যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের প্রথম দফার আলোচনায় ‘আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি’ হওয়ার মধ্যেই কয়েক দশক ধরে বলবৎ থাকা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে ইরানকে সীমিত পরিসরে তেল বিক্রির অনুমতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে একটি স্থায়ী চুক্তির রূপরেখায় সম্মত হয়েছে উভয়পক্ষ। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতার এ তথ্য জানিয়েছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় গতকাল সোমবার ২১ আগস্ট পর্যন্ত কার্যকর একটি সাধারণ লাইসেন্স জারি করেছে। এর আওতায় ইরানকে অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল ও অন্যান্য পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শান্তি আলোচনার অংশ হিসেবে ইরান আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া এবং হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরই ওয়াশিংটন এ পদক্ষেপ নেয়।
লাইসেন্সে বলা হয়েছে, ইরানের তেল বিক্রি, সরবরাহ ও খালাসের কাজ সম্পন্ন করতে প্রয়োজন হলে তা যুক্তরাষ্ট্রেও আমদানি করা যাবে। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে কার্যত ইরান থেকে তেল আমদানি বন্ধ রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এঙে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, সুইজারল্যান্ডে চলমান শান্তি আলোচনায় ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করা এবং আইএইএর পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তিনি বলেন, এই প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের তেলের উৎপাদন, সরবরাহ ও বিক্রির অনুমোদন দিয়ে ৬০ দিনের জন্য একটি অস্থায়ী সাধারণ লাইসেন্স প্রদান করেছে। লাইসেন্স অনুযায়ী, মার্কিন ডলারভিত্তিক তহবিলের মাধ্যমে ইরানের কাছে অর্থ পরিশোধ করা যাবে। তবে কিউবা, উত্তর কোরিয়া এবং ক্রাইমিয়া এ সুবিধার আওতার বাইরে থাকবে।
এর আগে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সই হওয়া একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় ইরানি অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য রপ্তানির পাশাপাশি ব্যাংকিং লেনদেন, বীমা ও পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট সেবাগুলোর অনুমোদন দিতেও সম্মত হয়েছিল ওয়াশিংটন। রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে কূটনীতিক জিম্মি সংকটের পর প্রথমবারের মতো ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তীতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচিত কয়েকটি গোষ্ঠীকে সমর্থনের অভিযোগে দেশটির বিরুদ্ধে আরও একাধিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। সামপ্রতিক বছরগুলোতে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীনের স্বাধীন শোধনাগারগুলো ইরানি তেলের বড় ক্রেতা ছিল। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইতালি, গ্রিস, তাইওয়ান ও তুরস্কও ইরানের তেলের গুরুত্বপূর্ণ বাজার ছিল।
এদিকে যুদ্ধ বন্ধে একটি চূড়ান্ত শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রথম দফার শান্তি আলোচনায় ‘আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি’ হয়েছে বলে জানিয়েছে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান ও কাতার। যদিও লেবানন এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি কাটেনি, তবু আগামী ৬০ দিনের মধ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানোর রূপরেখায় দুইপক্ষ একমত হয়েছে। পাকিস্তান ও কাতারের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, লেবাননে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ইসরায়েল এবং ইরান–সমর্থিত প্রতিরোধ শক্তি হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ বন্ধের একটি প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি সরাসরি যোগাযোগ লাইন চালুর বিষয়েও সমঝোতা হয়েছে।
গত সপ্তাহে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে এপ্রিল থেকে কার্যকর থাকা নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও অন্তত ৬০ দিন বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছিল দুই দেশ। গত রোববার যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ওই সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে সুইজারল্যান্ডে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। গতকাল সোমবার প্রথম কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত এ আলোচনা চলে। লেবাননে ইসরায়েলের হামলাকে কেন্দ্র করে হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ করে দেওয়ার তেহরানের ঘোষণা এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে নতুন করে হামলা শুরুর হুমকির কারণে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই এ আলোচনা শুরু হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এঙে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানান, আলোচনা খুবই ইতিবাচক এবং গঠনমূলক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এতে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি হয়েছে। তিনি প্রথম দফার এ আলোচনা ‘সফলভাবেই শেষ হয়েছে’ বলেও উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আমাদের ইরানের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রূপান্তর করতে নতুন অধ্যায় শুরু করার জন্য বলেছেন। তিনি লেবাননে বৈরিতা অবসানের বিষয়েও অগ্রগতির দাবি করেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ক্ষেত্রে ছাড়, জব্দকৃত কিছু সম্পদের অবমুক্তি এবং ইরানের জন্য একটি পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা চালুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, লেবাননে যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তান ও কাতার বড় ধরনের অগ্রগতি এনে দিয়েছে।
পাকিস্তান ও কাতারের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং লেবাননের মধ্যে সামরিক অভিযানের অবসান ঘটাতে একটি ‘সংঘর্ষ নিস্পত্তিমূলক সেল’ গঠনে সম্মত হয়েছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। আরাকচির ভাষায়, এর প্রথম বাস্তব পরীক্ষা হবে ‘লেবানন সংঘর্ষ নিস্পত্তি সেল’ গঠনের মাধ্যমে। সোমবারের আলোচনা শেষে ইরানের আলোচক দল সুইজারল্যান্ড ত্যাগ করলেও পুরো সপ্তাহজুড়ে কৌশলগত আলোচনা অব্যাহত থাকবে। প্রাথমিক ১৪ দফার সমঝোতা স্মারকে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এ আলোচনা চলবে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং লেবাননে যুদ্ধবিরতির মতো জটিল ইস্যুগুলোর সমাধান নিয়ে এখনো সংশয় রয়ে গেছে।
তবে রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, শনিবারের পর থেকে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। লেবাননের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল সর্বশেষ বিমান হামলা চালিয়েছিল শনিবার সন্ধ্যায়। গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের পর এই প্রথম তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
এদিকে, জে ডি ভ্যান্স, কাতারের প্রধানমন্ত্রী এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে এক ফোনালাপে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার প্রচেষ্টা এবং ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে জানিয়েছে লেবাননের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়।









