যুদ্ধের অবসানে শান্তি আলোচনা চালিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত মঙ্গলবার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি এ ঘোষণা দেন। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনা আগামীকাল শুক্রবারের মধ্যেই শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। গতকাল বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক পোস্টকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প এবং পাকিস্তানি কর্মকর্তারা উভয়ই এই সম্ভাবনার কথা নিশ্চিত করেছেন।
পত্রিকাটি জানায়, পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে আগামী ‘৩৬ থেকে ৭২ ঘণ্টার’ মধ্যেই নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরুর বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াশিংটন পোস্টকে পাঠানো এক টেক্সট বার্তায় ট্রাম্প সংক্ষিপ্তভাবে লেখেন, এটি সম্ভব! এই সম্ভাবনার খবর আসে এমন এক সময়, যখন ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধ বন্ধে একটি ‘ঐক্যবদ্ধ প্রস্তাব’ না আসা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে দেবে। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই তিনি সেটিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। এই পদক্ষেপের পর থেকেই পাকিস্তানের মাধ্যমে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার হয়েছে, যা নতুন আলোচনার পথ তৈরি করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ট্রাম্প জানান, শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের অনুরোধে তিনি সম্মতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইরানের নেতা ও প্রতিনিধিরা ‘একটি সমন্বিত প্রস্তাব নিয়ে আসার আগ পর্যন্ত’ দেশটিতে হামলা স্থগিত রাখার অনুরোধে তিনি রাজি হয়েছেন। দুই সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া এ যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের প্রস্তাব জমা দেওয়া এবং আলোচনা কোনো একটি চূড়ান্ত পরিণতিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত’ এটা কার্যকর থাকবে।
তবে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি বাস্তবসম্মত হবে না যদি নৌ–অবরোধ অব্যাহত থাকে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা না কমে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এঙে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, নৌ–অবরোধের মাধ্যমে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে রাখা হলে তা যুদ্ধবিরতির চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে। তিনি আরও বলেন, সব ফ্রন্টে ইসরায়েলি সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধ না হলে এবং আক্রমণাত্মক মনোভাব না কমলে কোনো যুদ্ধবিরতি অর্থবহ হতে পারে না। এই প্রেক্ষাপটে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করেন। গালিবাফ একইসঙ্গে জোর দিয়ে বলেন, সামরিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানের কাছ থেকে কোনো ধরনের ছাড় আদায় সম্ভব নয়। তার ভাষায়, সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে তারা তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, চাপের মুখেও পারবে না। একমাত্র পথ হলো ইরানি জাতির অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, পাকিস্তানের যুদ্ধবিরতির আহ্বানের পর ইরান পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে বলা হয়, ইরান তাদের জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় ‘প্রয়োজনীয় ও যথাযথ ব্যবস্থা’ নিতে প্রস্তুত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, কূটনীতি ইরানের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। তবে তা তখনই প্রয়োগ করা হবে, যখন উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হবে এবং জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির–সাঈদ ইরাভানি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র নৌ–অবরোধ তুলে নিলে ইরান আবার আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তার মতে, অবরোধ প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে নতুন দফার আলোচনা শুরু হতে পারে। তবে তিনি শর্ত দেন–যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বন্ধ করতে হবে। ইরাভানি আরও সতর্ক করে বলেন, তারা যদি রাজনৈতিক সমাধান চায়, আমরা প্রস্তুত; আর যদি যুদ্ধ চায়, ইরান সেটির জন্যও প্রস্তুত।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় রয়েছে পাকিস্তান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক ব্যবহার করে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন। তাদের অনুরোধেই ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি সেটিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যকর রাখার সিদ্ধান্ত নেন বলে জানা গেছে। মূল লক্ষ্য ছিল কূটনৈতিক আলোচনার জন্য সময় সৃষ্টি করা। শুরু থেকেই দুই পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে পাকিস্তান, এবং সেই প্রচেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইরানি রাষ্ট্রদূতের বৈঠক হয়েছে এবং আলোচনা প্রক্রিয়া চলছে। পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া একটি প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে এবং একটি টেকসই চুক্তির দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে।
এদিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ইরানি গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, আইআরজিসি তিনটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে এবং অন্তত দুটি জাহাজ জব্দ করেছে। ফার্স নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, ‘ইউফোরিয়া’ নামের একটি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং সেটি বর্তমানে ইরানের উপকূলের কাছে অবস্থান করছে। পাশাপাশি ‘এমএসসি ফ্রানচেস্কা’ এবং ‘এপামিনোন্দাস’ নামের দুটি জাহাজ জব্দ করে ইরানের জলসীমায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আইআরজিসির নৌবাহিনীর দাবি, এসব জাহাজ অনুমতি ছাড়া চলাচল করছিল এবং বারবার নিয়ম ভঙ্গ করেছে। তারা আরও অভিযোগ করে, জাহাজগুলো গোপনে প্রণালি ত্যাগের চেষ্টা করছিল এবং তাদের নেভিগেশন সিস্টেমে কারচুপি করা হয়েছিল। এসব দাবির স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি। আইআরজিসি সতর্ক করে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে চলাচল কঠোরভাবে নজরদারিতে রাখা হচ্ছে এবং নিয়ম ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন আন্তোনিও গুতেরেস। তার মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক এক বিবৃতিতে জানান, এই পদক্ষেপ উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এবং কূটনৈতিক পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হবে। জাতিসংঘ সব পক্ষকে এই সুযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছে এবং এমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে, যা যুদ্ধবিরতিকে ব্যাহত করতে পারে। পাশাপাশি একটি টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে গঠনমূলক আলোচনায় অংশ নিতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। গুতেরেস পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাকেও পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন, এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ তৈরি করতে সক্ষম হবে।
সামগ্রিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হলেও বাস্তবতা এখনো জটিল। একদিকে কূটনৈতিক তৎপরতা ও যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে ইতিবাচক দিকে নিচ্ছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা, নৌ–অবরোধ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস আলোচনার পথে বড় বাধা হয়ে আছে।













