তদন্তসাপেক্ষে দুর্ঘটনার কারণ বের করতে হবে, ব্যবস্থা নিতে হবে দায়ীদের বিরুদ্ধে

| রবিবার , ১৬ আগস্ট, ২০২৬ at ৭:২৩ পূর্বাহ্ণ

সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে এলএনজি নামে স্ক্র্যাপ জাহাজে গ্যাস লিকেজ হয়ে বিষক্রিয়ায় সেফটি ইনচার্জসহ ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় আমরা মর্মাহত। এ মৃত্যু অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। আজাদীর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ দুর্ঘটনা ছিল ভয়াবহ। গত ২৫ বছরে কোনো একটি ইয়ার্ডে এত লোকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। এই ইয়ার্ডটি গ্রিন ইয়ার্ড, অথচ শ্রম আইন ভঙ্গ করায় এদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। বারবার নোটিশ, পরিদর্শন এবং নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও এরা যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ভাটিয়ারী উপকূলে অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে ৫ বছর আগে আনা এলএনজি নামের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজে অন্য দিনের মতো প্রায় ৩০ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। এ সময় গ্যাসের ট্যাংকে লিকেজ হয়। এতে করে শিপইয়ার্ডে কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়ায় ঘটনাস্থলে ২০ জনের বেশি শ্রমিক আহত হন। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আহতদের উদ্ধার করে ইয়ার্ডে প্রধান ফটকের সামনে নিয়ে এলে ৩ জনের মৃত্যু হয়। বাকিদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেনাবাহিনীও উদ্ধার কাজে অংশ নেয়।

আজাদীতে প্রকাশিত অন্য সংবাদে বলা হয়েছে, ‘দুর্ঘটনার মূল কারণ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা না রাখা’। এতে বলা হয়, সীতাকুণ্ডের দক্ষিণাঞ্চলে গড়ে ওঠা শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে গত ১২ বছরে ১৬১ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। শুধুমাত্র সচেতনতার অভাবে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন গেছে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, একটু সচেতন হলেই এই মৃত্যুর মিছিল থামানো যেত। ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং নামের যে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ৯ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে তারা যদি শুধু বিশেষায়িত মাক্স ব্যবহার করতেন, তাহলে এতগুলো মানুষ মারা যেতেন না। গ্রিন ইয়ার্ড হিসেবে ওই ইয়ার্ডে বিশেষায়িত মাস্ক মজুদ রয়েছে, শুধু শ্রমিকেরা পরেননি বা তাদের পরতে বলা হয়নি। শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে প্রতি বছরই দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পাশাপাশি আহত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা না রাখায় দুর্ঘটনার মূল কারণ বলেও মনে করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসা। সংস্থাটির হেড অব অ্যাডভোকেসি মোহাম্মদ আলী শাহীন আজাদীকে বলেন, গত ২৫ বছরে কোনো একটি ইয়ার্ডে এত লোকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। এই ইয়ার্ডটি গ্রিন ইয়ার্ড, অথচ শ্রম আইন ভঙ্গ করায় এদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। বারবার নোটিশ, পরিদর্শন এবং নির্দেশনা দেওয়া সত্ত্বেও এরা যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি বলেন, শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে এখনো অনেক শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড মালিকের মধ্যে প্রয়োজনীয় সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার ঘাটতি রয়েছে। একটি গ্রিন ইয়ার্ডে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে একসঙ্গে এতগুলো শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা বিষয়টিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

দুর্ঘটনা তদন্তে ৯ সদস্যের কমিটি গঠন করেছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। কমিটিতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে আহ্বায়ক ও সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) সদস্যসচিব করা হয়েছে। সদস্য করা হয়েছে সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর, বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রতিনিধিকে। তদন্তের স্বার্থে কমিটি প্রয়োজনে এক বা একাধিক সদস্য কোঅপ্ট করতে পারবে।

এদিকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে কারও পক্ষে বা বিপক্ষে যাওয়ার সুযোগ নেই। সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সঠিক তথ্য বের করে আনা। ইয়ার্ডটিতে নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্সের কোনো ঘাটতি ছিল কি না, তা নিবিড়ভাবে তদন্ত করা হবে।

আসলে এই দুর্ঘটনায় এত শ্রমিকের প্রাণহানি একটি নজিরবিহীন ঘটনা। নিয়মিত তদারকির অভাব, শ্রমিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং দ্রুত জাহাজ ভাঙার প্রবণতাএসবই এ ধরনের দুর্ঘটনার কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবু এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনা কেন ঘটেছে, তা তদন্তসাপেক্ষে বের করতে হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। শ্রমিকের জীবন ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএল্‌ভিস প্রেস্‌লি : বিংশ শতাব্দীর সাংস্কৃতিক আইকন