নগরের অনন্যা আবাসিক এলাকা। একসময় এলাকাটি কাজ করত প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে। অতিবৃষ্টির সময় আশপাশের এলাকার বৃষ্টির পানি সাময়িকভাবে এখানে জমা থাকত এবং ধীরে ধীরে বিভিন্ন খালের মাধ্যমে হালদা নদীতে নিষ্কাশিত হতো। পরবর্তীতে সেখানে জলাভূমি ভরাট করে আবাসিক প্লট, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। এতে প্রাকৃতিক পানি ধারণক্ষমতা প্রায় সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে অতিবৃষ্টির সময় অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় জলাধার না থাকায় দ্রুত জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পের আওতায় ওয়াজেদিয়া–অনন্যা–কুয়াইশ এলাকার জলাবদ্ধতার কারণ ও প্রতিকার বিষয়ে প্রণীত একটি কারিগরি প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনটি কয়েকদিন আগে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে (চসিক) হস্তান্তর করা হয়।
জানা গেছে, গত ৭ থেকে ১১ জুলাই এবং এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে ভারী বর্ষণে নগরের বিভিন্নস্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এরপর জলাবদ্ধতার কারণ অনুসন্ধান করে কারিগরি টিম প্রতিবেদন তৈরি করে। প্রতিবেদনে এলাকা ওয়াজেদিয়া–অনন্যা–কুয়াইশ এলাকায় জলাবদ্ধতার জন্য সুনির্দিষ্ট ৬টি কারণ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে ৬টি সুপারিশ করা হয়। জলাবদ্ধতার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে– প্রাকৃতিক জলাধারের অভাব, কুয়াইশ, কৃষ্ণা ও কৃষ্ণা লিংক খাল দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়া, হালদা নদীতে পানি নিষ্কাশনে সীমাবদ্ধতা, বিল এলাকার সঙ্গে পর্যাপ্ত সংযোগের অভাব, নিম্নভূমির কারণে সড়কে পানি জমে থাকা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা।
এদিকে প্রতিবেদনটির সঙ্গে চসিককে একটি দাপ্তরিক পত্র দেয়া হয় সেনাবাহিনীর প্রকল্প পরিচালকের দপ্তর থেকে। এতে প্রকল্প পরিচালক লে. কর্নেল মোহাম্মদ মহসিনুল হক চৌধুরী বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক দ্বিতীয় ধাপে ৪০টি খাল সংস্কারের যে প্রকল্পের পরিকল্পনা চলমান সেখানে কুয়াইশ, কৃষ্ণা ও কৃষ্ণা লিংক খাল এবং এলাকার পানি সংরক্ষণের জন্য জলাধার অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে প্রকল্প অফিস সুপারিশ করে। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের ডিপিপিতে খালগুলো অন্তর্ভুক্ত নেই। খালগুলো পুনঃখনন ও সংস্কার করা না হলে ওসব এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব নয়।
এদিকে প্রতিবেদনটি পাওয়ার বিষয়টি আজাদীকে নিশ্চিত করেন চসিকের সচিব মোহম্মদ আশরাফুল আমিন। তিনি বলেন, প্রতিবেদনে অনেকগুলো বিষয় উঠে আসে। এতে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যবস্থা নিতে সুবিধা হবে।
জলাবদ্ধতার কারণ : প্রতিবেদনে বলা হয়– ওয়াজেদিয়া এলাকাটি যুগীরগোলা খাল, চন্দ্রাবিল খাল, কৃষ্ণা খাল ও কুয়াইশ খাল–এর বিস্তৃত ক্যাচমেন্ট এলাকায় অবস্থিত। ভৌগোলিকভাবে এটি নিম্নাঞ্চল, যা অতীতে বিস্তীর্ণ জলাভূমি হিসেবে বিদ্যমান ছিল। অনন্যা আবাসিক এলাকাটি একসময় প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে কাজ করত। ওই এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের আওতায় বামনশাহী খালের
পাশে ‘ওয়াটার রিটেনশন পন্ড’ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ব্যয় সংকোচনের কারণে প্রস্তাবিত জলাধারসমূহ বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে।
জলাবদ্ধতার দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বলা হয়– কৃষ্ণা লিংক, কৃষ্ণা ও কুয়াইশ খাল দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় খালগুলোর নাব্যতা ও প্রশস্ততা কমে যাওয়ায় খালের প্রবাহ ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট ছোট ছোট খালসমূহ বেদখল ও ভরাট হয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক অপর্যাপ্ত এবং দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অধিকাংশ ড্রেন পলি ও আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে। ফলে অতিবৃষ্টির সময় পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে না পারায় খালগুলোর ক্যাচমেন্ট এরিয়াতে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
জলাবদ্ধতার তৃতীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়– ওয়াজেদিয়া–অনন্যা–কুয়াইশ এলাকার অধিকাংশ বৃষ্টির পানি আংশিকভাবে যুগীর খাল, কুয়াইশ খাল ও কৃষ্ণা খাল হয়ে হালদা নদীতে নিষ্কাশিত হয়। কিন্তু এলাকায় গড়ে ওঠা অসংখ্য শিল্পকারখানার বর্জ্য দীর্ঘদিন ধরে এসব খালের মাধ্যমে হালদা নদীতে প্রবাহিত হওয়ায় পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। হালদা নদী সংরক্ষণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এই প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এ জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড খন্দকিয়া খালের মুখে একটি রেগুলেটর নির্মাণ করলেও সেখানে কোনো পাম্প স্টেশন স্থাপন করা হয়নি। ফলে অতিবৃষ্টির সময় জমে থাকা পানি পাম্পের মাধ্যমে দ্রুত নদীতে নিষ্কাশন করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া রেগুলেটরের যথাযথ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়েছে।
এদিকে কারিগরি টিম পরিদর্শনকালে জানতে পারে, জলাবদ্ধতার সময় জোয়ারের পানি রেগুলেটরের মাধ্যমে ব্যাকফ্লো হয়ে এলাকায় প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে কুয়াইশ খাল, কৃষ্ণা খাল, যুগীর খালসহ সংশ্লিষ্ট লিংক খালসমূহ দীর্ঘদিন পুনঃখনন ও সংস্কার না হওয়ায় এসব খালের নাব্যতা ও প্রস্থ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে পানি প্রবাহের সক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারেনি এবং ব্যাকফ্লোর কারণে জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হয়েছে।
জলাবদ্ধতার চতুর্থ কারণ হচ্ছে– অনন্যা আবাসিক এলাকার প্রধান সড়কের উভয় পাশে অবস্থিত বিস্তীর্ণ বিল এলাকার সঙ্গে মূল খালের পর্যাপ্ত সংযোগ না থাকায় বৃষ্টির পানি খালে পৌঁছাতে পারে না। ফলে নিচু এলাকায় দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে। এছাড়া ওয়াজেদিয়ার প্রবেশমুখ থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালের সম্মুখ পর্যন্ত প্রধান সড়কের কয়েকটি অংশ তুলনামূলক নিচু হওয়ায় অতিবৃষ্টির সময় সড়কের ওপর দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে। ওয়াজেদিয়া থেকে এভারকেয়ার হাসপাতাল পর্যন্ত প্রধান সড়কের উভয় পাশের ড্রেনসমূহ অত্যন্ত অপ্রশস্ত, অগভীর এবং দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় পলি ও আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে। একই সঙ্গে এসব ড্রেনের সঙ্গে খালের কার্যকর সংযোগ না থাকায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশিত হতে পারে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
জলাবদ্ধতা নিরসনে ৬ সুপারিশ :
ওয়াজেদিয়া–অনন্যা–কুয়াইশ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে ৬টি সুপারিশ করা হয়। সুপারিশের মধ্যে রয়েছে– বামনশাহী খালের ক্যাচমেন্ট এলাকায় সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক প্রস্তাবিত নগরের ৪০টি খাল সংস্কার প্রকল্পের আওতায় ‘ওয়াটার রিটেনশন পন্ড’ নির্মাণ করে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সাময়িকভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। চসিক কর্তৃক প্রস্তাবিত নগরের ৪০টি খাল সংস্কার প্রকল্পের আওতায় কুয়াইশ খাল, কৃষ্ণা খাল, যুগীর খাল, চন্দ্রাবিল খালসহ সংশ্লিষ্ট সকল লিংক খালের পুনঃখনন, সমপ্রসারণ ও সংস্কার করা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হালদা নদীর পরিবেশ রক্ষার লক্ষ্যে ওয়াজেদিয়া–অনন্যা–কুয়াইশ এলাকা শিল্পকারখানার বর্জ্য পানি সরাসরি খালে নিষ্কাশন না করে কারখানা কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বর্জ্য এবং দূষিত পানি পরিশোধন করে খালে নিষ্কাশন করা প্রয়োজন, এতে সিডিএ লিংক খাল, কৃষ্ণা ও কুয়াইশ খালের পানি হালদার পরিবেশ নষ্ট করবে না। এজন্য কৃষ্ণা খালের মুখে রেগুলেটরসহ নতুন পাম্প স্টেশন নির্মাণ করার সুপারিশ করে বলা হয়– নগরের ৪০টি খাল সংস্কার প্রকল্পের আওতায় এটা অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
এছাড়া ওয়াজেদিয়া থেকে এভারকেয়ার হাসপাতাল পর্যন্ত প্রধান সড়কের উভয় পাশের ড্রেনের প্রশস্ততা ও গভীরতা বৃদ্ধি করে বামনশাহী খালের সঙ্গে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করার সুপারিশ করা হয়। অনন্যা আবাসিক এলাকা–১ থেকে টেকবাজার পর্যন্ত খাল পুনঃখনন করে নোয়া খালের সঙ্গে সংযুক্ত করা, অনন্যা আবাসিক এলাকার পূর্ব প্রান্ত দিয়ে প্রবাহিত টেকবাজার খালকে বামনশাহী ও নোয়া খালের সঙ্গে সংযুক্ত করে পানি প্রবাহের বিকল্প পথ সৃষ্টি করা ও সিডিএ খালের নিম্নাংশে অনন্যা আবাসিক এলাকা–১–এর শেষ প্রান্তের ড্রেন সংস্কার করে টেকবাজার খালের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার সুপারিশ করা হয়।
পাশাপাশি ওয়াজেদিয়া মুখ থেকে এভারকেয়ার হাসপাতালের সম্মুখ পর্যন্ত প্রধান সড়কের নিচু অংশের উচ্চতা বৃদ্ধি করে সংস্কার করা এবং চসিকের প্রস্তাবিত ৪০টি খাল সংস্কার প্রকল্পের আওতায় ওয়াজেদিয়া–অনন্যা–কুয়াইশ এলাকার ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণ, প্রয়োজনীয় সমপ্রসারণ এবং নিয়মিত পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়।












