এবার প্রায় দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে ডুবেছে নগরের কয়েকটি এলাকা। দীর্ঘক্ষণ পানি আটকে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগে পড়েন পথচারীরা। এদিকে জলাবদ্ধতা হয়েছে এ রকম বেশ কিছু পয়েন্টে সন্ধ্যার পর পরিদর্শন করেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এ সময় তিনি মাত্র এক ঘণ্টায় পানি নেমে গেছে দাবি করে বিষয়টিকে ‘ইতিবাচক দিক’ হিসেবে মন্তব্য করেন।
জানা গেছে, গতকাল বিকাল সাড়ে ৩টার পর থেকে শহরের আকাশ ধীরে ধীরে কালো মেঘে ঢেকে যায়। ৪টার পর বৃষ্টি শুরু হয়। টানা প্রায় সাড়ে ৫টা পর্যন্ত বৃষ্টি পড়ে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে।
এদিকে সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে প্রবর্তক মোড়ে ও সড়কে হাঁটুর বেশি পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। পানি ঢুকে যায় কয়েকটি দোকানপাটে। বদনা শাহ মাজার থেকে প্রবর্তক মোড় অংশে পানি ছিল বেশি। এ সময় পথচারীদের রাস্তার ডিভাইডার দিয়ে হাঁটতে দেখা গেছে। পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা, কাতালগঞ্জের কিছু অংশ, রহমতগঞ্জ, আগ্রাবাদ হোটেলের সামনে, আগ্রাবাদ রামপুর এলাকায়ও পানি জমেছিল। আজ বৃষ্টি হতে পারে : পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানায়, আজ রোববার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ মাঝারি থেকে ভারী এবং কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি অতবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির ফলে মহানগরীর কোথাও কোথাও অস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে এবং চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগে গতকাল দুপুর ১টায় দেওয়া আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তায় বলা হয়, দেশের অভ্যন্তরে বজ্রমেঘ তৈরি অব্যাহত থাকায় আগামীকাল সোমবার দুপুর ১টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে এসব এলাকার কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতাসহ চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধস হতে পারে।
এদিকে একই সময় কালবৈশাখী ঝড়ের অপর এক সতর্কবর্তা অনুযায়ী, সোমবার দুপুর ১টার মধ্যে চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের উপর দিয়ে বিদ্যুৎ চমকানোসহ পশ্চিম অথবা উত্তর–পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যেতে পারে।
মেয়রের দাবি, এক ঘণ্টায় পানি নেমেছে : সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে নগরীর আগ্রাবাদ রামপুরা এলাকায় জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি দেখতে যান মেয়র শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, আজব বাহার খাল রামপুরা ওয়ার্ডজুড়ে আছে। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অংশ হিসেবে সিডিএ কাজের জন্য বাঁধ দিয়েছে। এ কারণে এখানে পানি উঠেছে। আশ্বস্ত করতে চাই, এই বাঁধ খুলে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। ক্রমান্বয়ে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড বাঁধগুলো খুলে দেবে।
তিনি বলেন, জামালখান, প্রবর্তকের মোড়, মেডিকেল, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ এসব এলাকায় হিজরা খাল ও জামালখান খালে বাঁধ দেওয়ার কারণে পানি উঠছে। চট্টগ্রাম শহরের অন্য কোনো অংশে পানি উঠে নাই। আশ্বস্ত করছি, স্বল্প সময়ের মধ্যে খালের বাঁধ খুলে দেবে। মাটি থাকলে মাটি উঠিয়ে নিয়ে যাবে। পুরো পরিষ্কার করে দেবে।
রাত ৯টার দিকে প্রবর্তক মোড় পরিদর্শনে আসেন মেয়র। এ সময় তিনি বলেন, চলমান খাল সংস্কার ও জলাবদ্ধতা নিরসন কার্যক্রমের কারণে সাময়িকভাবে কিছু এলাকায় পানি জমলেও পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। পানি দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়নি। মাত্র ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে নেমে গেছে, যা আমাদের জন্য ইতিবাচক বার্তা।
তিনি দাবি করেন, আগে যেসব এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ছিল, তার অনেকগুলোতেই এবার পানি জমেনি। তবে হিজরা খাল, কাট্টলী, গেইটস মোড়, চকবাজার ও জামালখান এলাকার কিছু অংশে পানি জমার বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মেয়র বলেন, খাল সংস্কার ও বাঁধ অপসারণের কাজ চলমান থাকায় কিছু এলাকায় সাময়িক ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। তবে নগরবাসী ও গণমাধ্যমকে সহায়তার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড ও সিডিএকে অন্তত পাঁচ থেকে সাত দিন সময় দিতে হবে। হিজরা খাল, জামালখান খাল, মুরাদপুর খাল ও রামপুর খালসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রায় ৩০টি বাঁধ অপসারণের কাজ চলছে। এসব কাজ সম্পন্ন করতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে পাঁচ দিন সময় চাওয়া হলেও শনিবার আবারও বৃষ্টি হওয়ায় কাজ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাই তিনি অতিরিক্ত আরও দুই দিন সময় লাগতে পারে। প্রয়োজনে আরও কয়েকদিন সময় বাড়ানো হতে পারে।
তিনি বলেন, যে–কোনো ভারী বৃষ্টিতে কিছু সময়ের জন্য পানি জমতেই পারে। কিন্তু সেটি দীর্ঘ সময় স্থায়ী হলেই কেবল তাকে জলাবদ্ধতা বলা যায়। আগে অনেক এলাকায় দুই থেকে তিন দিন পর্যন্ত পানি থাকত। এখন এক ঘণ্টার মধ্যেই নেমে যাচ্ছে। এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখতে হবে।
শাহাদাত বলেন, চলমান বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ইতোমধ্যে ১৫ এপ্রিল থেকে নালা–নর্দমা ও খাল পরিষ্কারের কার্যক্রম শুরু করেছে, যা আগামী ছয় মাস অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি নগরীর ২১টি খাল খননের জন্য ডিপিপি প্রণয়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সিডিএর অধীনে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড বিভিন্ন খাল ও সেতু সংলগ্ন এলাকায় কাজ করছে। তবে নগরবাসীর দুর্ভোগ বিবেচনায় কিছু স্থানে সাময়িকভাবে কাজ স্থগিত রেখে বাঁধ অপসারণ করা হয়েছে, যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে।
তিনি বলেন, রিটেইনিং ওয়াল ও শিটপাইলের কিছু কাজ এখনই শেষ করা সম্ভব হবে না। কারণ এগুলো সরিয়ে ফেললে রাস্তা ও খালের ক্ষতি হতে পারে। তাই ধাপে ধাপে কাজ সম্পন্ন করা হবে।
ডা. শাহাদাত বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ২৫ মে থেকে ভারী বর্ষণ শুরু হতে পারে। তাই এর আগেই ২০ মে’র মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো কাজ করছে। জলাবদ্ধতায় সাময়িক ভোগান্তির জন্য নগরবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা সবাই মিলে চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতামুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। তাই চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমকে ইতিবাচকভাবে দেখা এবং সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া জরুরি।














