রীতি অনুযায়ী ২৯ মে বিশ্বব্যাপী শান্তি রক্ষা দিবস পালিত হয়। নানা কারণে এ বছর আমাদের দেশে এ দিবস পালিত হয়েছে ১০ জুন। পৃথিবীর দেশে দেশে শান্তিরক্ষায় আত্ম উৎসর্গকারী আমাদের অকুতোভয় সৈনিকদের স্মৃতির প্রতি সম্মান এবং জাতিসংঘ শান্তি মিশনে আমার জীবনের ঝুঁকি নেওয়া অধ্যায়ের খণ্ডাংশ পাঠকদের জন্য নিবেদন করছি। ইতিপূর্বে ১৪ জুন এ সংক্রান্ত প্রথম অংশ প্রকাশিত হয়েছে। মধ্যে ২১ জুন ‘মানুষের ইতিহাসে অভিশপ্তকাল’ ‘ইরানে আমেরিকার পরাজয়’ শিরোনামে বেশ কয়েকটি লেখা প্রকাশিত হওয়ায় কোন কোন পাঠক অনুযোগ করেছেন এ শিরোনামের লেখাটির ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে। এ ধরনের অনুসন্ধিৎসু এবং মনোযোগী পাঠকদের কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ‘শান্তিরক্ষায় আমার জঙ্গল জীবন’ এর দ্বিতীয় অংশ তুলে ধরছি। এখানে উল্লেখ্য আমার শান্তি রক্ষার জীবন নিয়ে প্রথমা প্রকাশনী ‘মানুষ খেকোদের সাথে জঙ্গল জীবন’ বইটি প্রকাশ করেছে। এ বইয়ে সবিস্তারে আমার জঙ্গল জীবন বিধৃত আছে। আমার শান্তি রক্ষায় অভিযান পর্বের দ্বিতীয়াংশে যাওয়ার আগে আফ্রিকার ঐতিহাসিক করুণ বিয়োগান্ত দৃশ্যপটের কিছু অংশ পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চাই।
১৪৯১ সালে পর্তুগীজরা কঙ্গো পৌঁছে। পর্তুগীজদের কঙ্গো পৌঁছার শতাব্দী পূর্ব থেকেই কঙ্গোতে রাজ প্রথা প্রচলিত ছিল। স্থানীয় গোত্র প্রধানদের দ্বারা রাজা নির্বাচিত হতেন। নির্বাচিত রাজাকে বলা হত ‘মানিকঙ্গো’। পর্তুগীজরা কঙ্গো অবতরণ করলে সেই সময়ের মানিকঙ্গো তাদের স্বাগত জানান। পর্তুগীজরা তাদের অস্ত্র বলে মানিকঙ্গোকে সহায়তার প্রস্তাব দেন। এতে মানিকঙ্গো পর্তুগীজদের দ্বারা তার কোন কোন অঞ্চলে ইতিমধ্যে দেখা দেওয়া বিদ্রোহ দমনের সুযোগ পেয়ে যান। এই সুযোগে পর্তুগীজরাও রাজার আনুকূল্য আদায় করে নেন। ফলশ্রুতিতে দলে দলে পর্তুগীজ ধর্মযাজক, স্কুল শিক্ষক কঙ্গো এসে উপস্থিত হতে থাকেন।
ক্রমে পর্তুগীজরা কঙ্গোর সব কিছু গ্রাস করতে থাকে। পর্তুগীজরা কঙ্গো পৌঁছার পুর্বেও সেখানে দাস প্রথা প্রচলিত ছিল তবে তা ছিল দেনার দায়ে কেউ দাস হয়েছে, কেউ মারাত্বক অপরধী হিসাবে, কেউ কেউ যৌতুক বা উপঢৌকন হিসাবে দাস হয়েছে।
ইতিমধ্যে ১৫০০ সালে ভারত অভিযানে বের হয়ে পর্তুগীজ কূটনীতিক পেড্রো আলভেরাজ ক্যাবরাল সালভেদর এবং রিও ডি জেনেরিওর মাঝামাঝি পোর্ট সাগেরো এসে অবতরণ করেন। পর্তুগীজদের এ অবতরণ তাদের জন্য ব্রাজিল আবিষ্কারের পথ খুলে দেয়। ব্রাজিল আবিষ্কৃত হলে পর্তুগীজদের জন্য তা অর্থনৈতিক সুযোগের সুবর্ণ দ্বার উন্মোচন করে। ব্রাজিলের কৃষি এবং খনি’তে অবারিত এই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য পর্তুগীজ উপনিবেশ স্থাপনকারীদের প্রয়োজন হয় অজস্র শ্রমিক। পর্তুগীজরা শ্রমিকের যোগান পেতে হাত বাড়ান কঙ্গো তথা আফ্রিকার দিকে। শুরু হয় দাস ব্যবসার এক করুণ অধ্যায় ‘আটলান্টিক স্লেভ ট্রেড’।
চিনুয়া আচেবে তার উপন্যাস ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’ এ সাম্রাজ্যবাদি শেতাঙ্গরা আফ্রিকার দেশে দেশে কৃঞ্চাঙ্গ মানুষদের আচার আচরণ, ধর্ম বিশ্বাস, প্রথার উপর প্রভাব বিস্তার করতে গীর্জা, স্কুল, বিচার ব্যবস্থা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠার আড়ালে কিভাবে শোষণের রাজত্ব কায়েম করেছেন তা র্নিমম এবং নির্ভিকভাবে তুলে ধরেছেন। চিনুয়া তার উপন্যাসে দেখিয়েছেন শেতাঙ্গদের শোষণ নিপীড়ন আর অত্যাচার অনাচারের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদে দাঁড়াতে গিয়ে ‘উমফিয়ার’ সবচেয়ে সাহসী মানুষ ‘ওকোনকয়ো’ নিজেদের অধিকার রক্ষায় শেতাঙ্গ সাম্রাজ্যবাদীদের সৃষ্ট নিজ সমাজের এক পেয়াদাকে হত্যা করে বসেন। এই প্রেক্ষিতে স্বীয় সমাজে শেতাঙ্গদের দ্বারা বিভক্তি, প্রতিবাদহীনতা দেখে ক্ষোভে ঘৃণায় অপমানে ‘ওকোনকয়ো’ আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। ‘ওকোনকয়ো’র মৃত্যুতে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ওবিরিকা গাছের ডালে ঝুলন্ত ‘ওকোনকয়ো’ কে দেখিয়ে শেতাঙ্গদের উদ্দেশ্যে বলেন ‘ওই লোাকটি ছিলেন উমফিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষদের একজন। আপনারা ওকে আত্মহত্যার দিকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছেন। আর এখন তাকে কবর দেওয়া হবে একটা কুকরের মত’। ‘ওকোনকয়ো’ র মত সাহসী র্নিবিক মানুষের আত্মহত্যা আফ্রিকায় শেতাঙ্গ সাম্রাজ্যবাদিদের নগ্ন থাবা এবং ঐ সমাজ ব্যবস্থায় সরল মানুষগুলির নিজেদের মধ্যে হানাহানি বিস্তারে কি কূট ভূমিকা রেখেছিল তা নিদারুণভাবে তুলে ধরে।
এমনই আফ্রিকান পটভূমিতে আমার উদ্ধার অভিযানকালীন বিচরণ। অপহৃত নেপালিজদের উদ্ধার অভিযানে নেমে কখনো ‘ফাতাকি’, কখনো ‘মাহাগী’, কখনো ‘নালা’ কখনো ‘বালে’ কখনো ‘দই’ এর ঘন গহীন অরণ্যানীর সাথে হিংস্র লেন্দুরা আমাকে আশঙ্কায় ডুবিয়েছে আবার কখনো অরণ্যের মাধকতায় মাতৃস্নেহ, অকৃত্রিম ভালোবাসায় লেন্দুদের আমায় মাথায় তুলে নেওয়া, আমাকে আবেগাপ্লুত করেছে। তবে লেন্দুদের সাথে যোগাযোগের শুরুতে আমি তাদের একটি কথাই বার বার বলেছি– বুঝানোর চেষ্টা করেছি–আমি বাংলাদেশী, যাদের তোমরা ধরে এনেছ তারা নেপালিজ, আমি মুসলমান, নেপালিজরা হিন্দু। আমি কেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তোমাদের কাছ থেকে ওদের ছাড়াতে এসেছি। তার একটিই কারণ সব কিছুর উর্ধ্বে আমরা প্রথমত মানুষ। যেমন তোমরাও।
এরই মধ্যে ধীরে ধীরে পিটার করিমের সাথে আমার গভীর সখ্যতা গড়ে উঠে। লক্ষ মানুষ হত্যাকারী এক হিংস্র দানবের মাঝে আমি অতি ধীরে মনুষ্যত্ব জাগিয়ে তোলায় ব্রতী হই – এ প্রয়াসে এমনকি তার সাথে ঘনিষ্ঠ হতে হতে এক পর্যায়ে তার স্ত্রী ফাতেমাকে আমি ফাতু বলে ডাকতে শুরু করি। ফলশ্রুতিতে পিটার করিম তার সদর দপ্তর ‘দই’ এ আমাকে সম্মান জানিয়ে তার সমস্ত ব্রিগেড কমান্ডার এবং সহ যোদ্ধাদের নিয়ে গার্ড অব অনারও প্রদান করেন। নেপালিজদের মুক্তও করে দেন।
দীর্ঘ পঁয়তালিশ দিন পর সাত নেপালিজকে নিয়ে যেদিন আমি ফিরে আসি – সেদিন কঙ্গোর ১৮০০০ শান্তিরক্ষীই শুধু নয় – কঙ্গোলিজ সেনাবাহিনীর সমস্ত সদস্যও উচ্ছসিত হয়। সেদিন জাতিসংঘ ক্লাবে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের যে ‘স্টান্ডিং ওভেশন’ স্বশ্রদ্ধ উঞ্চ অভিনন্দন আমি লাভ করি তা আমার মনের মনিকোটায় শুধু নয় উপস্থিত আমাদের সব বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীদেরর উদ্বেলিত, উচ্ছসিত আর গৌরবান্বিত করেছে নিঃসন্দেহে। আমি স্থির নিশ্চিত আমার সেদিনের অর্জন আমার প্রিয় মাতৃভুমির লাল সবুজ পতাকাকে আফ্রিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট ক্লিমানজারোর শিখরে স্থাপন করেছিল, নেপালিজদের কুক্রি, ফুল আনন্দাশ্রু আর কৃতজ্ঞতার আলিঙ্গন কখনো ভুলার নয়।
পিটার করিমের সাথে আমার বন্ধুত্বের সূত্রে এবং কঙ্গোলিজ সরকারের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে আমাকে অনুরোধ করা হয় পিটার করিম তথা লেন্দু যোদ্ধাদের সাথে শান্তি আলোচনা চালাতে। আমি এতেও ব্রতী হই। এর ফলাফল শুধু যুগান্তকারীই নয় ঐতিহাসিকও। স্বীকৃতি হিসাবে কঙ্গোর প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলা অভিনন্দন জানাতে এক সুবর্ণ পড়ন্ত বিকেলে আমার ক্যাম্পে ছুটে আসেন। এর থেকে বড় স্বীকৃতি আর কী ই বা হতে পারে। জাতিসংঘের স্বীকৃিত রয়েছে তার প্রশংসাপত্রে।
আমার প্রতীতি, আমার উদ্যোগ আর কর্ম তথা আমার অর্জন আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সেনাবাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে স্পন্দিত করবে, স্পর্ধিত করবে, অনুপ্রাণিত করবে প্রদীপ্ত মানুষ হিসাবে বিপন্নের পাশে দাঁড়াতে, জীবনকে বাজি রাখতে অসংকোচ করবে।
নেপালিজদের সফল উদ্ধার অভিযানের পর ফরাসী এবং নেদারল্যান্ড টেলিভিশন সাক্ষাৎকার নিতে এসে আমার প্রতিক্রিয়া জানতে চায়। সেই উত্তর এখানে আবারো পুনরুক্তি করছি ‘আফ্রিকার দেশে দেশে আমাদের দেশের শান্তিরক্ষীরা জীবন দিয়ে শান্তি স্থাপন করে আফ্রিকাকে রক্ত ঋণে আবদ্ধ করেছে – আজ আমার উদ্যোগ তথা কর্মকাণ্ড জাতি সংঘের সমস্ত শান্তি রক্ষা প্রয়াসকে বাংলাদেশের কাছে দায়বদ্ধ করেছে’।
পরিশেষে আমার মনন, বোধ আর বিশ্বাসে যা সব সময় কাজ করেছে বা করছে তার প্রতিচ্ছবি আমি খুঁজে পাই ব্রাজিলিয়ান প্রখ্যাত লেখক পাউলো সেলো’র (Paulo Coelho) বিশ্ব–খ্যাত উপন্যাস ‘দি আলকেমিস্ট’ এ এভাবে But if you believe yourself worthy of the thing you fought so hard to get, then you become an instrument of God, you help the soul of the world and you understand why you here . ‘যদি আস্থাশীল হও তোমার অধ্যবসায় আর কঠোর সাধনাবলে তুমি তোমার ঈপ্সিত অর্জনে সক্ষম তবে তুমি মানুষের কল্যাণে তোমার স্রষ্টার এক অমোঘ হাতিয়ার, তুমি মানবাত্মার অগ্রযাত্রায় বাড়িয়েছ হাত, তোমার অন্তর তোমাকে জানান দিয়েছে কেন এই ধরায় তোমার আগমন’। এই একই অভিজ্ঞানের প্রতিধ্বনি আমি শুনতে পাই মহাত্মা গান্ধীর জীবন উপলব্ধি থেকেও – If I believe I can not do something, It makes me incapable of doing it. But when I believe I can ,than I acquire the ability to do it even if I didn’t have it in the beginning.
অর্থাৎ ‘আমার যদি প্রতীতি জন্মে এই কাজটি করা আমার দ্বারা সম্ভব নয় তবে আমি মানসিক ভাবে সে কাজটি করার ক্ষেত্রে নিজেকে অনুপযুক্তই করে তুললাম আর যদি বিশ্বাস করি কাজটি আমার দ্বারা সম্ভব তবে আমি নিজেকে সে কাজটি করার জন্য মানসিকভাবে তৈরী করে নিলাম যা আমার মাঝে ইতিপূর্বে ছিল না’।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক; গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।












