কেন আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হলেন বদিউর রহমান

যেভাবে টিকে গেল ব্যাংকটি

| বুধবার , ২২ জুলাই, ২০২৬ at ৭:৫০ পূর্বাহ্ণ

দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা এবং কিছু গুরুতর অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় দেরিতে হলেও আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকদের মূল্যায়ন শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটির তিন দশকের পথচলায় কারা কি ভূমিকা রেখেছেন তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যারা নিজেদের সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংটিকে এগিয়ে নিতে অবদান রেখেছেন তাদের গুরুত্ব দিয়ে গঠন করা হয়েছে নতুন পরিচালক পর্ষদ। বিগত বিভিন্ন সরকার আমলে কারা পরিচালনা পর্ষদ পরিচালনা করেছেন এবং কোনো পরিচালকের ক্ষেত্রে কোনও বঞ্চনার ঘটনা ঘটেছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে কোনো দ্বন্দ্ব বা সংঘাতের নজির খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন দলমতের কিছু ধর্মপ্রাণ মানুষ বিস্ময়করভাবে মিলেমিশে ব্যাংকটিকে চালাতে সক্ষম হয়েছেন। এমন চিত্রই গত দুই বছরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ একাধিক তদারক সংস্থার অনুসন্ধান ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে।

প্রায় দুই বছর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এস আলম গ্রুপের সম্পৃক্ততার কারণে আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে। ব্যাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক মনোনীত ৫ জন স্বতন্ত্র পরিচালকের হাতে দেওয়া হয় পর্ষদের দায়িত্ব। তখন সন্দেহ করা হয়েছিল এই ব্যাংকটি লুটপাটের কারণে ভেতরে ভেতরে ফাঁপা হয়ে গেছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট একাধিক তদন্ত সংস্থার অনুসন্ধানে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। কোনো প্রভাবশালী বা বিতর্কিত গ্রুপের আগ্রাসনের কবলে পড়ে আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের এসেট কোয়ালিটির বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। জালজালিয়াতি বা অন্য কোনো অনৈতিক পন্থায় বিনিয়োগ কেলেঙ্কারি ঘটেনি। চরম দুর্দিনেও ব্যাংকটি তারল্য সংকটে পড়েনি এবং গ্রাহকের যেকোনো অঙ্কের টাকা সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে শত প্রতিকূলতা ও ঝুঁকির মধ্যেও বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পায় ব্যাংকটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সবদিক ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের পরীক্ষিত উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করা হয়েছে। যারা দেশের প্রথম সারির এই ব্যাংকটিকে প্রতিষ্ঠা করেছেন, অক্লান্ত পরিশ্রম করে সফলতা এনে দিয়েছেন এবং এখনো দুর্দিনে এগিয়ে নিতে পারার সামর্থ্য অছে এমন কয়েকজনকে রাখা হয়েছে নতুন পরিচালনা পর্ষদে। অচিরেই বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে আরো কয়েকজন যোগ্য উদ্যোক্তা পরিচালককে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।

গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শুরুতে নানা অভিযোগে যে ১২টি ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদ বাতিল করা হয়েছে তারমধ্যে কেবল আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়েছে গত ১৬ জুলাই। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা আগের চেয়ে উন্নতি হওয়ার কারণে আগের উদ্যোক্তাদের (পরীক্ষিত) কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অন্য যেসব ব্যাংকের বোর্ড ভেঙে দেওয়া হয়েছে, তাদের উদ্যোক্তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। তাই তাদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের গত তিন দশকের গুরুত্বপূর্ণ সূচক পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, প্রথম ১২ বছরেও ব্যাংকটি কাঙ্ক্ষিত সফলতার দেখা পায়নি। ২০০৭ সালে ক্লাসিফাইড বিনিয়োগ বহুগুণ বেড়ে যায়। সেসময়ে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নানান ব্যার্থতার ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন পরিচালক পর্ষদও ঢেলে সাজানোর পদক্ষেপ নেন ব্যাংকের পরীক্ষিত উদ্যোক্তা পরিচালকরা। কঠিন সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে সবাই একমত হয়ে দক্ষতার বিচারে পরিচালক পর্ষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন বদিউর রহমানকে। তখন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন আব্দুস সামাদ শেখ। মূলত এই এমডিচেয়ারম্যানের জুটিই নতুনভাবে আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের মজবুত ভিত্তি গড়ার কাজ শুরু করেন।

ব্যাংকটির সাবেক এক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ২০০৮ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত চেয়ারম্যান হিসেবে বদিউর রহমানের ৮ বছরে আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পেয়েছিল তিনজন ডাইনামিক ব্যবস্থাপনা পরিচালক। বদিউর রহমানের সঙ্গে কাজ করা দ্বিতীয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক হলেন একরামুল হক। এই জুটি ব্যাংকটিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অসামান্য সফলতা অর্জন করেন। আর বদিউর রহমানের সঙ্গে সেসময়ে কাজ করা শেষ সফল ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন মো. হাবিবুর রহমান। এই বদিউর রহমানহাবিবুর রহমান জুটির হাত ধরেই আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ব্যবসা সমপ্রসারণ ও সমৃদ্ধির অনন্য নজির সৃষ্টি হয়।

চেয়ারম্যান বদিউর রহমানের ৮ বছরের অগ্রগতি ও পজিটিভ গ্রোথই হলো ব্যাংকটির ৩০ বছরের পথচলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। ২০০৭ সালে ব্যাংকের প্রোফিট গ্রোথ ছিল মাইনাস ২২ ভাগ। ২০০৯ সালে প্রোফিট গ্রোথ বিস্ময়করভাবে ঘুরে দাড়ায়, পৌঁছায় প্লাস ১৩ ভাগে। ২০১১ সালে প্রোফিটের পজিটিভ গ্রোথ দাঁড়ায় ৩৪ ভাগে। এরপর ২০১৬ সালে বদিউর রহমানের শেষ বছর প্রোফিট গ্রোথ ছিল ১৮ ভাগে। এই ৮ বছরে আমানত প্রায় সাত গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২,৯৬৯ কোটি টাকা থেকে ১৯,৯৭০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। একই সময়ে বিনিয়োগ ২,৯৭২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৯,৬৫১ কোটি টাকায় পৌঁছে। আমদানি ব্যবসা ৩,২৬৮ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১১,৮৭৮ কোটি টাকা এবং রপ্তানি ব্যবসা ২,০১৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৮,৮১৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। পাশাপাশি ব্যাংকের শাখার সংখ্যা ৫০ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৪০এ পৌঁছায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক, কেপিএমজি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরিচালিত বিভিন্ন অডিট, পরিদর্শন ও পর্যালোচনার পরই ব্যাংকটির পরিচালনা কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আর এই কঠিন চ্যালেঞ্জের সময়েও ১০ বছর পর ২০২৬ সালে আবারো পরিচালক পর্ষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়েছে সেই পরীক্ষিত উদ্যোক্তা পরিচালক বদিউর রহমানকে। একইভাবে পর্ষদের ইসি কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়েছে আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের দুই মেয়াদের সফল পর্ষদ চেয়ারম্যান সেলিম রহমানকে। তিনি কেডিএস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএ’র প্রথম সহসভাপতি হিসেবে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

এছাড়া বর্তমান পরিচালনা পর্ষদে প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা পরিচালক হিসেবে আরো ফিরেছেন, নাজমুল আহসান খালেদ, হাফেজ মো. এনায়েত উল্যা, মুহাম্মদ হারুনের পুত্র আনোয়ার হোসেন, মীর আহমেদ সওদাগরের পুত্র মোহাম্মদ আব্দুস সালাম, বাদশা মিয়ার পুত্র মো. রফিকুল ইসলাম এবং মুহাম্মদ মাহতাবুর রহমানের পুত্র ইমাদুর রহমান। প্রতিষ্ঠাতা উদ্যোক্তা পরিচালক বাদশা মিয়ার পুত্র মো. রফিকুল ইসলাম নতুন পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর বলেন, কেডিএস গ্রুপের কর্ণধার খলিলুর রহমানকে আমাদের পর্ষদে পেয়ে আমরা গর্বিত ও আশাবাদী। ত্রিশ বছর আগে খলিলুর রহমানের আহ্বানে আমার বাবাসহ দেশের অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে বিনিয়োগ করেছিলেন। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত তিনিই সকল দুর্দিনে এই ব্যাংকটিকে আগলে রেখেছেন। যার ধারাবাহিকতায় এই নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে খলিলুর রহমানের অভিভাবকত্বেই আবার শুরু হলো ব্যাংকটির নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর যাত্রা। এস আলম সম্পৃক্ততার ব্যাপারে সাবেক একজন পরিচালক জানান, শুরু থেকেই এই ব্যাংকটি পরিচালনার ক্ষেত্রে সুশাসন ও পেশাদার নেতৃত্বের দিকে জোর দেন পরিচালকরা। সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কিছু ধর্মপ্রাণ ব্যবসায়ীর অর্থায়নে সাবেক সচিব এ জেড এম শামসুল আলম ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তারা বিভিন্ন দল বা মতের হলেও ব্যাংকের স্বার্থে সবাই এক ছিলেন। এমনকি রাজনৈতিক কারণে কখনোই আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের নেতৃত্বে দ্বন্দ্ব বা সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। তবে পর্ষদে প্রভাবশালী সব পক্ষের শক্ত প্রতিনিধিত্ব থাকায় এই ব্যাংকটি কারো একক কর্তৃত্বে পরিচালিত হয়নি। ফলে কিছু ঝুঁকি থাকা সত্বেও বড় ধরনের কোনো সংকটে পড়েনি। আর নতুন পর্ষদে ফেরানো হয়নি আব্দুস সামাদ লাবুকে। সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যাংকের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বদিউর রহমান বলেন, ২০০৮ সালে প্রথমবার চেয়ারম্যান হিসেবে আমাকে যখন দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক ছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ, সেই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে পরবর্তীতে আমার দায়িত্বের ৮ বছরে আমরা এই ব্যাংকটিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে সক্ষম হই। বর্তমানে ২০২৬ সালে আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে আবারও যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তেমনই কঠিন এক চ্যালেঞ্জের মুখে আমাকে পুনরায় পর্ষদের দায়িত্ব দেওয়া হলো। সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতায় আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব আমি যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করবো। ইনশাআল্লাহ অতীতের মতো অচিরেই আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংক আবারও ঘুরে দাঁড়াবে। প্রেস বিজ্ঞপ্তি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপুষ্টি, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা
পরবর্তী নিবন্ধকবিতা, গান ও কথামালায় স্বাধীনের বর্ষা উৎসব