ঐতিহাসিক আবদুল জব্বারের বলি খেলা চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চট্টগ্রামে জব্বারের এই বলীখেলা এবং বৈশাখী মেলা এখন চট্টগ্রামবাসীর বিনোদনের অন্যতম অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী ১২ বৈশাখ, ২৫ এপ্রিল শনিবার আবদুল জব্বারের বলীখেলা অনুষ্ঠিত হবে। এদিন বিকাল ৩টায় শুরু হবে ঐতিহাসিক বলীখেলার ১১৭তম আসর। তার আগে আগামীকাল শুক্রবার বৈশাখী মেলা শুরু হবে। প্রতিবছর বৈশাখী মেলা ৩ দিন অনুষ্ঠিত হলেও এ বছর বৈশাখী মেলা ২৪ এপ্রিল শুক্রবার এবং ২৫ এপ্রিল শনিবার ২ দিন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২৬ এপ্রিল রোববার এসএসসি পরীক্ষা থাকায় এবং পার্শ্ববর্তী মুসলিম হাই স্কুল এসএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র হওয়ায় রোববার ভোরে মেলা শেষ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
আবদুল জব্বারের বলীখেলা উপলক্ষে গতকাল বুধবার এক সংবাদ সম্মেলন লালদীঘি পাড়স্থ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন লাইব্রেরি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বলীখেলা আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও আব্দুল জব্বার সওদাগরের নাতি শওকত আনোয়ার বাদল। তিনি জানান, এবারের বলীখেলা উদ্বোধন করবেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। খেলা শেষে প্রধান অতিথি হিসেবে বিজয়ী বলিদের হাতে ক্রেস্ট ও প্রাইজমানি তুলে দেবেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন চট্টগ্রাম–৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান এবং স্পন্সর প্রতিষ্ঠান বাংলা লিংকের কর্মকর্তা সাঈদ হোসেন চৌধুরী।
সংবাদ সম্মেলনে আরো জানানো হয়, এবারের বলীখেলা ও দেশের সর্ববৃহৎ বৈশাখী মেলা সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানে মেট্রোপলিটন পুলিশ ও র্যাবের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মূল ভেন্যুর নিরাপত্তায় ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন, ফুট পেট্রোল ডিউটি, রুফ–টপ ডিউটি, ডিবি টিম মোতায়েন, স্পেশাল রিজার্ভ পুলিশ মোতায়েন, কুইক রেসপন্স টিম গঠন, সোয়াট ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, ডগ স্কোয়াড (কে–নাইন), স্ট্যান্ডবাই ফোর্স, র্যাবের বিশেষ ফোর্সসহ ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সে সাথে বৈশাখী মেলা চলাকালীন প্রধান সড়ক, বিশেষ করে মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দপ্তর থেকে জেলা পরিষদ মার্কেটের সামনে হয়ে সিনেমা প্যালেস পর্যন্ত সড়ক ও কোতোয়ালী থানা সড়কে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা এবং কোনো অবস্থাতে এ সড়কের উপর মেলা না বসানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। মেলায় চাঁদাবাজি ও ছিনতাই রোধকল্পে ব্যবস্থা গ্রহণ, অশ্লীল গান–নৃত্য পরিবেশনা নিষিদ্ধ এবং কোনো প্রকার জুয়ার আসর না বসানো, সন্দেহজনক কাউকে পাওয়া গেলে আইন–শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে সোপর্দ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের নেতৃত্বে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা এবং লালদীঘি মাঠ বা সুবিধাজনক স্থানে ফায়ারের গাড়ি স্ট্যান্ডবাই রাখা সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দোকান বিক্রি, দখল, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে আইনশৃংখলা বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবেন বলে জানানো হয়। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্পের উদ্যোক্তারা মেলায় আসতে শুরু করেছে। বলী খেলাকে ঘিরে অনুষ্ঠিত বৈশাখী মেলায় চট্টগ্রামের লাখ লাখ নারী পুরুষ উপস্থিত হয়ে বাসা বাড়ির নানান সরঞ্জাম কিনে থাকেন এবং এক প্রকার উৎসবে মেতে উঠেন।
গতকাল সংবাদ সম্মেলনে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রামের এই ঐতিহ্য আবদুল জব্বারের বলীখেলা ও বৈশাখী মেলা চট্টগ্রামকে বিশ্বমঞ্চে বিশেষভাবে পরিচিতি দিচ্ছে। তিনি জানান, গতবার লালদীঘি চত্বরকে আবদুল জব্বার চত্বর ঘোষণা করার দাবি উঠেছিল। এবার তা একটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার মাধ্যমে আমি বাস্তবায়ন করে দিয়েছি। এবারের বলীখেলা আয়োজনে এটি নতুন মাত্রা যোগ করবে। তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং বলীখেলা অনুষ্ঠানের সময় তাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন আবদুল জব্বারের বলীখেলা ও বৈশাখী মেলা আয়োজক কমিটির সভাপতি হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বলীখেলার ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে তারা কাজ করছেন। একইসঙ্গে মরহুম আবদুল জব্বার সওদাগরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান এবং চট্টগ্রামে একটি বলীখলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবিও জানান হয়।
হাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে ও কমিটির সদস্য আলী হাসান রাজুর পরিচালনায় এ সময় উপস্থিত ছিলেন চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন, প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান সোহেল, সদস্য খোরশেদ আনোয়ার বাবুল, আকতার আনোয়ার চঞ্চল, জাহাঙ্গীর আলম, মো. সেলিম, আবদুল করিম, হারুন জামান, ইসমাইল বালি, এস এম আবদুল্লাহ আকতার, মো. বেলাল প্রমুখ।
লালদীঘি চত্বর এখন আবদুল জব্বার চত্বর : মরহুম আবদুল জব্বারের পরিবার এবং বলীখেলার আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক লালদীঘি চত্বরকে আবদুল জব্বার চত্বর হিসেবে ঘোষণা করার দাবি বিভিন্ন সময় বার বার করা হচ্ছিল। এই দাবির প্রেক্ষিতে গতবছর বলীখেলায় প্রধান অতিথি সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন ঐতিহাসিক লালদীঘি চত্বরকে আবদুল জব্বার চত্বর হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। সেই ঘোষণার আলোকে গতকাল বুধবার দুপুরে লালদিঘী চত্বরে বলীখলার প্রতিকৃতি সম্বলিত ম্যুরালের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এসময় জব্বারের বলীখেলার প্রবর্তক আব্দুল জব্বারের নামানুসারে চত্বরটির নাম ‘জব্বার চত্বর’ নামকরণ করা হয়েছে। নবনির্মিত ম্যুরালে টেরাকোটার ত্রিভুজ আকৃতির এ চত্বরের একদিকে রাখা হয়েছে বলীখেলার প্রতিকৃতি, একপাশে হাতুরির প্রতিকৃতি দিয়ে ন্যায় বিচারের পীঠস্থান আর অপর পাশে দুই হাতে শেকল ভাঙ্গার প্রতিকৃতি দিয়ে লালদিঘীর ইতিহাস লেখা হয়েছে।
সিটি মেয়র বলেন, আমি মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারা আমার কাছে অনুরোধ করেছিল এ চত্বরকে আব্দুল জব্বার চত্বর হিসেবে ঘোষণা করার। আমি তাদের কথা দিয়েছিলাম। আজকে সেটার উদ্বোধন করছি। আমরা এখানে এমন একটি ম্যুরাল নির্মাণ করেছি যা বলীখেলা, বীর চট্টলার সংগ্রামী ঐতিহ্য এবং আদালতে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির চেতনাকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরে। চট্টগ্রামের এ বলীখেলার ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মকে জানাতে হবে এই ভাবনা থেকে এই ম্যুরালটি নির্মাণ করা হল। মেয়র বলেন, ১৯০৯ সালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুবকদের শারীরিকভাবে প্রস্তুত করতে মরহুম আবদুল জব্বার সওদাগর এ বলীখেলার সূচনা করেন। সেই ধারাবাহিকতায় যুগের পর যুগ ধরে এটি চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান লোকজ উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই চত্বরকে মরহুম আবদুল জব্বারের নামে দৃষ্টিনন্দন চত্বর নির্মাণ করায় চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে মরহুম আবদুল জব্বারের পরিবারের পক্ষ থেকে এবং মেলা কমিটির পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।
উল্লেখ্য, আজ থেকে প্রায় ১১৭ বছর আগে চট্টগ্রাম শহরের বদরপাতির বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মরহুম আবদুল জব্বার সওদাগর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বলীখেলার আড়ালে এ অঞ্চলের যুবকদের শারীরিকভাবে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রস্তুত করতে ১৯০৯ সালের ১২ বৈশাখ লালদীঘি ময়দানে বলী খেলা শুরু করেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর ১২ বৈশাখ ২৫ এপ্রিল এই বলী খেলা আয়োজন করা হচ্ছে। এবারের বলী খেলার আসর হবে ১১৭তম। খেলায় অংশ নিতে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বলীরা যোগাযোগ শুরু করেছেন।













