এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের মধ্যে ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেট লিস্টে থাকার পরও নিজেদের অপরাজেয় প্রমাণের নতুন কৌশল নিয়েছে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব। খবর বিডিনিউজের।
জনমানসে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও সাহসের জানান দিতে রাজধানী তেহরানের রাস্তায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রকাশ্যে মিশে যেতে দেখা যাচ্ছে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচিসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, সমপ্রতি তেহরানের কেন্দ্রস্থলে কয়েকশ মানুষের ভিড়ে দেখা গেছে প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ফুটেজে তাদের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সেলফি তুলতে, হাত মেলাতে ও কথা বলতে দেখা যায়। যদিও গত ৮ মার্চ দায়িত্ব নেওয়া ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মুজতাবা খামেনিকে এখনো জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, নেতাদের প্রকাশ্যে আসাটা ইরান সরকারেরই একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে তারা বিশ্বকে দেখাতে চায়–যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তুমুল অভিযানের মুখেও তাদের মনোবল ভাঙেনি। তারা একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ও দেশের জনগণের ওপর নিজেদের শক্ত নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বেরও জানান দিতে চাইছে। গত মাসে পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বন্ধের আলোচনার সময় ইসরায়েলের হিট লিস্ট থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির নাম সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমানে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রস্তাবকে অবাস্তব আখ্যা দেওয়ায় সেই আলোচনা থমকে গেছে। এই পরিস্থিতিতে পেজেশকিয়ান ও আরাকচির রাজপথে পদচারণা মূলত মার্কিন–ইসরায়েলি চাপের মুখে নিজেদের নির্ভীক প্রমাণের একটি চেষ্টা।
ইরানের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নেতাদের এই সরব উপস্থিতি এটিই প্রমাণ করে যে, ইসরায়েল শীর্ষ ইরানি নেতাদের হত্যা করতে ওঁৎ পেতে থাকলেও ইরানিরা ভীত নন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অনেক ইরানিকেই ইরানের নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আনুগত্য প্রকাশ করতে দেখা গেছে। কেউ কেউ দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়েই দেশে বোমা হামলার প্রতিবাদ জানান। রয়টার্স জানায়, বর্তমানে প্রতি রাতে তেহরানের বিভিন্ন চত্বরে সমাবেশের ডাক দেওয়া হচ্ছে। এসব সমাবেশে সরকারের একনিষ্ঠ সমর্থকদের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদেরও উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ডন–এর ইরান বিষয়ক উর্ধ্বতন বিশ্লেষক ওমিদ মেমারিয়ান বলেন, তীব্র চাপের মুখে থাকার পরও সমর্থকদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে প্রকাশ্যে আসার এই কৌশল নিয়েছেন ইরানি নেতারা। যদি সমর্থকরাই রাজপথ ছেড়ে দেয়, তবে সরকারের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। অবশ্য নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান–এর প্রধান হাদি ঘায়েমি বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তার মতে, নেতাদের এই জনসমক্ষে আসা আসলে এক ধরনের মানবঢাল হিসেবে কাজ করছে। অনেক মানুষের মাঝে থাকলে তাদের ওপর হামলা চালানো ইসরায়েল বা আমেরিকার জন্য অনেক বেশি রক্তক্ষয়ী হবে এবং বিশ্বজুড়ে ইরানের প্রতি সহানুভূতি তৈরি হবে, বলেছেন তিনি। রাস্তায় সরকার সমর্থকদের নিয়মিত উপস্থিতির কারণে বিরোধীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলেও অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা এবং অন্যদিকে যুদ্ধের ডামাডোলে অন্তত সাতজন রাজনৈতিক বন্দির দ্রুত ফাঁসি কার্যকর করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়েছে। রাস্তায় সশস্ত্র বাহিনী ও কট্টর সরকার সমর্থকদের অবস্থানের কারণে অনেক সম্ভাব্য বিক্ষোভকারী আতঙ্কিত হয়ে সন্ধ্যার পর আর ঘর থেকে বের হচ্ছেন না, বলেন ঘায়েমি।














