সমকালের দর্পণ

মেজর মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম (অব.) | রবিবার , ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ at ৮:০৩ পূর্বাহ্ণ

নেপোলিয়ন বোনার্পাট ফ্রান্সের অজেয় বীর, দুর্দণ্ড প্রতাপশালী সম্রাট, ঈর্ষণীয় সমর কুশলী, তার একটি বাক্য যা অতি সম্প্রতি চীনের আরেক প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট শি জীন পিং এর মুখে উচ্চারিত হয়েছে, সেটি হল “Don’t interrupt when enemy make mistake” এর সারর্মম তথা মোদ্দা কথা হল, “শক্র যখন ভুল করতে থাকে, তাকে তা করতে দাও”। ইতিহাসের অমোঘ পরিণতি ২১ অক্টোবর ১৮০৫ ট্রাফাল্গার’ যুদ্ধে ভুলের কারণে ফরাসী আর স্পেনের সম্মিলিত নৌ বাহিনীর নেতৃত্বে থাকা নেপোলিয়নকেও বৃটিশ নৌ সেনাপতি নেলসনের হাতে পরাজিত হতে হয়। সে যাই হোক নেপোলিয়নের এই একটি বাক্যকে বিশ্লেষণ করলে আমেরিকার ইরান যুদ্ধের ভুলগুলি যেমন একে একে উঠে আসবে তেমনি এ যুদ্ধ থেকে আমেরিকার যে পতন ডংকা বেজে উঠেছে তাও অনুধাবন করা যাবে।

আমেরিকার ভুলগুলি একে একে উল্লেখ করছি

ইসরাইলের ফাঁদে পা দিয়ে ইসরাইলের যুদ্ধ নিজের কাঁধে নেওয়া। বিশ্ববাসীকে ভোগান্তিতে ফেলা।

ইরানের ভূকৌশলগত অবস্থান এবং সামরিক শক্তিকে যথার্থভাবে মূল্যায়নে চরম ব্যর্থতা।

ইরান যুদ্ধ শুরু হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির উপর ইরানের দিক থেকে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরী হতে পারে এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনা প্রণয়নে ব্যর্থতা।

ইরান আক্রান্ত হলে এ যুদ্ধ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিবে ইরানের সে হুমকিকে আমলে না নেওয়া। অতপর যুদ্ধ শুরু হলে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র বা তাবেদার দেশগুলিকে অরক্ষিত রেখে ইসরাইলের প্রতিরক্ষায় অধিক মনোযোগ দেওয়া।

ন্যাটো, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ মিত্র দেশগুলিকে ইরান যুদ্ধ শুরু করা সম্পর্কে অনবহিত রাখা। ফলশ্রুতিতে এই সমস্ত জোট এবং দেশের আমেরিকাকে যুদ্ধে কোন প্রকার সহযোগিতা প্রদানে অস্বীকৃতি। এমন প্রেক্ষাপটে ৫৩ (তিপ্পান্ন) দিন যুদ্ধ চলার পর আমেরিকা যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করে ইরানের সাথে একটি দফারফায় পেঁছাতে চাইলেও জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশ্লেষক বারবারা সুশানের মতে ইসরাইল এতে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়, নেতানিয়াহু আমেরিকার মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে ইরানকে দুর্বল করার তার অভিষ্ঠ অর্জনে তৎপর, একই অভিমত ভারতীয় নাম করা কূটনীতিক নবদীপ সুরি’রও। নেতানিয়াহু’র এই অভিসন্ধির পিছনের কারণ ইসরাইলী বিরোধী দলীয় নেতা ইয়াইর গোলান এবং ইয়াইর ল্যাপিড এর বক্তব্যে সুস্পষ্ট, তারা উল্লেখ করেছেন “নেতানিয়াহু যে লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল সে লক্ষ্য মোটেও পূরণ হয়নি”। ইয়াইর গোলান এবং ইয়াইর ল্যাপিড এর এ বক্তব্য সর্ব্বাংশে সত্য ইরান যুদ্ধে ইসরাইল আমেরিকা ব্যর্থ। তার প্রমাণ, যেমন রিজিম বা শাসন ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না হয়ে আরো কট্টর পন্থিদের ক্ষমতা গ্রহণ, পারমাণবিক শক্তির আঁধারইরানের সমৃদ্ধ ইরোনিয়াম ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি, দূর পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচী বন্ধ করা বা ধ্বংস করার কোনটারই অর্জিত হয়নি, উল্টা ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করেছে, ইসরাইল সহ মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকার তাবেদার রাষ্ট্রগুলির উপর ব্যাপক আক্রমণের সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।

যুদ্ধে সামরিক লক্ষ্যবস্ত্তুর চেয়ে বেসামরিক লক্ষ্যবস্ত্তুর উপর ব্যাপক আক্রমণ পরিচালনা। এই প্রেক্ষাপটে এক পর্যায়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের ইরানী সভ্যতার বিলীন ঘটানোর ঘোষণা দেওয়া সমগ্র বিশ্বকে হতবাক করে এবং বিশ্ব জনমতের এ থেকে ক্রমাগত আমেরিকার বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া।

শঠতা এবং নীতি থেকে বার বার সরে গিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার প্রেক্ষাপটকে আস্থাহীনতায় পর্যবসিত করা।

যুদ্ধ ইসরাইল আমেরিকা শুরু করেছে, বিশ্ববাসী এটি প্রত্যক্ষ করেছে। এ যুদ্ধের পরিণতিতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধগতি, উৎপাদন ব্যবস্থায় ধস ফলশ্রুতিতে বেকারত্বের ঊর্দ্ধমুখি প্রবণতা, মুদ্রাস্ফীতির উল্লম্ফন এ থেকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নাভিশ্বাস সব দায়দায়িত্ব আমেরিকার ঘাড়ে, এ বাস্তবতা এখন আমেরিকাকে ভোগ করতে হবে।

আমেরিকার এ ভুলগুলি যারা আমেরিকার শক্তিক্ষয়ে পরমানন্দ লাভ করবে যেমন রাশিয়া, চীন। তারা ত নেপোলিয়নের সে কথাই এখন আউড়াচ্ছে বার বার “শক্র যখন ভুল করতে থাকে, তাকে তা করতে দাও”।

এ প্রসঙ্গে ভারতীয় দি ট্রিবিউন পত্রিকার প্রথম পডকাস্ট সম্প্রচারের অতিথি ভারতীয় নাম করা কূটনীতিক নবদীপ সুরি যিনি একসময় সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মিশরে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ছিলেন, তার বক্তব্য “Iran war is One of the pointless and destructive in the modern history this was also blatently illegal under any international law”. ইরান যুদ্ধ সমসাময়িক ইতিহাসে চূড়ান্ত ধ্বংসাত্মক এবং অকারণ এক যুদ্ধ। আন্তর্জাতিক কোন আইন দ্বারা এ যুদ্ধ সিদ্ধ নয়”।

এখন মজার বিষয় হল আমেরিকা ইসরাইল আগের ১২ (বার) এবং পরের ৫৩ (তিপ্পান্ন) দিন যুদ্ধের মাধ্যমে যা অর্জনে ব্যর্থ তা এখন আলোচনার মাধ্যমে অর্জন করতে চায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল,

ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরী করতে পারবে না,

ইরানের মওজুদ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমেরিকার কাছে হস্তান্তর করতে হবে,

ইরানকে তার দূর পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচী বন্ধ করতে হবে,

হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করে দিতে হবে,

ইরানকে তার প্রক্সি হিজবুল্লাহ, হুথি, হামাস, ইরাকী প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সাহায্য প্রদান বন্ধ করতে হবে।

এর জবাবে পাল্টা প্রস্তাব হিসাবে ইরান যা তুলে ধরেছে তা হল

ইরানের উপর আক্রমণ পরিচালনা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে,

হরমুজ প্রণালীর উপর ইরানের কর্তৃত্ব স্বীকার করে নিতে হবে,

ইরানের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে,

ইরানকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে,

ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কার্যক্রম স্বীকার করে নিতে হবে,

ইরানের জব্ধকৃত সম্পদ অবিলম্বে ফেরত দিতে হবে,

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সমূহে বিদ্যমান আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি প্রত্যাহার করে নিতে হবে।

পরস্পর দাবী পাল্টা দাবির এমন প্রেক্ষাপটে ১০ (দশ) দিনের যুদ্ধ বিরতির মাঝে আমেরিকা হুরমুজ প্রণালী দিয়ে ইরান থেকে বা ইরানের উদ্দেশ্যে জাহাজ চলাচলের উপর অবরোধের ঘোষণা দেয়। এরই মাঝে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল অবারিত বলে ঘোষণা দেয় একই সাথে আমেরিকাকেও অবরোধ তুলে নেওয়ার আহবান জানায়। আমেরিকা অবরোধ তুলে না নিলে একদিনের মাথায় ইরান পুনরায় হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণভাবে বন্ধ ঘোষণা করে, একই সাথে ইরানের উদ্দেশ্যে বা ইরান থেকে জাহাজ চলাচলের উপর অবরোধের ঘোষণাকে ইরান তার বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে উল্লেখ করে।

এমতাবস্থায় পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের নিরলস চেষ্টায় ইসলামাবাদে ইরান আমেরিকার দ্বিতীয় বৈঠক আয়োজনের আভাস বাতাসে ভাসতে থাকে। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈঠকের আবহ নষ্ট করার মত আবারো এক ঘোষণা দিয়ে বসেন, তিনি ঐ ঘোষণায় উল্লেখ করেন ইরান তাদের প্রস্তাবিত চুক্তি স্বাক্ষর না করলে ইরানকে ধূলায় মিশিয়ে দেওয়া হবে, যুদ্ধ বিরতি শেষ হলে ইরানের উপর ব্যাপক বোমা বর্ষণ করা হবে ইত্যাদি। জবাবে ইরান জানিয়ে দেয় চাপের মুখে তারা নতি স্বীকার করবে না। ইসলামাবাদে আলোচনার সব আয়োজন সত্ত্বেও, আমেরিকার আলোচক দল যাত্রার জন্য তৈরী এমন অবস্থায় ইরানীদের অনাগ্রহে সব আয়োজন স্থগিত করা হয়। এরই মাঝে উত্তেজনার পারদ আরো উপরে উঠে, আলোচনা বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার মত ঘটনা ঘটে যখন আমেরিকার ইরান থেকে বা ইরানের উদ্দেশ্যে জাহাজ চলাচলের উপর অবরোধ বাহিনী দুটি ইরানী জাহাজ আটক করে। পাশাপাশি ইরানী অবরোধ অগ্রাহ্য করে হরমুজ পাড়ি দেওয়ার চেষ্টারত দুটি জাহাজকেও ইরান আটক করে এবং অপর একটি পণ্যবাহী জাহাজে আই আর জি সি’র সদস্যরা গোলা বর্ষণের মাধ্যমে অকেজো করে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানী তেলের দাম নিম্নমুখি প্রবণতা থেকে লাফ দিয়ে আবার ব্যারেল ১০০ ডলার পেরিয়ে যায়। মন্দের ভালো ইতিমধ্যে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট আলোচনা এবং এ সংক্রান্ত একটি সমাধানে আসা পর্যন্ত যুদ্ধ বিরতির মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ইরানী পার্লামেন্ট স্পীকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ট্রাম্পের এ ঘোষণাকে পুনরায় আচমকা ইরান আক্রমণের প্রস্ত্তুতির জিরানকাল বলেই গণ্য করছেন। এরকম পরিস্থিতিতে ইরান আমেরিকার বিরুদ্ধে আরো নতুন কার্ড ব্যবহারে প্রস্ত্তুত বলেও সাফ জানিয়ে দেন। এ নতুন কার্ড বিষয়ে পরবর্তীতে আলোচনার আশা রাখি।

সবশেষে এটি উল্লেখ করে শেষ করছি, যখন কোন সুপার পাওয়ার তার শক্তিতে তুলনামূলক একটি কম শক্তির দেশকে বশ মানাতে না পারে, তখন থেকে ঐ সুপার পাওয়ারের পতন কাল শুরু।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধম্যাজিস্ট্রেট মুনীর চৌধুরী : এক অকুতোভয় যোদ্ধা
পরবর্তী নিবন্ধঢাবি সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে চবিসাসের মানববন্ধন