শুকিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের ঝিরি-ঝর্না প্রকট হচ্ছে সুপেয় পানির সংকট

প্রান্ত রনি, রাঙামাটি | শনিবার , ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:০৮ পূর্বাহ্ণ

পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার মানুষরা সারা বছর ঝিরিঝর্নার পানির ওপর নির্ভর করেই চলেন। কিন্তু শুষ্ক মৌসুম শুরু হলে অর্থাৎ ফাল্গুনচৈত্র মাসে পাহাড়ের ঝিরিঝর্নাগুলো শুকিয়ে গেলে পাহাড়ি এলাকায় দেখা দেয় তীব্র সুপেয় পানির সংকট। এসময় শুকিয়ে যায় পাথুরে কুয়ার পানিও। অনেকেই ঝিরির পাশে গর্ত করে পানি জমিয়ে রেখে পাইপ লাইনে মাধ্যমে পানি সংগ্রহ করে থাকেন। তবে গ্রীষ্মের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও প্রকট হচ্ছে সুপেয় ও ব্যবহার্য পানির সংকট।

রাঙামাটি সদর উপজেলার সাপছড়ি ইউনিয়নের ফুরমোন পাহাড়ের আগের এলাকাটি হলো সাপছড়ি যৌথখামার। এ এলাকায় প্রায় ৫০টির অধিক পাহাড়ি পরিবার বসবাস করে। বর্ষার সময় তাদের পানির জন্য কষ্ট করতে না হলেও শুষ্ক মৌসুমে বিশেষ করে মার্চ মাস থেকে তাদের সুপেয় পানির সংকট দেখা দেয়। সেই সংকট নিরসনে পাড়াবাসী মিলে গ্রাম থেকে একটু দূরে ফুরোমন পাহাড়ের নিচে ঝিরি পাশে একটি পানির পাইপ লাইন বসিয়ে পাড়াবাসীরা পানি সংগ্রহ করেন। সেখান থেকে তারা রান্না, স্নান ও সুপেয় পানি সংগ্রহ করেন। কিন্তু ইদানীং সেই ঝিরি পানি শুকিয়ে যাওয়ায় তাদের পানির জন্য বেগ পেতে হচ্ছে। ঝিরি থেকে পাইপ লাইনে অল্প কিছু পানি আসলেও তার জন্য অপেক্ষা করতে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা।

সমপ্রতি সাপছড়ি যৌথখামার এলাকায় গিয়ে কথা হয় কালিন্দী চাকমার সঙ্গে। তিনি বলেন, পাড়াবাসীরা মিলে পাহাড়ের নিচে ঝিরি পাশে একটা পানির ট্যাংক বসিয়ে সেখানে থেকে পাইপ লাইনে করে পাড়ার মধ্যে পানি সংগ্রহ করা হয়। গরমকাল আসলে পানির জন্য কষ্ট করতে হয় আমাদের। কয়েকদিন পরে কষ্ট আরও বাড়বে। সে সময় ঝিরি থেকে পাইপ লাইনে করে অল্প অল্প করে পানি আসে। তখন পানির জন্য লাইন ধরতে হয়। সকালে একবার পানি নিতে আসলে দুপুর পর্যন্ত সময় লাগে পানি পেতে।

এটি শুধু রাঙামাটি সদর উপজেলাতেই নয়, জেলার দশ উপজেলার মধ্যে বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি, কাপ্তাই, রাজস্থলীসহ অন্যান্য উপজেলার দুর্গম এলাকাগুলোতে সুপেয় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। জেলার কাপ্তাই উপজেলার ওয়াগ্‌গা ইউনিয়নের একটি গ্রাম দেবতাছড়ি। এই গ্রামে প্রায় ৭০ পরিবারে মানুষের বসবাস। সে গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি ছড়া। বিগত ১০ বছর আগেও বর্ষা মৌসুম ছাড়াও অন্যান্য মৌসুমে ছড়ায় পানি থাকলেও এখন ছড়াটি শুকিয়ে গিয়ে প্রায় মৃত অবস্থা। দেবতাছড়ি গ্রামের বাসিন্দা লিটন তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, আমরা ছোট বেলায় এই ছড়াতে স্নান (গোসল) করতাম। পাড়ার লোকজন সবাই ঘরে যাবতীয় কাজ ছড়ার পানি দিয়ে করত। বিগত ১০ বছর আগেও ছড়াতে পানি ছিল। কিন্তু এখন বর্ষা মৌসুম ছাড়া বাকি মৌসুমে ছড়াটি শুকিয়ে যায়। এখন ছড়াটি শুকিয়ে গেছে। পানির জন্য কষ্ট করতে হয়। যাদের সামর্থ্য আছে তারা টিউবওয়েল বসিয়ে মোটর দিয়ে পানি তুলে আর যাদের সামর্থ্য নেই তাদেরকে দূর থেকে কুয়ার পানি সংগ্রহ করতে হয়। কিছু কিছু জায়গায় কুয়ার পানিও পাওয়া যায় না।

পার্বত্য চট্টগ্রামে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে ‘বায়োডাইভার্সিটি কনজারভেশন সোসাইটি অব সিএইচটি’। সংগঠনটি প্রতিষ্ঠাতা সংগঠক প্রকৌশলী সবুজ চাকমা বলেন, বর্তমানে পানি সংকটের প্রধানতম কারন হলো প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হওয়া। প্রাকৃতিক বনকে ধ্বংস করে কৃত্রিমভাবে সেগুনসহ বিভিন্ন ধরনের মনোকালচারের (একক প্রজাতির গাছের বাগান) কারণে পাহাড়ের ঝিরি,ঝর্ণা ও ছড়ার পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে সময় পানির প্রয়োজন সে সময় খরা এবং যে সময় কম প্রয়োজন সে সময় অতিমাত্রায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে। যার ফলে দীর্ঘ খরার কারণে পাহাড়ে পানির উৎসে পানি শুকিয়ে যায়।

এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাঙামাটি জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পরাগ বড়ুয়া বলেন, পাহাড়ি এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এবং মানুষের যে প্রাত্যহিক চাহিদা তা স্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পানির কিছুটা সংকট হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করতেছি সে সব সংকট কবলিত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে যেখানে পানির সংকটটা বেশি দেখা দিচ্ছে সেগুলো গুরুত্ব দিয়ে আমরা আমাদের কাজগুলো বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে নিউমোনিয়া রোগীর চাপ
পরবর্তী নিবন্ধতদন্ত কর্মকর্তা ছাড়াই চলছে কর্ণফুলী থানা