সারাদিন পেটে একমুঠো ভাত নেই। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। ছিন্নমূল ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের এ ক্ষুধার যন্ত্রণার সুযোগ নেয় মাদককারবারীরা। মাত্র দুইশ টাকার লোভ দেখিয়ে অন্য একজনের কাছে একটি পোটলা পৌঁছে দিতে বলে তাকে। টাকা পেলে জুটবে খাবার– তাই পোটলা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বটি নেয় সেই কিশোর। তবে এ দায়িত্ব খাবার নয়, বরং চরম বিপর্যয় টেনে আনে তার জীবনে। কারণ, সেই পোটলায় ছিল একুশ পিস ইয়াবা। কিশোরের হাতে ইয়াবার পোটলা থাকার বিষয়টি স্থানীয় জনতা বুঝতে পেরে তাকে আটক করে। পরে বেদম পিটুনি দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। মাদক বহনের দায়ে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতেও প্রেরণ করে। কিন্তু কাঠগড়ায় দাঁড় করাতেই উন্মোচিত হয় এক অন্যরকম চিত্র। চট্টগ্রাম শিশু আদালত–১ এর ভারপ্রাপ্ত বিচারক মোহাম্মদ সাইফুর রহমানের একটি যুগান্তকারী আদেশে পরিষ্কার হয়ে যায়–মাদক মামলার আসামি হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এই কিশোর কোনো পেশাদার অপরাধী নয়, বরং সে নিজেই এক নির্মম চক্রের অসহায় শিকার বা ‘ভিকটিম’! গত ১৬ আগস্ট দেওয়া এই আদেশে আদালত এমন সব আইনি ও বাস্তব দিক সামনে নিয়ে আসেন, যা আমাদের বিচার ব্যবস্থার এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী আদেশ বলছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
আদালত সূত্র জানায়, গত ১৫ আগস্ট রাত সাড়ে নয়টার দিকে নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন তামাকুমুণ্ডি লেইন এলাকা থেকে ষোলো বছরের শিশু নিলয়কে (ছদ্মনাম) স্থানীয়দের কাছ থেকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ–বিক্রির উদ্দেশ্যে তার কাছে ২১ পিস ইয়াবা ছিল, যার ওজন দুই গ্রাম। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়ের করা হয়।
আদালত সূত্র আরও জানায়, মারধর পরবর্তী শিশুটিকে একটি কক্ষে আটকে রেখেছিল মারধরকারীরা। সেখান থেকে উদ্ধার করে পুলিশ শিশুটিকে পরদিন আদালতে উপস্থাপন করে। কিন্তু জিম্মাদার না থাকায়, অভিভাবক কিংবা প্রবেশন কর্মকর্তা অনুপস্থিত থাকায় সেদিন তাকে জামিনে মুক্তি দিতে চেয়েও পারেননি বিচারক। তাকে সেদিন পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে। পরে গত ১৯ আগস্ট অভিভাবক ও প্রবেশন কর্মকর্তার উপস্থিতিতে শিশুটিকে জামিন দেওয়া হয়। তবে এখানেই শেষ নয়; শিশুটিকে মারধরের ঘটনায় পুলিশের রহস্যজনক নীরবতা এবং থানায় নিয়ে গিয়ে তার ছবি তোলা ও উক্ত ছবি নথিতে যুক্ত করাসহ আইন লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা চেয়ে আগামী ২৬ আগস্ট মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে সশরীরে তলব করেছেন বিচারক।
ক্ষুধার সুযোগ নেওয়া এক চক্র, আর উন্মত্ত জনতা রোষ : আদালতের খাস কামরায় শিশুটি জানায়, ক্ষুধার জ্বালায় সে ওই পরিস্থিতিতে পড়েছিল উল্লেখ করে আদেশে আদালত বলেন, শিশু আইন, ২০১৩–এর ৭৯(১) ধারা অনুযায়ী, কোনো শিশুকে দিয়ে মাদক বা নিষিদ্ধ বস্তু বহন করানো একটি স্বতন্ত্র ও গুরুতর অপরাধ। অর্থাৎ, যে স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি বা চক্রটি তার চরম ক্ষুধার সুযোগ নিয়ে এই মরণঘাতী মাদকের বাহক বানিয়েছিল, তারা আড়ালে চলে গেছে। এদিকে পোটলা উদ্ধারের পর সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনায় স্থানীয় জনতা বা ব্যবসায়ীরা ক্ষিপ্ত হয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেয় এবং শিশুটিকে বেদম মারধর করে আহত করে। অর্থাৎ, মাদক বহন করানোর ঘটনাটি এক বিষয়, আর উত্তেজিত জনতার মারধরের ঘটনাটি সম্পূর্ণ আলাদা আরেকটি পরিস্থিতি। কিন্তু আসল মাদককারবারী এবং শিশুটিকে মারধরকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেলেও পুলিশ কেবল আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে ছিন্নমূল শিশুটিকেই।
নথিতে স্বীকারোক্তি, অথচ পুলিশ ছিল নিশ্চুপ : আদালত সূত্র জানায়, শিশুটিকে আদালতে উপস্থাপন সংক্রান্ত ফরওয়ার্ডিং ও গ্রেপ্তার স্মারকেই স্পষ্ট লেখা ছিল যে, পুলিশ পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় জনতা শিশুটিকে পিটিয়ে আহত করে আটকে রাখে এবং তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এখানেই প্রশ্ন তুলেছে আদালত–একটি শিশুকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে জখম করার মতো আমলযোগ্য অপরাধের তথ্য খোদ পুলিশের নথিতে থাকার পরও তারা কেন কোনো মামলা বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করল না? বিচারক তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মাদক উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশ নিজে বাদী হয়ে আলামত জব্দসহ মামলা করল, অথচ শিশুটিকে পেটানোর ঘটনা ঘটলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। কিংবা যারা শিশুটিকে মাদকের বাহক বানিয়েছিল তাদের বিষয়েও কোনো পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। আইনের এই দ্বিমুখী আচরণ সংবিধানে বর্ণিত নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও আইনের সমান আশ্রয়ের চরম পরিপন্থী।
বিচারকের দূরদর্শী পদক্ষেপে মিলল আলোর রেখা : আদালত সূত্র জানায়, আইনের মারপ্যাঁচে হারিয়ে যেতে বসা এই ছিন্নমূল শিশুর ভাগ্য বদল এবং বিচারব্যবস্থার ত্রুটি সংশোধনে আদালত কিছু ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রথমত, গত ১৯ আগস্ট প্রবেশন কর্মকর্তা ও অভিভাবকের উপস্থিতিতে শিশুটিকে পরিবারের জিম্মায় জামিন দিয়েছেন বিচারক। দ্বিতীয়ত, শিশুকে যারা মাদক বহনে ব্যবহার করেছে (মূল চক্র) এবং যারা তাকে মারধর করেছে–উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে আলাদা ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তৃতীয়ত, শিশু আইন লঙ্ঘন করে নথিতে কিশোরের ছবি তোলা ও সেই ছবি যুক্ত করার কৈফিয়ত দিতে আগামী ২৬ আগস্ট তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করা হয়েছে। সর্বশেষ, ছিন্নমূল শিশুটির পক্ষে আইনি লড়াই চালাতে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ করার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
আইন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারক যেভাবে ‘অভিযুক্ত আর ভিকটিমের’ মধ্যকার অদৃশ্য রেখাটি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, তা আমাদের বিচারালয়ে এক বিরল এবং সাহসিকতাপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। মানবাধিকার আইনজীবী ও সিনিয়র আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসান দৈনিক আজাদীকে বলেন, আদালত দারুণ একটি আদেশ দিয়েছেন। এ আদেশ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। শিশুকে যারা মাদকের বাহক বানিয়েছেন, সেই সাথে তাকে যারা মারধর করে জখম করেছেন– তাদের বিষয়ে থানা পুলিশ কী ব্যবস্থা নিচ্ছে সেটি এখন দেখার বিষয়। মনে রাখতে হবে, শিশু মাদক বহন করে যেমন অপরাধ করেছে, একইভাবে তাকে যারা বাহক বানিয়েছে কিংবা তাকে যারা মারধর করেছে তারাও কিন্তু অপরাধ করেছে। সিনিয়র এ আইনজীবী জানান, আদেশে আদালত এও বলেছেন যে, অপরাধের বিচার করবে আদালত, রাস্তার জনতা নয়।












