সংকটে পড়েছে দেশের আমদানি খাত। কোটি কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে সময়মতো খালাস করতে না পেরে সমস্যায় পড়েছেন আমদানিকারকেরা। বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালসহ ভোগ্যপণ্যবাহী মাদার ভ্যাসেলগুলো ভাসছে সাগরে। বিদেশি এসব জাহাজের বিপরীতে প্রতিদিন লাখ লাখ ডলার গচ্চা দিতে হচ্ছে। শুধুমাত্র সময়মতো পণ্য খালাস করতে না পারায় প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর থেকে সময়মতো পণ্য খালাস করতে না পারায় আমদানিকারকদের এই অর্থ গচ্চা দিতে হচ্ছে উল্লেখ করে সূত্র বলেছে, নানামুখী চেষ্টা করেও লাইটারেজ জাহাজ সেক্টরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব না হওয়ায় পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে সেক্টরটিতে সিন্ডিকেশনের অভিযোগ তুলে বিষয়টি নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কয়লা, সিমেন্ট ক্লিংকার, স্ক্র্যাপ, গম, ডাল, সার, লবণ, পাথর, স্ল্যাগ, স্টিল, এইচআর কয়েল, সয়াবিন ভূষি, কোপ্রা, উডপাল্পসহ বিপুল পরিমাণ পণ্য নিয়ে প্রতিদিন বড় বড় মাদার ভ্যাসেল বহির্নোঙরে আসে। বড় আকৃতির এসব জাহাজের অধিকাংশ বেশি ড্রাফটের কারণে সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারে না। ফলে বহির্নোঙরে গ্র্যাব ও ক্রেনের মাধ্যমে মাদার ভ্যাসেল থেকে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য স্থানান্তর করা হয়। পরে কর্ণফুলী নদীর ১৬টি ঘাটসহ দেশের ৩০টির বেশি গন্তব্যে অভ্যন্তরীণ নৌপথে এসব পণ্য পৌঁছে দেওয়া হয়। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ সেক্টরে পণ্য সরবরাহ নেটওয়ার্কের সবচেয়ে বড় মাধ্যম।
সূত্র বলেছে, বহির্নোঙরে অবস্থান নেওয়া মাদার ভ্যাসেল থেকে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাস করে তা অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হয়। লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে খালাস করা স্ক্র্যাপ দিয়ে স্টিল মিলে লোহা তৈরি হয়, এইচআর কয়েল দিয়ে তৈরি হয় ঢেউটিন, ক্লিংকার দিয়ে তৈরি হয় সিমেন্ট, গম দিয়ে তৈরি হয় আটা, ময়দা ও সুজি। এছাড়া ভোগ্যপণ্যগুলো অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থায় সরবরাহ ঠিক রাখায় পণ্য প্রবাহ এবং মূল্য স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু লাইটারেজ জাহাজ সেক্টরে সংকট তৈরি হলে পুরো সরবরাহ নেটওয়ার্কে গোলমাল শুরু হয়। শিল্প কারখানার উৎপাদনে ধস ছাড়াও বাজার ব্যবস্থায় অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়।
বছরে ১০ কোটি টনের বেশি আমদানি পণ্য এভাবে বহির্নোঙর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করা হয়। এই কর্মযজ্ঞে প্রায় ১ হাজার ৮০০ লাইটারেজ জাহাজ নিয়োজিত রয়েছে। একটি মাদার ভ্যাসেল থেকে একসঙ্গে চারটি পর্যন্ত লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাস করতে পারে। সর্বোচ্চ ৫ ঘণ্টার মধ্যে একটি লাইটারেজ জাহাজে পণ্য বোঝাই সম্ভব। এতে ওই জাহাজটি সরে গেলে ওই স্থানে অন্য জাহাজ লাগিয়ে মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাস করা হয়। এতে রাতে–দিনে ২৪ ঘণ্টায় এক একটি মাদার ভ্যাসেল থেকে ১০ থেকে ১৫ হাজার টন পণ্য খালাস করা সম্ভব হয়।
পর্যাপ্ত লাইটারেজ জাহাজ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বহির্নোঙরে ৫–৭ দিনের মধ্যে একটি মাদার ভ্যাসেল ফিরতি পথের জন্য নোঙর তুলতে পারে। জাহাজের অবস্থানকাল কমে গেলে আমদানিকারকের খরচ কমার পাশাপাশি বন্দরের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল হয়। একটি মাদার ভ্যাসেল একদিন বাড়তি বসে থাকলে বিশ–ত্রিশ হাজার ডলার পর্যন্ত গচ্চা দিতে হয়। এভাবে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশি জাহাজ মালিকদের কাছে চলে যাচ্ছে। এই টাকা প্রাথমিকভাবে আমদানিকারক পরিশোধ করলেও মূল যোগানটা ভোক্তাকেই দিতে হয়।
লাইটারেজ জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) যে সিরিয়াল ব্যবস্থা চালু করেছে, বাস্তবে তা সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে না। চারশর বেশি লাইটারেজ জাহাজ সিরিয়াল প্রথা অনুসরণ না করে নিজেদের মতো পণ্য পরিবহন করছে। বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও এসব জাহাজকে সিরিয়ালের আওতায় আনা যাচ্ছে না। এতে করে আমদানিকারকেরা বিডব্লিউটিসিসির কাছে জাহাজের জন্য ধর্ণা দিয়েও জাহাজ পাচ্ছেন না। ডব্লিউটিসিসির সিরিয়ালে পর্যাপ্ত জাহাজ না থাকায় তারা আমদানিকারকদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। বিডব্লিউটিসিসি মাদার ভ্যাসেলের চাহিদার ভিত্তিতে বার্থিং মিটিং করে জাহাজ বরাদ্দ দেয়। অথচ জাহাজের অভাবে এই বার্থিং মিটিংও নিয়মিত হচ্ছে না। এক–দুদিন পরপর বার্থিং মিটিং হচ্ছে। কোনো আমদানিকারক ৫টি লাইটারেজ জাহাজ চাইলে তাকে একটি দেওয়া হচ্ছে। ওই জাহাজটি মাদার ভ্যাসেলে গিয়ে চার–পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য নিয়ে নেয়। এরপর মাদার ভ্যাসেলটি অলস বসে থাকে। অথচ একটি মাদার ভ্যাসেল চাইলে দিনে গড়ে ১৫/১৬টি লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাস করতে পারে।
একাধিক আমদানিকারক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পরিস্থিতি ভয়াবহ। ২০–২৫ দিন ধরে পণ্য নিয়ে অবস্থান করছে এমন মাদার ভ্যাসেলও রয়েছে। দুয়েকটি করে জাহাজ দেওয়া হয়। সেগুলোতে কয়েক হাজার টন পণ্য খালাস করা হয়। এরপর আবার লাইটারেজ জাহাজের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তারা বলেন, অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন সেক্টর গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। অথচ এই খাতটি নিয়ে উদাসীনতা রয়েছে। হয় সবকিছু ঠিকভাবে চলুক অথবা নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হোক। যার যেভাবে ইচ্ছে জাহাজ ভাড়া করে পণ্য খালাস করাবে। এভাবে একটি সেক্টর চলতে পারে না। এখানে সিন্ডিকেট তৎপর রয়েছে। এই সিন্ডিকেট ভাঙা না হলে আমদানি বাণিজ্যে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তা থেকে নিস্তার মিলবে না। তারা এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
তারা বলেন, বিষয়টি সামাল না দিলে টিকে থাকা কঠিন হবে। গতকাল ৫৫টির মতো জাহাজে কয়েক লাখ টন পণ্য সাগরে ভাসছিল। এসব পণ্য সরবরাহ নেটওয়ার্কে দ্রুত না পৌঁছালে নানা ক্ষেত্রে সংকট তৈরি হবে।
বিডব্লিউটিসিসির কনভেনর হাজী সফিক আহমেদ বলেন, মাদার ভ্যাসেল এসে বহির্নোঙর ভরে গেছে। অথচ লাইটারেজ জাহাজ নেই। সিরিয়ালের বাইরে এতগুলো লাইটারেজ জাহাজ চললে আমাদের কিইবা করার আছে! তিনি বলেন, নানাভাবে চেষ্টা করেও সিরিয়ালবিহীন জাহাজগুলোকে সিরিয়ালে আনা যাচ্ছে না। এটিই মূলত সংকট সৃষ্টি করেছে। মাদার ভ্যাসেলগুলো অলস বসে থাকায় আমদানিকারকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।












