দেশের গ্যাস সংকট মোকাবিলায় কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের চীনা প্রস্তাব সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ফেরত পাঠিয়েছে। চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (সিএনইই) দেওয়া প্রস্তাব অনুমোদন না করে ফেরত পাঠানো হয়। গেলো বুধবার কমিটির বৈঠকে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার–থেকে–সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে টার্মিনালটি স্থাপনের প্রস্তাব কমিটির বিবেচনার জন্য তোলা হয়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
কুতুবজোমে প্রস্তাবিত টার্মিনালের জন্য সিএনইই ১৫ বছর মেয়াদে প্রায় ১২ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা এবং ২০ বছর মেয়াদে প্রায় ১৩ হাজার ১৬১ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবে দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুনরায় সরবরাহের সক্ষমতা এবং সর্বোচ্চ ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার কথা বলা হয়। তবে প্রস্তাবিত টার্মিনালের ‘দৈনিক ফি’ অংকটিই বড় হয়ে উঠে। ১৫ বছর মেয়াদী চুক্তির আওতায় সিএনইই দৈনিক ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। অথচ বর্তমানে দেশে চালু থাকা এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের জন্য দৈনিক ব্যয় ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং সামিট এলএনজি টার্মিনালের জন্য ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার। সে হিসাবে নতুন টার্মিনালের জন্য প্রস্তাবিত দৈনিক ব্যয় বিদ্যমান দুই টার্মিনালের তুলনায় প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি। গত ১৯ জুন সিএনইই কুতুবজোমে অফশোর এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। দেশে জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি এবং এলএনজি আমদানিনির্ভরতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে নতুন টার্মিনাল স্থাপনের এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে প্রস্তাবিত ব্যয় সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন না হওয়ায় প্রস্তাবটি পরবর্তীতে আর এগুবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে সরবরাহ করা যায় প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে চাহিদার তুলনায় দৈনিক ঘাটতি থাকছে প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল চালু রয়েছে। এঙিলারেট এনার্জির টার্মিনালের দৈনিক সক্ষমতা ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই দুটি টার্মিনালের কোনো একটিতে সমস্যা দেখা দিলেই জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়।
গত ২১ জুলাই এঙিলারেট এনার্জির টার্মিনালের বৈদ্যুতিক ক্যাবলে আগুন লাগার পর দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। দুই সপ্তাহের বেশি সময় পর ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু করা সম্ভব হয়। এছাড়া প্রাকৃতিক বিপর্যয়সহ নানা প্রতিকূলতায় দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় একাধিক টার্মিনালের গুরুত্ব প্রকট হয়ে উঠে। এই পরিস্থিতিতে ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে সরকার।
জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এ লক্ষ্যে পায়রা, মোংলা ও হিরন পয়েন্ট এলাকায় সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। পাশাপাশি এসব প্রকল্পে বিনিয়োগকারী খোঁজার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন টার্মিনাল স্থাপনের ক্ষেত্রে ব্যয়ের পাশাপাশি দরপত্র প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতা নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে এলএনজি অবকাঠামো উন্নয়নে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
গত ৭ সেপ্টেম্বর এফবিসিসিআই কার্যালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠকে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে ‘স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক’ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কাজ করতে অত্যন্ত আগ্রহী।
সভায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দ্রুততম সময়ে টার্মিনাল নির্মাণের সক্ষমতা দেখাতে পারলে মার্কিন কোম্পানির প্রস্তাব সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।
জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি কমাতে নতুন টার্মিনাল স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও কুতুবজোম প্রকল্পে চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত ব্যয় এবং বিদ্যমান টার্মিনালগুলোর সেবা মূল্যের পার্থক্য নতুন করে ব্যয়–সাশ্রয়ী ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নের উপর সরকার জোর দিচ্ছে বলেও সূত্র জানিয়েছে।












