প্রতিদিন গড়ে যুক্ত হচ্ছে ৬টি মামলা, বাড়ছে উদ্বেগ

নগরীতে মাদকের বিস্তার

হাবীবুর রহমান | শুক্রবার , ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৫:৩৭ পূর্বাহ্ণ

নগরীর গুরুত্বপূর্ণ তামাকুমন্ডি লেন এলাকা। গত ১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় ১৬ বছর বয়সী এক কিশোর এলাকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে মাদকের পুটলা হাতে ফেরি করে বেড়াচ্ছিল। ব্যবসায়ীদের নজরে পড়তেই তাকে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয় ২১ পিস ইয়াবা। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের হয়। ঘটনাস্থল কোতোয়ালী থানার অধীন। এর কিছুদিন পর গত ২১ সেপ্টেম্বর নগরীর বায়েজিদ লিংক রোড এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে ৩ জন মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ৮ হাজার ২৮৫ পিস ইয়াবা। এ ঘটনায়ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয় এবং আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এলাকাটি আকবরশাহ থানাধীন। শুধু কোতোয়ালী বা আকবরশাহ এলাকা নয়, নগরীর প্রতিটি থানা এলাকাতেই মাদক কেনাবেচার উপস্থিতি রয়েছে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান ও আইনি পদক্ষেপও চোখে পড়ার মতো। তা সত্ত্বেও মিলছে না বন্দরনগরী মাদকমুক্ত– এমন কোনো স্বস্তির খবর।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী– চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে মেট্রো ম্যাজিস্ট্রেসিটিতে ৪৫২টি নতুন মাদক মামলা যুক্ত হয়েছে। পরবর্তী তিন মাসে তথা এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে এই সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়ে দাঁড়ায় ৬২৮টিতে। সব মিলিয়ে মাত্র ছয় মাসে (জানুয়ারি–জুন) মোট নতুন মামলা যুক্ত হওয়ার সংখ্যা ১,০৮০টি। অর্থাৎ ১৮১ দিনে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬টি করে নতুন মাদক মামলা যুক্ত হচ্ছে এ ম্যাজিস্ট্রেসিতে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৬টি থানা সমৃদ্ধ এই নগরীতে প্রতিদিন এই হারে মাদক মামলা যুক্ত হওয়া বিচার ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপের পাশাপাশি সমাজে মাদকের শিকড় কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তারই প্রমাণ। এই সংখ্যা নগরজুড়ে মাদকের সহজলভ্যতা এবং সরবরাহ লাইনের বিস্তৃতিকেই নির্দেশ করে। ফিনটেক জালিয়াতি বা আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহারের পাশাপাশি মাদক কারবারেও ‘সিম বদল’ বা ‘বেনামি’ মাধ্যম ব্যবহার করে খুচরা ও পাইকারি ডিলিং পরিচালনার প্রবণতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন গড়ে এত মামলা রেকর্ড হওয়ায় আদালতে মামলার জট আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। আবার মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনি মারপ্যাঁচের সুযোগে অপরাধীরা সহজে জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রামের জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আশরাফ হোসাইন চৌধুরী রাজ্জাক দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘সমাজে মাদক বিস্তারের ঘটনায় আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। এ অঞ্চলের দেশ থাইল্যান্ড একসময় মাদকের বিস্তার ঘিরে চরম সংকটে পড়েছিল। আমরা যদি কন্ট্রোল করতে না পারি, তাহলে একই পরিণতি আমাদের ভোগ করতে হবে। শহর বলেন, গ্রাম বলেন– সর্বত্র একই পরিস্থিতি। মাদকসেবী থেকে মাদক কারবারিদের আনাগোনা সর্বত্রই। এটা মহামারীর সংকেত। জাতির ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সংকেত। এখান থেকে মুক্তির পথ খুঁজে বের করতেই হবে।’ তিনি বলেন, কঙবাজার জেলা হয়েই দেশে মাদক প্রবেশ করে। সেখানে থাকা মাদক চোরাচালানের রাস্তাগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। সেগুলো যদি বন্ধ করা না যায়, তাহলে মাদকের বিস্তার রোধ করা যাবে না।

মাদক মামলা বিচারের জন্য সমপ্রতি ৪টি ট্রাইব্যুনাল গঠন হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, মাদক আসার রোড বন্ধ করতে না পারলে ট্রাইব্যুনাল গঠনে কোনো ফায়দা হবে না। তরুণ সমাজকে রক্ষায় সংশ্লিষ্টদের আন্তরিক হয়ে জনমুখী কর্মসূচি নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন জেলা পিপি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকের এই আগ্রাসন কেবল অপরাধ পরিসংখ্যানের একটি সংখ্যা নয়; এটি তরুণ সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় অশনি সংকেত। কেবল মামলা আর পুলিশি অভিযান দিয়ে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য পারিবারিক সচেতনতা, সামাজিক আন্দোলন এবং মাদকের মূল সরবরাহ ও অর্থায়নের উৎসগুলো কঠোর হস্তে দমন করা জরুরি। সম্প্রতি নগরীর সার্কিট হাউসে জেলার আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিশেষ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পানি সম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। সভা শেষে তিনি সাংবাকিদের সাথে অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় মাদকের বিস্তার ও নির্মূল বিষয়েও কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, মাদক নির্মূল করার ক্ষেত্রে যে ভূমিকাটুকু পালন করা দরকার, সেদিকে আমরা বিশেষ নজর দিয়েছি। সংশ্লিষ্ট সকলে মিলে এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করা হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধডেঙ্গুতে দেশে আরও ৮ মৃত্যু
পরবর্তী নিবন্ধসাগরপথে মিয়ানমারে যাচ্ছিল ৬০০ বস্তা ইউরিয়া সার