পানিতে আগুন

রেফায়েত ইবনে আমিন | সোমবার , ৩ অক্টোবর, ২০২২ at ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ

বিশাল সমুদ্রের মাঝে ক্ষুদ্র একটা পিঁপড়ার সাইজের জাহাজে নাবিকেরা কাজ করে। জাহাজের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সমুদ্রে কিছু হলে আমাদের সকলেরই জীবন-মরণ সমস্যা। আমরা মেরিনাররা ঝড়ে জাহাজ ডুবে যাওয়ার ভয় পাই না, কিন্তু সবচেয়ে বেশী ভয় পাই আগুনকে। আরো অনেককিছুই আমাদের ভয়ের কারণ হতে পারে- মুখোমুখি সংঘর্ষ, আইসবার্গ, মেইন ইঞ্জিন বিকল হওয়া, জাহাজে খোলে ফুটা হওয়া, বড়সড় পাম্প-মেশিনারিজ বিকল বা সেটার পাইপ বার্স্ট করা (বিশেষ করে সী-ওয়াটার লাইন বার্স্ট এবং ভাল্‌ভ ঠিকমত কাজ না করলে ক্রমাগত জাহাজে পানি ঢুকতেই থাকবে)। এছাড়াও অনেক কিছুরই এক্সপ্লোশানও হতে পারে- বয়লার, কমেপ্রস্‌ড্‌-এয়ার ট্যাঙ্ক, হাই-প্রেশার গরম-তেল বা গরম-পানির লাইন, আরো কতকিছু। কিন্তু সবকিছুর উপরে আগুনটাকেই ভয় করি বেশী।
একারণে নানা নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ অবশ্যই নেওয়া আছে। সেজন্যই জাতিসংঘের সংস্থা IMO (International Maritime Organization), SOLAS (Safety Of Life At Sea) কনভেনশানের মাধ্যমে, জাহাজের যত খুঁটিনাটি বিষয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা সম্ভব তার সবই করেছে। প্রথমেই বলে নিই- জাহাজের প্রতিটা নাবিককে অবশ্য অবশ্যই ফায়ার-ফাইটিং জানতে হবে। শুধু থিওরেটিক্যাল কোর্স আর ভিডিও দেখলেই চলবে না। ফায়ার-ফাইটারদের মতো প্র্যাক্টিক্যালি হাতে-নাতে ট্রেনিং নিতেই হবে; আর কিছুদিন পরপরই তা ঝালাই করে নবায়ন করতে হবে। জাহাজে গেলেও সেখানে সকলকে সেই জাহাজের সব ফায়ার-ফাইটিং-এর জিনিসগুলো ভালোমত রপ্ত করে নিতে হবে- কোথায় কোন ফায়ার-এক্সটিংগুইশার আছে, ফায়ার-হোস, ফায়ার-পাম্প, ফায়ার-এলার্ম ইত্যাদি সবকিছু। শুধু দেখলেই চলবে না, চালাতে তো জানতে হবেই, তার উপরে সেগুলোর কার্যকারিতা ঠিক আছে কিনা, ঠিকমত ইন্সপেকশান করা, কার্যকারিতার মেয়াদের সব রেকর্ড রাখতে হবে। দরকারমত চালিয়ে দেখতে হবে, বা ফায়ার-এক্সটিংগুইশারের পুরানো কেমিক্যাল বদলাতে হবে। এছাড়া তো রয়েছে রেগুলার ফায়ার-ড্রিল। না করলে যে নিজেরাই মারা পড়বো।
সেই আদিযুগে ছিলো কাঠের জাহাজ। সেগুলোতে সহজেই আগুন ছড়িয়ে পড়তো। ধীরে ধীরে টেকনোলোজির উন্নতির সঙ্গে স্টিলের জাহাজ এসেছে, কিন্তু অন্যান্য অনেক দাহ্য-পদার্থ তো রয়ে গেছে। শুধুমাত্র আমাদের থাকবার কেবিনগুলোর কথাই চিন্তা করেন-চেয়ার-টেবিল-খাট-দেওয়াল। সেগুলোই তো যথেষ্ট। তারপরে গ্যালিতে (রান্নাঘরে) তেল, ইঞ্জিনরুমে জ্বালানি-তেল, আবার কখনো এমন কিছু কার্গো থাকতে পারে যেগুলো নিজেরাই সুপার-জ্বালানি। যেমন-তল, কেমিক্যাল, এসিড, কয়লা, তুলা, পাট, কাপড়-চোপড়, ফার্নিচার কী না? সবকিছুই আগুনের পেটে যেতে রেডি, এবং আগুনকে চরমভাবে উস্কে দিবে। তারপরেও সবদিক চিন্তা ভাবনা করে চেষ্টা করা হয়, কীভাবে কী করলে আগুন লাগবে না; অথবা লাগলেও ছড়াবে না, বা তাড়াতাড়ি নিভিয়ে ফেলা যাবে।
আগুন জ্বলতে তিনটা জিনিস লাগে, যাকে বলা হয় Fire Triangle অক্সিজেন + জ্বালানী (fuel পুড়বে এমন জিনিস) + গরমতাপ (heat)। এই তিনের মধ্য থেকে একটাকে সরিয়ে নিতে পারলেই আগুন নিভে যাবে। বাতাসে অক্সিজেন থাকে, আর দকার জ্বালানি (কাঠ, তেল, কাপড়, যেকোনকিছুই যা আগুনে জ্বলে); আর দরকার টেম্পারেচার। আগুন লাগলে অনেক সময়েই একটা মোটা কম্বল দিয়ে সম্পূর্ণটা ঢেকে দিতে পারলে, অক্সিজেনের অভাবে আগুন নিভে যায়। একই কারণে, মোমবাতি একটা বোয়ামে ভরে ঢাকনা বন্ধ করে দিলে নিভে যাবে। আবার, আগুন থেকে জ্বালানি সরাতে পারলেও ভালো। উদাহরণ লাকড়ির-চুলার লাকড়ি সরিয়ে ফেললে, আগুন ধীরে ধীরে নিভে যাবে। একইভাবে, বনে-জঙ্গলে দাবানল হলে অনেক সময়ে প্ল্যান করে আগুনের গতিপথের দিকের গাছপালা (জ্বালানি) কেটে ফেললে, আগুন আর বাড়তে পারে না। অনেক সময়ে শুকনো লতা-গুল্ম পুড়িয়ে ফেলে। সেজন্যই বলে fighting fire with fire.
আমরা তো সকলেই জানি তেল পানির উপরে ভাসে, তাই সেটা নিভানোও বেশ কষ্টের। তারপরে ফায়ার-এক্সটিংগুশার এক একটা একেক প্রকারের এবং একেক ধরনের আগুনের জন্য ব্যবহার করা হয়। এদের ক্লাস থাকে Class A, B, C ইত্যাদি। লোকেশান অনুযায়ী সেগুলো রাখা থাকে, তেলের আগুন নেভানোর জন্য গ্যালিতে, জ্বালানি তেলের জন্য ইঞ্জিনরুমে। ইলেক্ট্রিক্যাল আগুন নিভানোর জন্য ড্রাই-পাউডার।
আমাদের কেবিনগুলোর দেওয়াল-ফার্নিচার থাকে ফায়ার-রিটার্ডেন্ট যাতে সহজে না জ্বলে বা আগুন লাগলেও অনেক সময় নিবে। সেগুলোর রেইটিং দেওয়া থাকে একটা থাকে কোন্‌ ধরনের আগুন (Class A, B, C); অন্যটা সময়ের রেইটিং (Class A-60, Class A-30, Class A-15) মানে কতক্ষণ সেই আগুনের মাঝে টিকে থাকবে একঘন্টা বা তিরিশ মিনিট বা পনের মিনিট। এবারে জাহাজের মেইন স্ট্রাকচারের কথা বলি। জাহাজের খোলটাকে বাম-থেকে ডানে আড়াআড়িভাবে বেশ কয়েকটা শক্ত দেওয়াল বা বাল্কহেড (bulkhead) দিয়ে ভাগ করা হয়েছে। এদের মধ্যে কিছু থাকে ওয়াটারটাইট-বাল্কহেড থাকে আর থাকে ফায়ারপ্রুফ-বাল্কহেড। সবচেয়ে সামনের দিকে থাকে কলিশন-বাল্কহেড। সামনাসামনি কোনো কিছুতে গোঁত্তা খেলে, বা অন্য জাহাজ মেরে দিলে, যদি জাহাজে ফুটা হয়, তাহলে পানি শুধু সেই বাল্কহেড পর্যন্তই থাকবে। পুরা জাহাজে ঢুকবে না। এরকম বেশ কয়েকটা বাল্কহেড দিয়ে জাহাজকে আড়াআড়ি আর লম্বালম্বি ভাগ করা হয়েছে। এগুলো থাকার কারণেই, জাহাজের খোলে একটা ফুটা হলেও ডুবতে অনেক সময় লাগে; বা পানি যেদিকে ঢুকছে, সেই জায়গাটাকে আইসোলেট করে রাখা সম্ভব হয়। এদের মধ্যে অনেকগুলোই আছে ফায়ারপ্রুফ বাল্কহেড, শুধু পানিই না, আগুনও ছড়াতে দিবে না। বা আগুন ছড়াতে দেরি করাবে।
জাহাজে আগুন নিভানো হয় কীভাবে? সহজ উত্তর হলো, জাহাজ তো পানির উপরেই, সুতরাং পানির তো আর অভাব নাই সমুদ্র বা নদী থেকে পাম্প করে আগুন নিভানো যাবে। হ্যাঁ, তা বটে, কিন্তু, তারপরেও অনেক কিন্তু থেকে যায়। যেই পাম্প দিয়ে পানি তুলে আগুন নিভাবো, সেইটাতেই যদি আগুন লাগে? বা সেইটা যদি নষ্ট থাকে? কাজ করছেনা বা তার কাছে যাওয়া যাচ্ছে না। অথবা জাহাজ এমনভাবে চড়ায় আটকে গেছে, বা কাৎ হয়ে গেছে, যে সেই পাম্প পানির নাগাল পাচ্ছে না। তাহলে? তার ব্যবস্থাও চিন্তা করা আছে দ্বিতীয় আর একটা পাম্প থাকবে স্ট্যান্ডবাই বা ডুপ্লিকেট হিসাবে। কোনো কোনো জাহাজে, দুইটার চেয়েও বেশী থাকে। নর্মাল অন্যান্য কাজে যেসমস্ত পাম্প ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর সঙ্গেও ফায়ার-লাইনের ইন্টার-কানেকশান দেওয়া থাকে। ইমার্জেন্সিতে প্রয়োজন হলে সেগুলোকেও ব্যবহার করা যাবে।
আচ্ছা, জাহাজের প্রায় সব পাম্পই তো থাকে ইঞ্জিনরুমে। যদি ইঞ্জিনরুমেই আগুন লাগে? অথবা ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই দেয় যেই জেনারেটরগুলো, সেগুলো যদি না চলে, তাহলে? সেজন্যই থাকে ইমার্জেন্সি জেনারেটর এবং ইমার্জেন্সি ফায়ার-পাম্প। এগুলো অবশ্য অবশ্যই ইঞ্জিনরুম থেকে অনেক দূরে থাকতে হবে; যাতে করে জাহাজের একজায়গায় আগুন ধরলেও অন্য জায়গারটাকে ব্যবহার করা যাবে। ইমার্জেন্সি ফায়ার-পাম্প রেগুলার ইলেক্ট্রিক্যাল লাইন থেকে সাপ্লাই নিলেও নিতে পারে; কিন্তু বাধ্যতামূলক হচ্ছে সেটা অবশ্যই ইমার্জেন্সি জেনারেটর বা ব্যাটারি-পাওয়ারের সঙ্গে কানেক্টেড থাকতেই হবে। কারণ ইমার্জেন্সির সময়ে রেগুলার কারেন্ট না পেলে, হয় ব্যাটারিতে চলবে অথবা ইমার্জেন্সি জেনারেটরে চলবে।
আমি তো মাত্র অল্প কিছু বললাম, কিন্তু SOLAS কনভেনশানের গাইডলাইনে এগুলোর প্রতিটার ব্যাপারে পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা দেওয়া আছে পাইপের সাইজ, পাম্পের ধরণ, ক্যাপাসিটি, লোকেশান ইত্যাদি ইত্যাদি। সেগুলোকে কিছুদিন পরপরই চালিয়ে পরখ করে দেখে নিতে হবে, আসল ইমার্জেন্সির সময়ে চলবে কিনা। ইমার্জেন্সি জেনারেটরে সবসময়ই সঠিক লেভেলে তেল আছে কিনা চেক করতে হবে। বিপদের সময়ে সেদিকে সময় ব্যয় হয়ে গেলে আগুন সহজেই ছড়িয়ে পড়বে। তখন প্রতিটা মুহূর্ত মূল্যবান।
আজকের আগুন এখান পর্যন্তই থাক। আগামী পর্বে আবারও আগুন ধরিয়ে কিছু আলোচনা করা যাবে। কী বলেন?
টলিডো, ওহাইও, ২০২২
refayet@yahoo.com

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাশেদ রউফ-এর অন্ত্যমিল
পরবর্তী নিবন্ধযদি আমাকে জানতে সাধ হয় বাংলার মুখ তুমি দেখে নিও