মাদকের বিরুদ্ধে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান চালাতে গিয়ে নারকোটিক্সের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের অনেকে প্রায়শ হামলার শিকার হচ্ছেন। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, সমপ্রতি রাজধানীর মগবাজারে অভিযানে গিয়ে এক পরিদর্শক গুলিবিদ্ধ হন। এ ঘটনায় আহত হন আরও বেশ কয়েকজন। ঝুঁকি বিবেচনায় নারকোটিক্সের জন্য স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রের অনুমোদন দেওয়া হয়। সংশ্ল্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পুলিশের সহায়তায় নারকোটিক্সের মাঠপর্যায়ের জনবলকে অস্ত্র চালনাসহ স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইতোমধ্যে সারদা পুলিশ একাডেমিতে অধিদপ্তরের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) থেকে শুরু করে উপপরিচালক পদমর্যাদার প্রায় চারশ কর্মকর্তা–কর্মচারীর প্রশিক্ষণ সমাপ্ত হয়েছে। অস্ত্র হাতে পেলেই নতুন উদ্যমে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
এদিকে, জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ তাঁর বক্তৃতায় নারকোটিক্সের জন্য ডগ স্কোয়াডের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তবে সংশ্ল্লিষ্টরা বলছেন মাদক পাচার প্রতিরোধে ডগ স্কোয়াডের আলোচনা আরও বেশ কিছুদিন আগের। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে সৌদি আরব গমনকারী কতিপয় বাংলাদেশির কাছ থেকে একাধিক ইয়াবার চালান ধরা পড়ে। এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে ইতোমধ্যে ঢাকায় কয়েক দফা চিঠি দিয়েছে সৌদি আরব। সূত্র বলছে, সৌদির চিঠির সূত্র ধরে বিমানবন্দর দিয়ে মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে কঠোর হচ্ছে সরকার। এক্ষেত্রে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সব বন্দরে মাদকবিরোধী অভিযানে নারকোটিক্সকে লিড সংস্থা হিসাবে ঘোষণা করা হচ্ছে। মাদকের চালান উদ্ধারে বিশেষায়িত ডগ স্কোয়াড মোতায়েন ছাড়াও কৌশলগত অবস্থানে বসানো হচ্ছে উচ্চ প্রযুক্তির স্ক্যানার। প্রকাশিত খবরে আরো বলা হয়, সবকিছু ঠিক থাকলে কিছুদিনের মধ্যেই এবার অস্ত্র হাতেই মাঠে নামতে যাচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (নারকোটিক্স)। ইতোমধ্যে অভিযান সংশ্ল্ল্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ পর্ব শেষ হয়েছে। বর্তমানে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে অস্ত্র কেনার প্রক্রিয়া চলছে। অস্ত্র হাতে আসা মাত্র নতুন উদ্যমে অভিযানে সক্রিয় হবেন তারা। তবে এবার শুধু মাদকসেবী কিংবা খুচরা বিক্রেতা নয়, আড়ালে থাকা গডফাদারদেরও ধরা হবে। এতে বলা হয়েছে, দেশে বিদ্যমান মাদক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এমন বাস্তবতায় মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের জন্য নারকোটিক্সকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, শহর থেকে গ্রামাঞ্চল– সর্বত্রই এখন হাতের নাগালে পাওয়া যায় এসব। বিগত বছরগুলোয় এর বিস্তার ঘটেছে আশঙ্কাজনকভাবে। তাঁরা বলেন, প্রকৃত চিত্রটি আসলে ভয়াবহ। মাদক পাচারের বেশিরভাগ ঘটনাই উদ্ঘাটিত হয় না; যে পরিমাণ মাদক ধরা পড়ে, তা খুবই সামান্য। মাদকাসক্তি বাংলাদেশে অন্যতম একটি জাতীয় সমস্যার নাম। নেশাকে সংজ্ঞায়িত করতে হলে বলতে হয় এমন কিছু দ্রব্য, ঔষধ কিংবা উত্তেজক ঔষধ, উপাদান যা ব্যবহারে একধরনের মানসিক প্রশান্তি, কল্পনা ও বাস্তবের মাঝামাঝি বিচরণ, স্নায়ু বৈকল্যের কারণে দেহে তীব্র সুখানুভূতি, হেলুসিনেশন, মতিভ্রম হতে পারে যা খুব সাময়িক। মূলত এই ঘোর লাগাটা বেশিদিন থাকে না। মাদকের বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান মানব দেহের উপর স্থায়ী এবং ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে এর উপর নির্ভরতা সৃষ্টি করে। নেশাজাতীয় দ্রব্যের বিস্তারে সেবনকারীর আর্থিক ও শারীরিক ক্ষতি হচ্ছে। এ অবস্থা রোধ করা না গেলে একটি প্রজন্মের চিন্তার জগতে সৃষ্টি হবে বন্ধ্যাত্ব। দীর্ঘমেয়াদে এর ফল কতটা ভয়াবহ হবে, তা সহজেই অনুমেয়। মাদকদ্রব্যের অপব্যবহারের ফলে সামাজিকভাবে যেমন অস্থিরতা, অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে ঠিক তেমনি মাদকাসক্তরা আমাদের এক নম্বর জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিভাবকদের উদ্বেগ–উৎকণ্ঠা ক্রমশ ঘৃণায় রূপান্তরিত হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে মাদকাসক্তরা নিক্ষিপ্ত হচ্ছে অন্ধকার গলিতে। মানুষের মধ্যে মানবিকতা ও মূল্যবোধের শূন্যতা নানাবিধ কারণে ঘটে।
সংশ্ল্লিষ্টরা বলছেন, মাদক যেভাবে ব্যাপক আকার ধারণ করেছে, তাতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এর কারণ খুঁজে বের করে তা দূর করার ব্যবস্থা নেওয়া। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের বেশি মাদক পেলে মাদকসেবীর শাস্তি হতে পারে। তবে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সচেতন মানুষ আশা করছে, মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধে বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হলে অর্থ পাচার আইনে মামলার কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় রাজনৈতিক প্রভাবে গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে। মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে সরকারকে কঠোর হতে হবে।








