পর্যটন নগরী বান্দরবানের সাতটি উপজেলায় পাহাড় কাটা থামছেই না। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দিনের পর দিন নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে পাহাড়। সড়ক নির্মাণ, বসতবাড়ি নির্মাণ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, পুকুর ও জলাশয় ভরাট, বাঁধ নির্মাণ এবং ইটভাটা তৈরির জন্য স্থানীয়রা প্রভাবশালীরা কাটছে এসব পাহাড়। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে ভূমিধসের আশঙ্কা, অন্যদিকে হুমকিতে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য। তাই পাহাড়ের প্রাণ পরিবেশ রক্ষায় পাহাড় কাটা বন্ধের দাবি স্থানীয়দের।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, দিনরাত সমানতালে প্রকাশ্যেই স্কেভেটর দিয়ে পাহাড় কাটা হচ্ছে সদর উপজেলার ভাগ্যকুল, হলুদিয়া, বনরূপা পাড়া, কালাঘাটা, বালাঘাটা, ক্যাচিংঘাটা, রোয়াংছড়ি বাসস্টেশন, লেমুঝিরি, বাকিছড়া, ফজর আলী পাড়াসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে পাহাড় কাটা হচ্ছে। অপরদিকে ইটভাটা স্থাপন ও ইট তৈরির মাটির জন্য লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নে মোক্তার মেম্বার, মহিউদ্দিন, কবির, নাজিম; আজিজনগর ইউনিয়নে আজম খান এবং আলীকদম উপজেলায় জামাল উদ্দিন, শওকত তালুকদার, থানচি উপজেলায় আনিসুর রহমান সুজন স্কেটেভেটর দিয়ে সমানতালে পাহাড় কাটছেন। রীতিমতো প্রতিযোগিতা দিয়ে পাহাড় কাটার মহোৎসবে মেতেছে এসব ইটভাটা মালিক। পাহাড় কাটা ও পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের অপরাধে পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়ের করা মামলায় আলীকদমের ইটভাটা মালিক জামাল উদ্দিন, শওকত তালুকদার, থানচি উপজেলায় আনিসুর রহমান সুজনের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর থেকে পলাতক থাকলেও অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে ইটভাটাগুলোতে পাহাড় কাটা থামছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করেই রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে সংঘবদ্ধ একটি চক্র পরিবেশ বিরোধী এ কর্মকাণ্ডে চালিয়ে যাচ্ছে। এতে পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেইসঙ্গে বর্ষার সময় ভূমি ধসে প্রাণহানির শঙ্কাও বাড়ছে ক্রমান্বয়ে।
এ প্রসঙ্গে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম, থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল বলেন, পাহাড় কাটাসহ পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের জন্য ইটভাটা মালিকদের জরিমানা করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষে মামলাও হয়েছে। পাহাড় কাটা বন্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে জেলার বিভিন্ন জায়গায় চলছে পাহাড় কাটার এই মহোৎসব। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা করা হলেও কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না পাহাড় খেকোদের দৌরাত্ম্য। এদিকে অবাধে পাহাড় কর্তনের ফলে দিন দিন বাড়ছে ভূমি ধসের আশংকা। এছাড়াও প্রতিবছর বর্ষায় দেখা দেয় পাহাড় ধ্বসের ঝুঁকি, প্রায় সময় ঘটে প্রাণহানির ঘটনাও। তাই পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও পাহাড় ধ্বসের ঝুঁকি কমাতে নামে–বেনামে পাহাড় কর্তন বন্ধে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা এলাকাবাসীর।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নূর হোসেন সজিব বলেন, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে পাহাড় কাটা সিন্ডিকেটদের পরিবর্তন হয়। যারা পাহাড় কাটার সাথে জড়িত তাদের তালিকা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেকের নামে মামলা হয়েছে। বান্দরবানে পাহাড় কাটা বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছে।
প্রসঙ্গত, পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় গেল এক বছরে এ পর্যন্ত ৬৫টি ভ্রাম্যমাণ আদালত ও এনফোর্সমেন্ট মামলার মাধ্যমে প্রায় আড়াই কোটি টাকা জরিমানা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও আদালতে মামলা চলমান রয়েছে ১৫টি।












