লো-ফিডে উৎপাদন, ডেথস্টক ব্যবহার শুরু

ইস্টার্ন রিফাইনারি । চারটি ইউনিটের মধ্যে দুইটি বন্ধ । সরবরাহ চেইনে প্রভাব পড়বে না-দাবি বিপিসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের

হাসান আকবর | বৃহস্পতিবার , ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ

দেশের জ্বালানি তেলের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব একমাত্র শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল) ‘লোফিডে’ উৎপাদন চালাচ্ছে। চারটি ইউনিটের মধ্যে দুইটি ইউনিট বন্ধ করে বাকি দুইটিতে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালানো হচ্ছে। একইসাথে ইস্টার্ন রিফাইনারির ‘ডেথস্টক’ ব্যবহার শুরু করা হয়েছে। ডেথস্টকে ২৫ হাজার টন ক্রুড রয়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে ডিজেল, পেট্রোল এবং বিটুমিন উৎপাদন করা হচ্ছে।

রিফাইনারির উৎপাদন লো ফিডে করা হলেও এর কোন প্রভাব সরবরাহ চেইনে পড়বে না বলে দাবি করে বিপিসির শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছেন, গতকাল ৬২ হাজার টন ডিজেল নিয়ে দুইটি জাহাজ বন্দরে পৌঁছেছে। ইতোমধ্যে বন্দরে পৌঁছানো অপর একটি জাহাজ থেকে ১২ হাজার টন জেট ফুয়েল খালাস করা হচ্ছে। আগামী ১৮ এপ্রিল আরো দুইটি জাহাজে ৬০ হাজার টনের বেশি ডিজেল আসছে বলেও সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রেক্ষাপটের কারণে ক্রুড অয়েল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটায় দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দৈনিক সাড়ে চার হাজার টন ক্রুড অয়েল ইআরএল পরিশোধন করতো। বর্তমানে লো ফিডে চালাতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের চারটি ইউনিটের দুইটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বাকি দুইটিতে দেড় থেকে দুই হাজার টন ক্রুড পরিশোধন করে ডিজেল পেট্রোল এবং বিটুমিন উৎপাদন করা হচ্ছে। ফলে ইস্টার্ন রিফাইনারির উৎপাদন কমে গেছে। তবে বিকল্প উৎস থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি জোরদার করায় সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো প্রভাব পড়বে না বলে জানিয়েছেন বিপিসির কর্মকর্তারা। তারা বলেন, দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব একমাত্র জ্বালানি তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) মূলত সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকো থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এডিএনওসি থেকে মারবান ক্রুড অয়েল আমদানি করে পরিশোধন করে থাকে।

ইআরএল বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন জ্বালানি তেল উৎপাদন করে। যা দেশের মোট চাহিদার অন্তত ২০ শতাংশ। বিপিসির তথ্যমতে, ২০২৪২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ডিজেলের চাহিদা ছিল ৪৭ লাখ ৪২ হাজার টন, যার মধ্যে ইআরএল থেকে সরবরাহ হয়েছে ৭ লাখ ৩২ হাজার ২৩০ টন অর্থাৎ প্রায় ১৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

একই সময়ে পেট্রোলের মোট চাহিদার ১১ দশমিক ৯২ শতাংশ ইআরএল থেকে সরবরাহ করা হয়েছে। ২০২৪২৫ অর্থবছরে পেট্রোলের চাহিদা ছিল ৪ লাখ ৮৯ হাজার টন, এর মধ্যে ইআরএল থেকে সরবরাহ হয়েছে ৫৮ হাজার ৩০৯ টন। এছাড়া ফার্নেস অয়েল, কেরোসিন ও বিটুমিনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উপজাত হিসেবে ইআরএল থেকে পাওয়া যায়।

সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মার্চ ও এপ্রিল মাসে নির্ধারিত মোট ৩ লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানি ব্যাহত হয়েছে। এর মধ্যে মার্চ মাসে নির্ধারিত ১ লাখ টনের অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল নরডিঙ পল্যাঙ নামের একটি জাহাজে লোড করা হলেও সেটি যাত্রা করতে পারেনি। হরমুজ অতিক্রম করতে না পারায় জাহাজটি কবে নাগাদ দেশে পৌঁছাবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। জাহাজটি বর্তমানে সৌদি আরবের একটি বন্দরে অবস্থান করছে। একই মাসের দ্বিতীয় চালানে এক লাখ টন মারবান ক্রুড সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অনিবার্য পরিস্থিতিতে ফোর্স ম্যাজিউর ঘোষণা করেছে। ফলে এই জাহাজের ক্রুডও দেশে পৌঁছানো অনিশ্চিত। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বিকল্প পথে ক্রুড অয়েল আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চলতি মাসের নির্ধারিত ১ লাখ টন অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড কার্গো আগামী ২০ এপ্রিল লোডিং শেষে লোহিত সাগরের বিকল্প রুট ব্যবহার করে ২ অথবা ৩ মে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। মে মাসে আরো এক জাহাজ ক্রুড বিকল্প পথে চট্টগ্রামে আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক।

বিপিসির ক্রুড অয়েল পরিবহনে জাহাজ ভাড়া করা থেকে শুরু করে সবকিছুই বিএসসি করে থাকে। বিপিসির পদস্থ কর্মকর্তারা বলেছেন, মে মাসের শুরুতে দেশে ক্রুড পৌঁছালে ইআরএল পুরোদমে উৎপাদন শুরু করবে। ইত্যবসরে ইআরএল’র বার্ষিক রক্ষনাবেক্ষন কাজ সম্পন্ন করা হবে বলেও সূত্রগুলো জানিয়েছে।

অপরদিকে জ্বালানি মন্ত্রনালয় গতকাল জানিয়েছে, জরুরি চাহিদা মেটাতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আরও ১ লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানির জন্য মন্ত্রিসভার অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে নির্ধারিত ক্রুড অয়েল সময়মতো না পৌঁছানোয় ইআরএলকে লোফিড অবস্থায় চালু রাখা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির মোট চারটি ইউনিটের মধ্যে দুটি রক্ষণাবেক্ষণে থাকলেও বাকি দুটি ইউনিট চালু রয়েছে।

তবে সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি জোরদার করেছে। নিয়মিত আমদানির পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে সরাসরি ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে সরবরাহে কোনো ঘাটতি না হয়।

এরই অংশ হিসেবে গতকাল সিংগাপুর এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে ৬২ হাজার টন ডিজেল নিয়ে দুইটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। আগামী ১৮ এপ্রিল আরো দুইটি জাহাজ ডিজেল নিয়ে চট্টগ্রামে আসছে। গতরাতেও একটি জাহাজ থেকে ১২ হাজার টন জেট ফুয়েলের খালাস কার্যক্রম চলছিল বলে উল্লেখ করে বিপিসির শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছেন, দেশে জ্বালানি তেলের আপাতত কোন সংকট নেই। অন্ততঃ ইআরএলের উৎপাদন লো ফিডে যাওয়া দেশের জ্বালানি খাতে কোন প্রভাব ফেলবে না বলেও তারা জানিয়েছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধশহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে কালুরঘাট সেতু নামকরণের প্রস্তাব
পরবর্তী নিবন্ধবর্ষবরণে প্রাণের উচ্ছ্বাস