ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র, উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানের অগ্রসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ মারা গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। গতকাল সোমবার বেলা সাড়ে ৩টার দিকে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছেন তোফায়েলের জামাতা তৌহিদুজ্জামান তুহিন এবং স্ত্রীর বড় ভাই মামুন তালুকদার শেখ।
স্কয়ার হাসপাতালের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বর্ষীয়ান রাজনীতিক তোফায়েল দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর বিকালে নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. রায়হান রাব্বানীর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন। স্কয়ার হাসপাতালে আট মাস আট দিন ধরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল বেলা সাড়ে ৩টায় তার মৃত্যু হয়। খবর বিডিনিউজের।
বাংলাদেশের রাজনীতির নানা বাঁক–বদলের সাক্ষী তোফায়েল আহমেদের রাজনীতিতে হাতেখড়ি কলেজ জীবনেই। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এ রাজনীতিক আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীতে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন উপদেষ্টা পরিষদে।
দ্বীপ জেলা ভোলা সদরের দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্ম তোফায়েলের। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর সেই গ্রামের আজহার আলী ও ফাতেমা খানমের ঘরে আসেন তিনি। ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে ১৯৬০ সালে তৎকালীন ম্যাট্রিকুলেশন পাসের পর ভর্তি হন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে। সেখান থেকে ১৯৬২ সালে আইএসসি এবং ১৯৬৪ সালে বিএসসি সম্পন্ন করেন। সে বছরই তিনি ভোলা শহরের আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন। তাদের একমাত্র সন্তান তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী পেশায় চিকিৎসক।
ব্রজমোহন কলেজে স্নাতক শেষে তোফায়েল ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে; মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেন। তিনি ১৯৬৪ সালে তৎকালীন ইকবাল হল (শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, পরের বছর মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহসভাপতি এবং ১৯৬৬–৬৭ শিক্ষাবর্ষে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি থাকাকালে চারটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা কর্মসূচি ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন তোফায়েল।
মুক্তিযুদ্ধে ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক চার প্রধানের একজন ছিলেন তোফায়েল। তিনি ছিলেন বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা সমন্বয়ে গঠিত পশ্চিমাঞ্চলের দায়িত্বে। মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম সংগঠক তোফায়েল স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন। ১৯৭৩ সালে ভোলা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। পঁচাত্তরের ২৫ জানুয়ারি দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার চালু হলে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় ‘রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী’ নিযুক্ত হন তোফায়েল। সব মিলিয়ে তিনি নয়বার এমপি হয়েছেন। রাজনীতির নানা ঘাত–প্রতিঘাত পেরিয়ে তোফায়েল ১৯৯২ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন, যে পদে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘ ১৮ বছর।
তোফায়েল আহমেদের ব্যক্তিগত সহকারী আবুল খায়ের জানান, গতকাল বাদ মাগরিব ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে তার জানাজা হয়।
প্রয়াতের স্ত্রীর বড় ভাই মামুন তালুকদার শেখ বলেন, মঙ্গলবার সকালে হেলিকপ্টারে করে তাকে ভোলা নেওয়া হবে। পরে বাদ জোহর ভোলা জিলা স্কুল মাঠে জানাজা শেষে গ্রামের বাড়িতে মা–বাবার কবরের পাশে দাফন করা হবে।











