শরীরের আকর্ষণীয় প্যাটার্নের কারণে সারা বিশ্বে অ্যাকুরিয়াম ফিশ হিসাবে জনপ্রিয় টাইগার পার্স বা ‘ঘঘ’ মাছ নিয়ে গবেষণা করবেন বাংলাদেশ ফিশারিশ রিচার্স ইন্সটিটিউটের (বিএফআরআই) বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিএফআরআইয়ের কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের ‘বার্ষিক গবেষণা অগ্রগতি পর্যালোচনা ও গবেষণা প্রস্তাবনা চূড়ান্তকরণ’ শীর্ষক কর্মশালায় দেশের সুনীল অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নে টাইগার পার্স বা ‘ঘঘ’ মাছের সম্ভাবনাসহ ৩টি নতুন গবেষণা প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়। উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাপী অর্নামেন্টাল ফিশ বা শোভাময় মাছ হিসাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা টাইগার পার্স বা ‘ঘঘ’ মাছের সম্ভাবনা নিয়ে ২০২০ সালে দৈনিক আজাদীতে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অবশেষে সেই প্রতিবেদনের দীর্ঘ ৬ বছর পর মাছটি নিয়ে গবেষণার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বিএফআরআই বিজ্ঞানীরা। টাইগার পার্স বা ‘ঘঘ’ মাছের লেজ ধরলে তার মুখ থেকে ‘ঘঘ’ সুরে শব্দ বের হয় বলে মাছটির এ নাম। অনেকেই এটাকে ভোয়াং মাছও বলে থাকে। এটি বরগুনী মাছ নামেও পরিচিত।
বাংলাদেশ ফিশারিজ রিচার্স ইন্সটিটিউটের (বিএফআরআই) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য প্রযুক্তি কেন্দ্র প্রধান ড. মোহাম্মদ আশরাফুল হক জানান, ‘টাইগার পার্স’ বা ‘ঘঘ’ একটি মাঝারি আকারের মাছ, যার বন্টন সীমা বিস্তৃত। মাছটির বৈজ্ঞানিক নাম বা প্রাণিতাত্ত্বিক নাম টেরাপন জার্বুয়া। এটি বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মালেশিয়া, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, চীন ও জাপান পর্যন্ত মহাসাগর এবং ভূ–মধ্য সাগরে এই প্রজাতির মাছের প্রাচুর্য বেশ ভাল রকমেই রয়েছে। তবে একমাত্র বাংলাদেশ উপকূলেই মাছটির ১২ মাস বা সারা বছর প্রজননের রেকর্ড রয়েছে। তিনি জানান, মাছটি বাংলাদেশ, ভারত ও কম্বোডিয়ায় বরগুনী মাছ ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ‘কাঠ–কোই’ নামে পরিচিত। এছাড়া জিরপাই, গরঙ্গেটা, জলকন্যা, গোর, কিলিপোথু বৈকেলি, সমুদ্রাকিলি, গঙ্গা কিলি, পোল বাতেয়া, ইরি বাতেয়া, শ্রীলংকাতে পলিন–কেচঞ্চন, অস্ট্রেলিয়ায় ক্রিসেন্ট গ্রান্টার, ক্রিসেন্ট পার্চ, মায়ানমারে; বাঘাট, জেলামা, কিরং–কিরং, মেংকারং, কেরং–কেরং, সেকিরং, সুকিরোং, কোকোরেহ, জামব্রুং, মালয়েশিয়ায় রুমপাক, জেন্ডাং–জেন্ডাং, ইন্দোনেশিয়ায় জাঙ্গজান, মাঙ্গাহুয়া, বাবাগুনি, কালারো, জাপানে কোতোহিকি, ইয়াগাটা–ইসাকি, কোরিয়ায় সাল–বেন–জা–রি, এনগা–হান্ন– কিয়াং, এনগা–গাই–কিয়ার, এনগা–নান–গায়ং, ফিলিপিন্সে দ্রেকে সাক, তসারাবাড়ো, আস্তসারবাড়ো ইন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে সি ওং, সি সি কং, চীনে এক্স ল্যান ইন, কেনিয়ায় নাগাগু, কৌরমৌ , কুরমনও, মাদাগাস্কারে সুমাহা, ওমানে বাআম, থিয়েব, ইয়াল্লি, ইয়ানাম, জিমজাম, দক্ষিণ আফ্রিকায় ডোরিংভিস, খংটাফোলাইখং ইন, কুই, এনগাগু নামে পরিচিত। ড. আশরাফ জানান, মাছটি বিশ্বের বিভিন্ন উপকুলে বিভিন্ন সময়ে প্রজনন করে। এটি ভারত ও মিয়ানমার উপকুলে ৬ থেকে ৭ মাস প্রজনন করলেও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন উপকুলে এটি সারা বছর বা ১২ মাসই প্রজনন করে থাকে।
বিজ্ঞানীরা জানান, সাধারণত সমুদ্র থেকে মোহনার অগভীর পানিতে এসে এটি ডিম পাড়ে। সামুদ্রিক জোয়ারে প্লাবিত হয়, এমন খালবিলে এদের রেণু থেকে পোনা ফোটে। এরপর পক্ষকাল থেকে ২৮ দিনের মধ্যেই এরা সাগরে চলে যায়। আকারে ১০ থেকে ৩৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বড় হতে পারে মাছটি। সাধারণত: পুরুষ মাছের তুলনায় স্ত্রী প্রজাতির সংখ্যা হয় ৭/৮ গুণ বেশি। এ মাছের সদা চঞ্চল পোনাগুলো ক্ষিপ্ত গতিতে ওজানের দিকে ধাবিত হতে পারে। এরা খাল ও সাগরের ২০ মিটার (প্রায় ৬৭ ফুট) গভীরতম এলাকাতেও বসবাস করে। একেকটি ডিম থেকে চার লাখের বেশি পোনা বের হয়।
‘টাইগার পার্স’ বা ‘ঘঘ’ ‘ইউরিহেলাইন’ বা তীব্র লবণসহিষ্ণু প্রজাতির মাছ। এটি ১ পিপিটি (পানিতে লবণাক্ততা মাপার পরিমাপক বা পার্টস পার থাওজেন্ড) থেকে ৭০ পিপিটি পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। অথচ কক্সবাজার বঙ্গোপসাগরের পানির লবণাক্ততা থাকে সর্বনিম্ন ১৫ পিপিটি থেকে সর্বোচ্চ ৩৫ পিপিটি। এটি সর্বভুক মাছ হওয়ায় পঁচাগলা জৈব বর্জ্য খেয়ে সাবাড় করে। ফলে বলা যায়, এটি উপকুলের পরিবেশের জন্য উপযুক্ত ও উপকারী মাছ। ফলে এ মাছটির ব্যাপকভাবে চাষ করা সম্ভব। এমনকি ছোট ছোট জলাশয়, ড্রাম বা এ্যাকুরিয়ামে। হ্যাচারিতে পোনা ফুটিয়ে ‘অর্নামেন্টাল ফিশ’ হিসাবে সারাবিশ্বে মাছটি বাজারজাত করে দেশের ব্লু–ইকনোমি তথা সমুদ্র সম্পর্কিত অর্থনীতিতে নতুন দুয়ার উম্মোচন করা সম্ভব বলে মনে করেন বিএফআরআই’র প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আশরাফুল হক।
কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, কক্সবাজার সদর–রামু ও ঈদগাঁও আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল দেশের বিশাল সমুদ্রসম্পদ কাজে লাগাতে গবেষণার কাজে সবচেয়ে বেশি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন।












