চবি ক্যাম্পাসে বিশ্বকাপ উন্মাদনা

মো. শামীম হোসাইন, চবি প্রতিনিধি | শনিবার , ৪ জুলাই, ২০২৬ at ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ

সকাল প্রায় সাড়ে ৮টা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহরাওয়ার্দী হলের টেলিভিশন কক্ষ থেকে মৃদুকণ্ঠের ধ্বনি ভেসে আসছে। কেউ আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে জড়িয়ে বসে আছে, কেউ আবার নিজেদের পছন্দের দলের পতাকা কাঁধে নিয়ে চোখ রেখেছে টেলিভিশনের বড় পর্দায়। করিডোরজুড়ে উৎকণ্ঠা। হঠাৎই ভেসে আসে বজ্রধ্বনির মতো চিৎকার “গোওওল!” মুহূর্তেই নিস্তব্ধ পরিবেশ জেগে ওঠে উল্লাসে। কেউ ছুটে আসে আনন্দ ভাগ করে নিতে, কেউ আবার হারের বেদনায় মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে।

বিশ্বকাপ এলেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় যেন বদলে যায়। শ্রেণিকক্ষ, আবাসিক হল, টং দোকান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ফুটবল। কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর এই আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় তখন আক্রান্ত হয় বিশ্বকাপ জ্বরে। বিশ্বকাপ তখন চবি শিক্ষার্থীদের কাছে আবেগ, পরিচয় এবং উৎসবের নাম। দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো চবিতেও বিশ্বকাপ ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশেষ এক সংস্কৃতি, যেখানে রাজনৈতিক মতভেদ, একাডেমিক চাপ কিংবা ব্যক্তিগত ব্যস্ততার ঊর্ধ্বে উঠে সবাই এক হয়ে যায় নিখাদ ফুটবলের আনন্দে।

ক্যাম্পাসের চিরচেনা সবুজ প্রকৃতি তখন নতুন এক রূপ নেয়। আবাসিক হলগুলোর বারান্দা, জানালা, ছাদ, এমনকি শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও সাইকেলেও দেখা যায় প্রিয় দলের পতাকা। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স, পর্তুগাল কিংবা ইংল্যান্ড প্রতিটি দলেরই রয়েছে শক্তিশালী সমর্থকগোষ্ঠী। কেউ ছোট পতাকায় নিজেদের সমর্থন জানান, আবার কেউ কেউ প্রিয় দলের জার্সি গায়ে দিয়ে খেলা উপভোগ করে নিজেদের আবেগের গভীরতা প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রোফাইল ছবি, কভার ফটো ও স্ট্যাটাসে ফুটে ওঠে বিশ্বকাপের রঙ। বিশ্বকাপের বড় একটি অংশ অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ সময় গভীর রাতে। কিন্তু সময়ের এই বাধা চবি শিক্ষার্থীদের উৎসাহে ভাটা ফেলতে পারে না। পরীক্ষার চাপ কিংবা পরদিন ক্লাস থাকার পরও শত শত শিক্ষার্থী রাত জেগে খেলা দেখেন। হলের কমনরুম, বন্ধুদের কক্ষ কিংবা করিডোরে বসে খেলা দেখার মধ্যেও রয়েছে আলাদা আনন্দ।

ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উল্লাস, হতাশা কিংবা বিতর্কে সরব হয়ে ওঠে পুরো হল। গোল হলে করিডোর কাঁপিয়ে চিৎকার, আর হারলে দীর্ঘশ্বাস সব মিলিয়ে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্বকাপ মানেই কয়েক সপ্তাহের জন্য বদলে যাওয়া জীবনযাত্রা। রাতভর খেলা দেখে সকালে ক্লাসে হাজির হওয়া, ক্লাস শেষে ম্যাচ নিয়ে বিশ্লেষণে মেতে ওঠা কিংবা পরবর্তী ম্যাচের সম্ভাবনা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক সবকিছুই হয়ে ওঠে দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এবারের বিশ্বকাপ উন্মাদনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন। ছাত্রদলের উদ্যোগে বিশ্বকাপের শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো সরাসরি সমপ্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা চলবে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে। প্রতিদিন ম্যাচ শুরুর অনেক আগ থেকেই শহীদ মিনার চত্বরে জড়ো হতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। কেউ প্রিয় দলের জার্সি পরে, কেউ পতাকা হাতে, আবার কেউ বন্ধুদের নিয়ে চলে আসেন খেলা উপভোগ করতে।

খেলা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকাটি পরিণত হয় এক বিশাল দর্শক গ্যালারিতে। গোলের মুহূর্তে হাজারো কণ্ঠের একযোগে উল্লাসে কেঁপে ওঠে পুরো শহীদ মিনার এলাকা। প্রিয় দল গোল করলে আকাশমুখী চিৎকার, করতালি আর আনন্দে আলিঙ্গন আবার গোল হজম করলে হতাশার নিস্তব্ধতা সব মিলিয়ে তৈরি হয় স্টেডিয়ামের মতো পরিবেশ। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ম্যাচগুলোতে শহীদ মিনার এলাকা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় দর্শকে। আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকশিক্ষার্থী, কর্মকর্তাকর্মচারীরাও সেখানে উপস্থিত হন। চবি ক্যাম্পাসের টং দোকানগুলোকে বলা হয় অনানুষ্ঠানিক সংসদ। বিশ্বকাপের এই সময়ে সেখানে সংসদের আলোচ্যসূচির প্রায় পুরোটাই দখল করে নেয় ফুটবল।

কখনো কখনো এই আলোচনা বন্ধুত্বপূর্ণ তর্ক থেকে উত্তপ্ত বিতর্কেও রূপ নেয়। তবে ম্যাচ শেষ হলে সবাই আবার একসঙ্গে বসে পরবর্তী খেলার অপেক্ষা করে। বিশ্বকাপের উন্মাদনা শুধু দর্শকসারিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। চবি শিক্ষার্থীদের অনেকেই এই সময় নিয়মিত ফুটবল খেলায় অংশ নেন। কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, বিভিন্ন বিভাগের মাঠ কিংবা হলসংলগ্ন খোলা জায়গাগুলোতে বেড়ে যায় ফুটবল খেলার সংখ্যা। বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের মধ্যেও ছোটখাটো টুর্নামেন্ট আয়োজন করেন। ফলে মাঠের খেলাও সমানভাবে প্রাণ ফিরে পায়।

বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের খুনসুটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। কখনো ব্যানার, কখনো পোস্টার, কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাকযুদ্ধ সবই চলে আনন্দের অংশ হিসেবে। তবে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ পর্যন্ত বিভাজনের নয় বরং মিলনের। ভিন্ন জেলা, ভিন্ন বিভাগ কিংবা ভিন্ন মতের শিক্ষার্থীরাও বিশ্বকাপের আনন্দে একসঙ্গে বসেন, খেলা দেখেন এবং বন্ধুত্বের বন্ধন আরও দৃঢ় করেন।

প্রায় ২৩শ একরের বিস্তীর্ণ সবুজ ক্যাম্পাস, পাহাড়, ঝরনা আর তারুণ্যের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এমনিতেই এক অনন্য আবাসিক জনপদ। বিশ্বকাপ এলে সেই জনপদে যুক্ত হয় নতুন এক মাত্রা। এবারের বিশ্বকাপেও তেমন এক উন্মাদনা চলছে চবিতে। এখানে আর্জেন্টিনার সমর্থক আর ব্রাজিলের সমর্থক একই চায়ের টেবিলে বসে তর্ক করছেন, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের সমর্থক একই পর্দার সামনে বসে ম্যাচ দেখছেন, তারা সবাই যেন ভেসে যাচ্ছেন ফুটবলের এক অভিন্ন আবেগে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধরেকর্ডের ম্যাচ রেকর্ড গোলে রাঙালেন রোনালদো
পরবর্তী নিবন্ধব্যান্ড পার্টি ও পালকি নিয়ে ভোট দিতে এলেন অভিনেতা