শেখা হোক শিক্ষার মূল লক্ষ্য

মুহাম্মদ এনামুল হক মিঠু | শনিবার , ১৩ জুন, ২০২৬ at ১০:১২ পূর্বাহ্ণ

সামপ্রতিক এক গবেষণায় ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটি গভীর ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা সামনে এনেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়া বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী এখনও পঞ্চম শ্রেণির মৌলিক দক্ষতাগুলো সঠিকভাবে আয়ত্ত করতে পারেনি। বিশেষ করে গণিত, বাংলা ও ভাষাগত দক্ষতার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ প্রত্যাশিত মানের নিচে অবস্থান করছে। এই চিত্র কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরের দুর্বলতা ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার প্রতিফলন।

বর্তমান বাস্তবতায় শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যেন ধীরে ধীরে ‘জ্ঞান অর্জন’ থেকে সরে গিয়ে ‘সিলেবাস শেষ করা’য় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করার চাপ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের ওপরই বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

অনেক শিক্ষক চাইলেও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সময় দিতে পারছেন না। ফলে যেসব শিক্ষার্থী শুরুতেই দুর্বল হয়ে পড়ে, তারা পরবর্তীতে আরও বেশি পিছিয়ে যায়। একসময় তাদের শেখার আগ্রহ কমে যায় এবং শিক্ষা হয়ে ওঠে শুধুই পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আরেকটি বড় সমস্যা হলো ঘন ঘন পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন। নতুন শিক্ষাক্রম চালুর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার অভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। শিক্ষকরা নিজেরাই যখন নতুন পদ্ধতি নিয়ে দ্বিধা ও অনিশ্চয়তায় থাকেন, তখন শিক্ষার্থীদের জন্য সেই পদ্ধতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক, সবার মধ্যেই এক ধরনের বিভ্রান্তি ও হতাশা তৈরি হয়।

শিক্ষা কখনোই শুধু বইয়ের পৃষ্ঠা শেষ করার বিষয় নয়। প্রকৃত শিক্ষা এমন একটি প্রক্রিয়া, যা একজন শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও বাস্তব জীবনের দক্ষতা গড়ে তোলে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে শুধু সনদনির্ভর শিক্ষা দিয়ে একটি জাতি এগিয়ে যেতে পারে না। প্রয়োজন দক্ষ, চিন্তাশীল ও মানবিক প্রজন্ম গড়ে তোলা। এজন্য শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সহায়তা, শিক্ষকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ, বাস্তবমুখী পাঠদান এবং পরীক্ষানির্ভর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে যে, ভালো ফলাফলই শিক্ষার একমাত্র মানদণ্ড নয়। একটি শিশু কতটা আত্মবিশ্বাসী, সৃজনশীল ও মানবিক হয়ে উঠছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ না করে তাদের শেখার আনন্দময় পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

আজকের শিখনঘাটতি যদি এখনই গুরুত্বসহকারে মোকাবিলা করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এটি আরও বড় জাতীয় সংকটে পরিণত হতে পারে। কারণ দুর্বল ভিত্তির ওপর কখনোই একটি শক্তিশালী জাতি গড়ে ওঠে না। তাই সময় এসেছে শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবার, যেখানে সিলেবাস নয়, শেখাই হবে শিক্ষার মূল লক্ষ্য।

পূর্ববর্তী নিবন্ধঝুঁকিপূর্ণ প্রাণী ব্যবস্থাপনায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক
পরবর্তী নিবন্ধজীবনের হিসেব