সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগের খবরে ক্ষোভ-নিন্দা

চট্টগ্রামের বিশিষ্ট নাগরিক, পেশাজীবী ও রাজনৈতিক সংগঠনের বিবৃতি ‘বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সিআরবির কোনো অংশ ব্যবহার করা যাবে না’

আজাদী প্রতিবেদন | রবিবার , ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৪৯ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত সিআরবি এলাকায় আবারো প্রাইভেট হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ার খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এই ধরনের পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্প থেকে সরে আসার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিকসহ, পরিবেশবাদী সংগঠন, উন্নয়ন সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা। আজ রোববার বিকেল ৪টায় রেল মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সিআরবি সংলগ্ন হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ নির্মাণে রেলওয়ের প্রস্তাবিত জায়গা পরিদর্শন করার ঘোষণার পর থেকে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ, পরিবেশবাদী সংগঠন, উন্নয়ন সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠনসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠেছে। এরই ধারাবাহিকতায় হাসপাতাল নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণার দাবিতে বিবৃতি দিয়েছেন দেশের এসব সংগঠনের বিশিষ্ট নাগরিকগণ।

বিবৃতিদাতারা হলেন, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ, একুশে ও বাংলা একাডেমি পদক প্রাপ্ত কবি ও প্রাবন্ধিক আবুল মোমেন, প্রাক্তন চুয়েট ভিসি প্রফেসর মোজাম্মেল হক, সিডিএ বোর্ড সদস্য ও নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি জেরিনা হোসেন, স্থপতি সুভাষ বড়ুয়া, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সিআরবি রক্ষা মঞ্চের আহ্বায়ক ডা. মাহফুজুর রহমান, সুজন চট্টগ্রাম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী, নগর বিশেষজ্ঞ ও ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের প্রাক্তন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার, বাংলা একাডেমি পুরুস্কার প্রাপ্ত কবি ও সাংবাদিক রাশেদ রউফ, সাংবাদিক ও কবি ওমর কায়সার, চট্টগ্রাম রিপোটার্স ফোরাম সভাপতি সাংবাদিক কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ইতিহাস সংস্কৃতি গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ও বেলা নেটওয়ার্ক মেম্বার সাংবাদিক আলীউর রহমান, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বেলা চট্টগ্রাম সমন্বয়ক মনিরা পারভিন রুবা, পরিবেশ সংগঠন গ্রিন ফিংগার্স এর সহ প্রতিষ্ঠাতা আবু সুফিয়ান ও রিতু পারভিন।

দেশের বিশিষ্ট নাগরিকগণ তাদের বিবৃতিতে বলেন, ২০০৮ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রণীত ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) সিআরবি কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে চিহ্নিত। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি যা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। ড্যাপের নির্দেশনা অনুযায়ী, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে সিআরবির কোনো অংশ ব্যবহার করা যাবে না এবং এখানে কোনো বহুতল ভবন নির্মাণ করা যাবে না। শুধু পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পাখির অভয়ারণ্য, জাদুঘর, প্রজাপতি উদ্যান প্রতিষ্ঠা করা যাবে। বিবৃতিদাতারা উল্লেখ করেন, ড্যাপ ঘোষিত এলাকায় বহুতল বাণিজ্যিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, ওয়াসার ছাড়পত্র দেয়ার সুযোগ নাই। এই স্থানে সিডিএ ভবন নকশার অনুমোদন দিতে পারবে না। উপরোক্ত বিবেচনায় সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মান পুরোপুরি বন্ধ করা অত্যাবশ্যক।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওমর ফারুক রাসেলের নেতৃত্বে বেসরকারি সংস্থা ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান ওপিনিয়ন (ইকো) পরিচালিত গবেষণায় সিআরবিতে ২২৩ প্রজাতির উদ্ভিদের সন্ধান পায়। তার মধ্যে ১৮৩টি ঔষধি গাছ। গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ ৩৪ প্রজাতির। লতাজাতীয় উদ্ভিদ ২২ প্রজাতির। বিপন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ৯টি। ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হতে পারেএ রকম উদ্ভিদ ৬৬টি। এলাকাটিতে বড় বৃক্ষ রয়েছে ৮৮টি। যার মধ্যে শতবর্ষী গর্জন ও শিরীষ আছে। ঔষধি গাছ ক্যান্সার, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, জন্ডিস, অর্শ্বসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। যে কারণে সিআরবি এলাকাটি নিজেই যেন একটি ‘প্রাকৃতিক হাসপাতাল’। এখানে হাসপাতাল নির্মাণ করা হলে এসব ঔষধি গাছের বেশির ভাগ ধ্বংস হবে। প্রাকৃতিক বৈশিষ্টের কারণে ঢাকার মতো চট্টগ্রামে রমনা পার্ক বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মতো উন্মুক্ত স্থান নাই। উন্মুক্ত স্থানে শ্বাস নেয়ার মতো চট্টগ্রামে সিআরবির বিকল্প নাই। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এবং উন্মুক্ত স্থান হিসেবে চট্টগ্রামবাসী সিআরবিকে চট্টগ্রামের ফুসফুস বলে।

বিবৃতিতে নাগরিকগণ বলেন, সিআরবির উন্মুক্ত স্থান ধ্বংস করে বাণিজ্যিক হাসপাতাল নির্মাণ চট্টগ্রামবাসী কখনও মেনে নিবে না। তাছাড়া প্রস্তাবিত হাসপাতালের জায়গা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হয়েছে। কদমতলী মোড়ের পে অ্যান্ড ক্যাশ এলাকার ভূমি তফশিল দিয়ে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কথা বলে তা সিআরবিবে করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), চট্টগ্রাম : বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এর সভাপতি প্রফেসর মু. সিকান্দর খানের সভাপতিত্বে গতকাল নগরীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে চট্টগ্রামের সার্বিক পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামের সার্বিক পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ে আরও বক্তব্য রাখেন প্রফেসর ড. মনজুরুল কিবরিয়া, প্রফেসর মো. ইদ্রিস আলী, গোলাম মহিউদ্দিন মুকুল, রায়হান বাদশা ও আরসাদ হোসাইন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন বাপার সাধারণ সম্পাদক শ ম বখতিয়ার। মতবিনিময় সভায় সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন হয়।

নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত সিআরবি এলাকায় আবারো হাসপাতাল প্রকল্প স্থাপন নিয়ে উদ্যোগ নেয়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নাগরিক সমাজ, চট্টগ্রাম। পাশাপাশি এই প্রকল্প স্থায়ীভাবে বাতিল করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ। বিবৃতিদাতারা হলেননাগরিক সমাজ চট্টগ্রামের কোচেয়ারম্যান ডা. মাহফুজুর রহমান, কোচেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলী, যুগ্ম সদস্য সচিব কামরুল হাসান বাদল, যুগ্ম সদস্য সচিব মহসীন কাজী এবং সদস্য আমিনুল ইসলাম। বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সেটির নেতিবাচক প্রভাব শুধু প্রকল্পের নির্দিষ্ট স্থানেই সীমিত থাকবে না। সময়ের প্রয়োজনে প্রকল্প এলাকা ঘিরে নতুন নতুন দালান, অবকাঠামো, দোকানপাট, পার্কিং, ফার্মেসি, হোটেলরেস্টুরেন্ট, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের জন্য আবাসিক ভবনে ছেয়ে যাবে। যার ফলে পরিবেশদূষণ ঘটবে এবং পুরো সিআরবি এলাকাটির প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক বলয় হুমকির মুখে পড়বে।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি : চট্টগ্রামের ফুসফুস খ্যাত সিআরবিতে আবারও বাণিজ্যিক স্থাপনা হাসপাতাল নির্মাণের তৎপরতা শুরু করার প্রতিবাদ জানিয়েছেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটি। গতকাল বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির স্থায়ী পরিষদের সভাপতি জসিম উদ্দিন চৌধুরী, কার্যনির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান এস এম নুরুল হক, মহাসচিব এইচ এম মুজবুল হক শাকুর, অর্থ সচিব লায়ন মুহাম্মদ নুরুল আলম ও সাংগঠনিক সচিব জিকরুল হাবিবিল ওয়াহিদ সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক যৌথ বিবৃতিতে অবিলম্বে প্রাকৃতিকপরিবেশ এবং জনবিরোধী এই প্রকল্প বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।

এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগর : চট্টগ্রামের ফুসফুস হিসেবে পরিচিত সিআরবি এলাকায় পুনরায় হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগর। একইসঙ্গে অবিলম্বে এ প্রকল্প স্থায়ীভাবে বাতিলের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনের মহানগরের যুগ্মসমন্বয়কারী আরিফ মঈনুদ্দিন স্বাক্ষরিত ও মিডিয়া সেলের প্রধান সমন্বয়কারী রিদুয়ান কর্তৃক এক বিবৃতিতে বলেছেন, সিআরবির মতো এলাকায় হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পুরো এলাকার প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর ফলে পুরো এলাকা যানজটপূর্ণ, কোলাহলময় ও পরিবেশদূষণে আক্রান্ত হবে। নেতৃবৃন্দ বিবৃতিতে বলেন, সিআরবি এলাকায় বর্ষবরণসহ বছরব্যাপী বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এ ধরনের একটি সাংস্কৃতিক বলয়ের পাশে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ স্থাপন কোনো মতেই যৌক্তিক হতে পারে না। এনসিপি চট্টগ্রাম মহানগর নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেনডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) সিআরবিকে ‘কালচারাল হেরিটেজ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং সেখানে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বা বহুতল ভবন নির্মাণ নিষিদ্ধ। সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া বিদ্যমান আইন ও রাষ্ট্রীয় নীতিমালার পরিপন্থী।

সিপিবি চট্টগ্রাম : প্রকৃতির ছায়াঘেরা নান্দনিক সিআরবিতে নতুন করে আবারও হাসপাতাল নির্মাণের চক্রান্ত রুখে দাঁড়ানোর জন্য চট্টগ্রামবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) চট্টগ্রামের নেতৃবৃন্দ। গতকাল শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানিয়েছেন সিপিবির মহানগরের নেতারা। বিবৃতিতে সিপিবি নেতা অশোক সাহা ও মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, ২০২১ সালে জনমতের তোয়াক্কা না করে কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী লীগ সরকার সিআরবিকে ক্ষতবিক্ষত করে একটি প্রাইভেট হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। তখন চট্টগ্রামবাসী আন্দোলনে নেমে তাদের সেই উদ্যোগ বন্ধ করতে বাধ্য করেছিল। সিপিবিসহ সকল বামপন্থী প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও গণসংগঠন এবং নাগরিক সমাজ সেই আন্দোলনে একাত্ম হয়েছিল। কিন্তু আমরা আবার পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারলাম, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সেই প্রকল্পটি আবারও পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। রেলমন্ত্রী সিআরবিতে প্রাইভেট হাসপাতাল নির্মাণের স্থান পরিদর্শন করবেন। আমরা বিএনপিকে আওয়ামী লীগের পদাঙ্ক অনুসরণ না করার আহ্বান জানাই।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা
পরবর্তী নিবন্ধমিলেছে অর্থ, এবার খাল-নালা পরিষ্কারে মাঠে নামছে চসিক