১০ শতাংশ ভাড়া বাড়ছে দেশের পণ্য সরবরাহের সবচেয়ে বড় নেটওয়ার্ক অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন খাতে। নৌপরিবহন অদিপ্তরের মহাপরিচালকের উদ্যোগে জাহাজ মালিক, আমদানিকারক এবং সরকারের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে ১০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর ব্যাপারে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিষয়টি প্রস্তাবাকারে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলে ১০ শতাংশ বর্ধিত ভাড়া নির্ধারিত হবে। তবে এই ভাড়া কার্যকর হবে গত ১৯ এপ্রিল থেকে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে জাহাজভাড়া বাড়ছে।
সূত্র জানায়, বিশ্বের নানা দেশ থেকে আমদানিকৃত কোটি কোটি টন পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে খালাস করা হয় লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে। এসব পণ্য দেশের অভ্যন্তরে পরিবহন করা হয় এই জাহাজে। এটিই দেশের অভ্যন্তরে পণ্য সরবরাহের সবচেয়ে বড় নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কেই চট্টগ্রাম বন্দরে খালাসকৃত পণ্য দেশব্যাপী সরবরাহ হয়ে থাকে। প্রায় ১৫শ’ লাইটারেজ জাহাজ এই বিপুল পরিমান পণ্য খালাস করে। মাদার ভ্যাসেল থেকে নামানো পণ্য কর্ণফুলী নদীর ষোলটি ঘাটের পাশাপাশি দেশের নানা অঞ্চলের অন্তত ৬০টি গন্তব্যে প্রেরণ করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত লাইটারেজ জাহাজগুলোর সিংহভাগই বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিদিন বার্থিং সভা করে বিডব্লিউটিসিসি মাদার ভ্যাসেলের বিপরীতে চাহিদানুযায়ী লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দেয়। যেগুলো বহির্নোঙরে গিয়ে মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাস করে। অপরদিকে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন জাহাজগুলো ডিব্লিউটিসিসি’র সিরিয়ালভুক্ত না হয়ে নিজেদের পণ্য নিজেরাই পরিবহন করে।
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরের পাশাপাশি বন্দরের ভিতরেও জাহাজের ওভারসাইড থেকে পণ্য পরিবহন করে লাইটারেজ জাহাজগুলো। আবার বহির্নোঙরে ড্রাফট কমানোর জন্যও কিছু পণ্য লাইটারেজ জাহাজে খালাস করা হয়। পরবর্তীতে ড্রাফট কমানোর পর ওই জাহাজটি বাকি পণ্য বন্দরের জেটিতে এসে পণ্য খালাস করে। সবকিছু মিলে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন রুটে পণ্য পরিবহন এবং দেশব্যাপী সাপ্লাই চেইন ঠিকঠাক রাখার জন্য লাইটারেজ জাহাজ সেক্টর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে বহু বছর ধরে। ঠিকঠাকভাবে লাইটারেজ জাহাজ পরিচালিত না হলে দেশব্যাপী পণ্য সরবরাহ নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে। দেশের আমদানিকৃত প্রায় সব পণ্যই এই লাইটারেজ জাহাজের উপর নির্ভরশীল। পরিবাহিত পণ্যের সাথে লাইটারেজ জাহাজ ভাড়া যোগ হয়ে যায়। যা বাজার পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলে।
লাইটারেজ জাহাজগুলো পরিচালনা করতে প্রচুর ডিজেল লাগে। এক একটি জাহাজ চট্টগ্রাম থেকে দেশের নানা গন্তব্যে যাতায়ত করে ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার লিটার পর্যন্ত জ্বালানি তেল নিয়ে থাকে। সরকার ইতোমধ্যে ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে বেসরকারি আইসিডি, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, কন্টেনার মুভার, বাসসহ সব ধরণের যানবাহনের ভাড়া বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। লাইটারেজ জাহাজ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলও জাহাজ ভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি সরকারিভাবে সম্পন্ন করার জন্য বিডব্লিউটিসিসি নৌ পরিবহন দফতরের মহাপরিচালকের উদ্যোগে সাড়া দিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর শফিউল বারীর সভাপতিত্বে অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে উচ্চ পর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিডব্লিউটিসিসির আহ্বায়ক হাজী সফিক আহমেদ, বিভিন্ন আমদানিকারকদের সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, আমদানিকারক এবং সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ত্রিপক্ষীয় এই বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা শেষে লাইটারেজ জাহাজের ভাড়া ১০ শতাংশ বাড়ানোর ব্যাপারে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
সভার কার্যবিবরণীসহ ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি প্রস্তাবাকারে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পাওয়ার পরই ভাড়ার হার নির্ধারিত হবে। তবে বর্ধিত ভাড়া গত ১৯ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে বিডব্লিউটিসিসির আহ্বায়ক হাজী সফিক আহমেদ গতকাল দৈনিক আজাদীকে জানিয়েছেন।
দেশব্যাপী পণ্য পরিবহনে ভাড়া বৃদ্ধি দেশের বাজারে বেশ প্রভাব ফেলবে বলে আশংকা প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, জাহাজভাড়া ১০ শতাংশ বেড়ে গেলে তা শুধু ভোগ্যপণ্যই নয়, বিভিন্ন কারখানার কাঁচামাল পরিবহনেও খরচ বেড়ে যাবে। যা দেশের সার্বিক উৎপাদন প্রক্রিয়া নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেও সূত্রগুলো মন্তব্য করেছে।













