দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, শিল্প বাণিজ্য, রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে আনোয়ারায় বিশ্বমানের দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তোলার প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে বর্তমান সরকার। গতকাল বুধবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রীপরিষদ কমিটির (সিসিইএ) সভায় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বাংলাদেশে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে জানিয়েছে বেজা।
উল্লেখ্য, ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে আনোয়ারায় ৭৮৩ একর জমিতে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চল (সিইআইজেড) প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের একদিন পর গতকাল অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিসিইএ সভায় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। গত বছরের মে মাসে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী কর্ণফুলী টানেলের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত আনোয়ারার রাঙ্গাদিয়া মাঝের চর এলাকার সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শনে এসে এ এলাকার ৪ শত একর জমিতে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় আনোয়ারায় দেশের প্রথম মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব অনুমোদিত হয় বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আনোয়ারায় দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালার সংস্কার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে দেশে একটি আধুনিক মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধন্ত গ্রহণ করে বর্তমান সরকার। এ লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট ১০টি সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল পরিচালনা ব্যবস্থা, আইন, নীতিমালা, প্রণোদনা কাঠামো এবং পরিচালন মডেল পর্যালোচনা করে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রণয়ন করে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে অবকাঠামোগত সুবিধা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংযোগ, লজিস্টিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বিবেচনায় চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী আনোয়ারার সম্ভাব্য মাঝের চর ও রাঙ্গাদিয়া এলাকাতে দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়।
বেজা সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল বাস্তবায়নের মাধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অগ্রগতি ও সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একই সাথে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, আন্তর্জাতিক লজিস্টিক হাব গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এছাড়া দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, বৈশ্বিক বাণিজ্য সংযোগ বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। এটি বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
গত বছরের মে মাসে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী প্রকল্পের স্থান পরিদর্শনে এসে বলেন, আনোয়ারায় সরকার একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল (এফটিজেড) গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে দেশের অর্থনীতির ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে এ মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল হল বিদেশি ভূখণ্ডের মতো। এ জোনে প্রতিষ্ঠিত বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্য উৎপাদনের পর তারা নিজেরাই বিদেশে পাঠাতে পারবে। বাংলাদেশের কোনো দপ্তরে তাদের ঘোরাফেরা করতে হবে না। এটি বাস্তবায়ন হলে দেশে অর্থনীতিতে এই অঞ্চল বিরাট ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি এই অঞ্চলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরের অতি কাছে হওয়ায় আনোয়ারায় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল করার প্রস্তাবটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়েছে।












