দীর্ঘদিন ধরে দেশে বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। এরই মধ্যে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে দাঁড়িয়েছে। গ্যাস–বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার এবং ব্যবসায়িক আস্থার সংকটে এ খাতে ঋণপ্রবাহে মন্দা দেখা দিয়েছে। ব্যাংকে আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে গতি নেই। বিনিয়োগেও স্থবিরতা। এর সঙ্গে রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতি অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। একই সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নের হার মাত্র ১.৮৫ শতাংশ। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকায় চাপে রয়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। রপ্তানি আয় কমে যাওয়াও অর্থনীতির জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সেপ্টেম্বর ২০২৬–এর অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় এসব চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের চাপ ও বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধারাবাহিক দুর্বলতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো পরিসংখ্যানগত ঘটনা নয়। এটি বরং বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের গতি কমে যাওয়ার গভীরতর লক্ষণ। দীর্ঘদিন ধরে ঋণপ্রবাহ এমন দুর্বল পর্যায়ে রয়েছে, যা বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে বেসরকারি খাতে আনুষ্ঠানিক ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন ৪.৭২ শতাংশে নেমে এসেছে। বেসরকারি খাতে এই ব্যতিক্রমী দুর্বল ঋণপ্রবাহ গভীরতর বেসরকারি বিনিয়োগ সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। এটি এমন এক পরিস্থিতির প্রতিফলন, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা সমপ্রসারণে অনাগ্রহী; ব্যাংকগুলো ক্রমেই সীমাবদ্ধ অথবা ঋণঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক; ঋণের ব্যয় উচ্চ; সরকারের অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তির পরিসর সংকুচিত করছে এবং জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি, বহিঃপরিবেশ ও বিনিময় হার নিয়ে অনিশ্চয়তা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের ওপর চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। ব্যাংকিং মধ্যস্থতার (ফিন্যান্সিয়াল ইন্টারমিডিয়েশন) দুর্বলতা সমস্যার একটি কেন্দ্রীয় অংশে পরিণত হয়েছে। স্বাভাবিক ঋণ ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো যেভাবে আমানতকে উৎপাদনশীল ঋণে রূপান্তর করবে বলে প্রত্যাশিত, এখন তা ঘটছে না। ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, প্রভিশনিং চাপ, মূলধন ঘাটতি, আমানতকারীদের নড়বড়ে আস্থা এবং তারল্য সংকট ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল করেছে। একই সঙ্গে ঋণগ্রহীতাদের মান নিয়ে অনিশ্চয়তা নতুন ঋণ প্রদানে তাদের আগ্রহ কমিয়েছে। ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ক্রমেই বেশি রক্ষণশীল ও ঝুঁকিবিমুখ হয়ে উঠছে। নতুন বিনিয়োগকে সহায়তা করার পরিবর্তে এটি নিজের ব্যালান্সশিট (আর্থিক বিবৃতি) সুরক্ষায় বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন পত্রিকান্তরে বলেন, দেশে বিনিয়োগ না বাড়ার অন্যতম কারণ অনুকূল পরিবেশের অভাব। বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত না হলে অর্থনীতিতে গতি ফেরানো কঠিন হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে একসঙ্গে অনেক উদ্যোগ না নিয়ে ছয়–সাতটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ কার্যকর করে দেখানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো জরুরি বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটি দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অর্থনীতিতে গতি বৃদ্ধির জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। বেসরকারি খাত চাঙ্গা করতে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে প্রত্যাশিত ফল আসবে না, এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ আমলে নিতে হবে। প্রাথমিকভাবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো জরুরি। একই সঙ্গে অনিয়ম বন্ধে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আশা করি বর্তমান সরকার চলমান পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক কর্ম–কৌশল গ্রহণ করবে এবং দেশের অর্থনীতিতে গতি ফিরে আসবে।
বেসরকারি খাতকে মনে করা হয় একটি দেশের অর্থনীতির প্রাণ। উৎপাদনশীল বেসরকারি বিনিয়োগকে প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন নতুন কলকারখানা তৈরি, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং রাজস্ব আয়ে বেসরকারি খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অন্যদিকে, এখন দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে। এর মধ্যেই নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে বড় একটি জনগোষ্ঠী। এই মানুষগুলোকে টেনে তুলতে হলে কাজে ফেরাতে হবে। সুতরাং পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনাকে অবশ্যই কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। আর এ জন্য প্রয়োজন উৎপাদনশীল খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ।








