শিক্ষার্থীদের টানা আন্দোলন ও শিক্ষক–কর্মকর্তা–কর্মচারীদের সর্বাত্মক কর্মবিরতিতে অচলাবস্থা কাটছে না চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট)। সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনকারীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশে বাধা দেওয়ায় নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম গত সাত দিন ধরে অবস্থান করছেন চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে। সেখান থেকেই অস্থায়ী প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ‘সংঘাত’ হিসেবে দেখতে নারাজ নতুন উপাচার্য। সামপ্রতিক বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও বক্তব্যে তিনি জানিয়েছেন, আলোচনার মাধ্যমেই এই স্থবিরতা কাটিয়ে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হবে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে আমি অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে দেখছি। শিক্ষার্থীরাই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ এবং তাদের সচেতনতা ও সক্রিয়তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আসল শক্তি। তাদের এই বিক্ষোভকে আমি কোনো সংঘাত বা মুখোমুখি অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করছি না; বরং এটিকে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের গভীর উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছি।’
তিনি আরও বলেন, একজন অভিভাবক হিসেবে শিক্ষার্থীদের যেকোনো আবেগ, দাবি বা গঠনমূলক সমালোচনা শোনার ও তা অনুধাবন করার সম্পূর্ণ দায়বদ্ধতা তার রয়েছে। উভয়ের মাঝে তৈরি হওয়া ভুল বোঝাবুঝি খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত নিরসন করা সম্ভব বলে তিনি আশাবাদী।
এদিকে অনলাইনে যোগদানের পর থেকেই চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসকে অস্থায়ী প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছেন নতুন উপাচার্য। এ প্রসঙ্গে তিনি জানান, অনলাইন কার্যক্রম একটি সাময়িক প্রশাসনিক সমন্বয় মাত্র হলেও সশরীরে উপস্থিত হয়ে সার্বিক অচলাবস্থা কাটানোই তার মূল লক্ষ্য। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরাসরি দিকনির্দেশনা এবং স্থানীয় সিভিল ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে তিনি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন। তার দাবি, গুটি কয়েক শিক্ষার্থী বাদে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ, শিক্ষক এবং কর্মকর্তা–কর্মচারীদের একটি অংশ তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং দাপ্তরিক জটিলতা নিরসনে গঠনমূলক পরামর্শ দিচ্ছেন।
অন্যদিকে চুয়েটের এই অচলাবস্থা নিরসনে ত্রি–পক্ষীয় সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের দিকে এগুচ্ছে জানিয়ে তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ৫০ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্থবিরতা কাটাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষক প্রতিনিধি, কর্মকর্তা–কর্মচারী এবং চুয়েট এলামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সমন্বিত উদ্যোগে একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এলামনাই অ্যাসোসিয়েশন শিক্ষক সমিতির সঙ্গে মধ্যস্থতা চালিয়ে যাচ্ছে। সব পক্ষকে নিয়ে একটি সার্বজনীন ও স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তিনি তাঁর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে আরও জানান, সশরীরে ক্যাম্পাসে উপস্থিত হয়ে দায়িত্ব পালন শুরু করাই এখন তার মূল অগ্রাধিকার। ক্যাম্পাস স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অচলাবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে অতিরিক্ত ক্লাস ও ল্যাব শিডিউল তৈরি করে দ্রুত সেমিস্টার শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রশাসনের। এছাড়া প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ‘উন্মুক্ত দরজার নীতি’ চালুর কথা জানিয়েছেন তিনি। যেন যে কেউ সরাসরি ভিসির কাছে তাদের সমস্যা ও মতামত প্রকাশ করতে পারেন।
এদিকে নতুন উপাচার্যের এসব বক্তব্য ও উদ্যোগের পরেও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। গত ২৬ সেপ্টেম্বর তাকে ‘লাল কার্ড’ প্রদর্শন, প্রতীকী প্রশ্নযাত্রা, মুখোশ মিছিল চোখে কালো কাপড় দিয়ে প্রতিবাদ মিছিল এবং সর্বশেষ আন্দোলনের দশম দিন গান কবিতায় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সর্বাত্মক কর্মবিরতির কারণে টানা দশদিন ধরে চুয়েটের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত অচল রয়েছে। এমনকি নবনিযুক্ত উপাচার্যের ডাকা জরুরি সভায় অংশ নেননি কম্পট্রোলার দপ্তরের কর্মকর্তারাও।
বিশ্লেষকদের মতে, অনতিবিলম্বে সকল পক্ষের মধ্যে ফলপ্রসূ সংলাপ এবং আন্তরিক সমঝোতার মাধ্যমেই কেবল চুয়েটের বর্তমান অচলাবস্থা নিরসন এবং শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।













