু করবে। এবং তারাও যাতে সাগর দিয়ে বা অন্য কোনোভাবে কোনো রোহিঙ্গা দেশে প্রবেশ করতে না পারে, সে ব্যাপারে আমরা সতর্ক দৃষ্টি রাখার জন্য অনুরোধ করেছি।
খুরশেদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম বিষয়াবলি ইউনিটের সচিব। সচিব মাসুদ বিন মোমেন বিদেশ সফরে থাকায় তিনি মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
মিয়ানমারে রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের সংগঠন আরাকান আর্মির সঙ্গে দেশটির সেনাবাহিনীর সংঘাত চলছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। তার মধ্যে গোলা এসে পড়ছে বাংলাদেশে। ওপারে সেনাবাহিনীর তৎপরতার মধ্যে সীমান্তে বাংলাদেশ সৈন্য মোতায়েন করবে কিনা সেই প্রশ্নে তিনি বলেন, আর্মি ডেপ্লয়মেন্টের কথা এ মুহূর্তে চিন্তা করছি না। মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে সংযত হতে বলা হয়েছে। মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মহোদয়কে ডেকে আমরা প্রতিবাদলিপি দিয়েছি যে, সীমান্তে যে সমস্ত ঘটনা ঘটছে, সেগুলো যাতে পুনরাবৃত্তি না হয় এবং আমরা এটাও বলেছি যে, এটা আপনাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার, আপনারা কীভাবে সেটাকে সমাধান করবেন, সেটা মিয়ানমারকে চিন্তা করতে হবে। কিন্তু মিয়ানমারের গোলা যাতে আমাদের ভূখণ্ডে না আসে। এটা দেখার দায়িত্ব আমাদের না, সেটা দেখার দায়িত্ব তাদের। খুরশেদ বলেন, আমরা শান্তিপ্রিয় জাতি, কখনও যুদ্ধ চাই না। শান্তিপূর্ণভাবে এ সমস্যার সমাধান চাই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও তার দপ্তরে সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের বিজিবি কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বিজিপিকে (মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষা বাহিনী)। এখানেই আমরা ক্ষ্যান্ত নই, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও তাদের কড়া প্রতিবাদ দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রদূতকে তলব করে আমাদের আপত্তির কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে ওয়াকিবহাল আছেন।
বাংলাদেশে গোলা চলে আসার কারণ কী হতে পারে-সাংবাদিকদের প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন সীমান্তে তাদের (মিয়ানমার) বিভিন্ন বিদ্রোহীদের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ লেগেই আছে। এটা আপনারা (সাংবাদিক) জানেন। এসব কারণে এটা হতে পারে কিনা, আমরা জানি না। আমরা জানি যে, আমাদের সীমান্তে এসে পড়ছে। কেন হচ্ছে, এটা তারা জানে।
বাংলাদেশ থেকে কেউ যাতে ঘটনার সঙ্গে জড়িত না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে বৈঠকে এজেন্সিগুলোকে বলা হয়েছে বলে জানান ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব। তিনি বলেন, আমাদের দেশেরও যে কিছু লোক আছে, যারা আগেরবার জড়িত ছিল, সেটা যাতে না হয়, এবার আমরা যত এজেন্সি আছে, সবাইকে আমরা অনুরোধ করেছি।
আন্তর্জাতিক ফোরামে তোলার ভাবনা : বারবার প্রতিবাদ জানানোর পরও এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশ তা আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলবে বলে হুঁশিয়ারি দেন আসাদুজ্জামান খান কামাল। এভাবে যদি এটা চলতেই থাকে, তাহলে জাতিসংঘে গিয়ে আমাদের বিষয়টি তুলব যে আমাদের মানুষদের উপর গোলাবারুদ পড়ছে। আমরা শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই। আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপের কথা যদি না শোনে, তাহলে আমরা সেখানে যাব।
মিয়ানমার তো বারবার একই ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে, জাতিসংঘকে কবে জানানো হবে-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কোন দিন ইউএনকে (জাতিসংঘ) জানানো হবে, তা প্রধানমন্ত্রী জানেন।
শান্তিকামী রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি সহ্য করে যাচ্ছে উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব বলেন, আপনারা দেখে আসছেন, অনেক ধৈর্য ধরে এ সমস্ত আমরা সহ্য করে যাচ্ছি। আমরা তাদেরকে বলেছি যে, আপনারা আমাদের সমস্যা সমাধান করুন, যাতে করে আমাদের এখানে কোনো আর রক্তারক্তি না হয় বা প্রাণ না যায়।
বারবার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে প্রতিবাদ জানানোর পরও গোলাগুলি ও উত্তেজনা চলমান থাকার বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, যদিও আপনারা বলবেন, আপনি বারবার প্রতিবাদলিপি দেন, এতে কিছু হয় না। এটাতে আসলেই আমাদের করার কিছু নেই। কারণ, আমরা তো দায়িত্বশীল একটা রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিবেশীকে তো আমরা নিয়মমাফিক যা করা যায় তা আমরা করতেছি। এবং এখানে আমাদের কথাবার্তায় কোনো রকম দুর্বলতা বা অনেকে নতজানু বলে থাকে, সে ধরনের কোনো কথাই নেই। বরঞ্চ আমরা শক্ত অবস্থান থেকেই তাদেরকে বলেছি।
ঢাকায় আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের ডেকে এ বিষয়ে ব্রিফ করার চিন্তা সরকার করছে জানিয়ে খুরশেদ বলেন, আমরা চেষ্টা করছি আসিয়ান যে রাষ্ট্রদূত আছেন এখানে ঢাকায়, তাদেরকেও ব্রিফ করতে। যাতে করে আমরা তাদেরকে বলতে পারি যে, বারবার একই অবস্থা আমাদের কাছে শুনে গিয়েও তারা কোনো অ্যাকশন নিচ্ছে না। এটা আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক প্রতিবেশী হিসেবে।
তবে দ্বিপক্ষীয়ভাবেই সমাধানে জোর দেওয়ার কথা জানিয়ে খুরশেদ আলম বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা কি সমাধান হচ্ছে? আমরা ৫ বছর ধরে জাতিসংঘসহ এমন কোনো জায়গা নাই, এমন কোনো বড় কোনো দেশ নাই, যাদের কাছে আমরা যাইনি, ধরনা দিইনি, কথা বলিনি। সমস্যা কি সমাধান হয়েছে? ইউএনএইচসিআর কি পারছে? কাজেই দ্বিপাক্ষিক ইস্যুর ওপর সমাধানে সময় লাগবে। ধৈর্য ধরতে হবে। তবে আমরা যদি নিজেরা নিজেদের ভিতরে শক্ত থাকি, সমাধান আসবে। তলবে এসে রাষ্ট্রদূতের উত্তর কী ছিল? এ প্রশ্নে তিনি বলেন, রাষ্ট্রদূতের তেমন কোনো জবাব স্পষ্টভাবে…
মিয়ানমারের সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে কিনা জানতে চাইলে খুরশেদ বলেন, নেপিদো থেকে আমাদের কিছু জানায়নি। রাষ্ট্রদূত যেটা বলেছেন, এ তথ্যগুলো উনি নেপিদোতে জানাবেন বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে। তারা যেন এটার ওপর কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে পারে।
বারবার গোলা আসার পর প্রতিবাদের মধ্যে এবার হতাহতের ঘটনা ঘটল। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের অবস্থানের বিষয়ে এক সাংবাদিক জানতে চান ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিবের কাছে। উত্তরে তিনি বলেন, আমরা উনাদেরকে পূর্বেও যা বলেছি, রাষ্ট্রদূত খুব সময় দিয়েই শুনেছেন। উনি আশ্বাস দিয়েছেন আমাদের, আমরা যে কথাগুলো বলেছি, মর্টার শেল পড়া, প্রাণহানি ঘটা এবং কয়েকজনের আহত হওয়ার কথা, সেসব বিষয়ে তিনি না করেননি একটিতেও, যে এগুলো হয়নি।
মিয়ানমার সরকার দায়ী করছে আরাকান আর্মিকে : মিয়ানমারের দিক থেকে পাওয়া উত্তরের বিষয়ে এক প্রশ্নে তিনি বলেন, তাদের গতানুগতিক একটা উত্তর আছে যে, এটা আমাদের এখান থেকে হয়নি, এটা আরাকান আর্মি করছে। এটাই তারা বলতে থাকে। তারা এই রকম দোষও দেয় যে, আরাকান আর্মি আমাদের এখান থেকে যায়। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, আপনাদের দেশের অভ্যন্তর থেকে যা কিছু আসুক না কেন, সেটা আপনাদের দায়িত্ব। সেটা আপনারা দেখবেন। আমাদের এপাড়ে যাতে কিছু না আসে, সেটা আপনারা নিশ্চিত করবেন। এটা করার জন্য যা কিছু করার দরকার, আপনারা পদক্ষেপ নেবেন।
সীমান্তের ঘটনাকে এখনও ‘দুর্ঘটনা’ হিসাবে দেখছেন জানিয়ে নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা খুরশেদ বলেন, আসলে যেহেতু এটা একটা দুর্ঘটনা বলা যায়… আমরা নিশ্চিত করতে পারতেছি না যে, এ গুলিটা কে করেছে। গুলিটার গায়ে লেখা আছে মিয়ানমার আর্মি। মিয়ানমার বলছে, এ গুলিগুলো চুরি করে আরাকান আর্মি নিয়ে গেছে। তারা এ গুলিগুলো করতেছে। যাতে বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের একটা দূরত্বের সৃষ্টি হয়। এ রকম একটা জায়গায় অ্যাকচুয়ালি কে দায়িত্ব নেবে, সেটা নিরূপণ করা খুবই কঠিন কাজ। তবে আমরা চেষ্টা করছি।













