অন্নদাশঙ্কর রায় : বহুমাত্রিক সাহিত্যস্রষ্টা

| বুধবার , ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ at ৭:২১ পূর্বাহ্ণ

অন্নদাশঙ্কর রায় (১৯০৪–২০০২)। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, কবি, ছড়াকার, ভ্রমণলেখক ও চিন্তাবিদ। উনিশ শতকের বাঙালি রেনেসাঁর উদার মানবতাবাদী ঐতিহ্যের অন্যতম উত্তরাধিকারী হিসেবে তিনি পরিচিত। ১৯০৪ সালে ১৫ ই মার্চ ভারতের ওড়িশা প্রদেশে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা নিমাইচরণ রায় এবং মাতা হেমনলিনী। পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ স্নাতক পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯২৭ সালে আইসিএস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ইংল্যান্ড যান। প্রশিক্ষণ শেষে ১৯২৯ সালে মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘদিন প্রশাসন ও বিচার বিভাগে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৫০ সালে চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন। পরে শান্তিনিকেতন ও কলকাতায় বসবাস করে সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। অন্নদাশঙ্করের সাহিত্যজীবনের সূচনা ওড়িয়া ভাষায় হলেও পরবর্তীকালে বাংলা ভাষা হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান সাহিত্যচর্চার মাধ্যম। ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাভিত্তিক ‘পথে প্রবাসে’ গ্রন্থ তাঁকে বাংলা সাহিত্যে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘অসমাপিকা’, ‘পুতুল নিয়ে খেলা’, ছয় খণ্ডের ‘সত্যাসত্য’ উপন্যাসমালা এবং চার খণ্ডের ‘ক্রান্তদর্শী’। ‘সত্যাসত্য’ ও ‘ক্রান্তদর্শী’তে আধুনিক জীবনের জটিলতা, সামাজিক সংকট, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং মানবিক সম্পর্কের নানা দিক প্রতিফলিত হয়েছে। প্রবন্ধসাহিত্যেও তিনি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘তারুণ্য’, ‘জীবনশিল্পী’, ‘দেশকালপাত্র’, ‘আধুনিকতা’, ‘সাহিত্যে সংকট’, ‘বাংলার রেনেসাঁস’, ‘শিক্ষার সংকট’, ‘টলস্টয়’ এবং ‘যুক্তবঙ্গের স্মৃতি’। ছোটগল্পের উল্লেখযোগ্য সংকলন ‘প্রকৃতির পরিহাস’, ‘হাসনসখী’, ‘যৌবনজ্বালা’ ও ‘শ্রেষ্ঠগল্প’। ছড়াসাহিত্যে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। ‘উড়কি ধানের মুড়কি’, ‘রাঙা ধানের খৈ’, ‘ডালিম গাছে মৌ’, ‘আতা গাছে তোতা’ ও ‘কলকাতা পাঁচালী’ তাঁর উল্লেখযোগ্য ছড়াগ্রন্থ। তাঁর বিখ্যাত ছড়া ‘খোকা ও খুকু’তে দেশভাগের বেদনাকে ব্যঙ্গাত্মক অথচ মর্মস্পর্শী ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলা ও ওড়িয়া সাহিত্যে অবদানের পাশাপাশি ইংরেজিতেও তিনি রচনা ও অনুবাদ করেছেন। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৬২ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, ১৯৭৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগত্তারিণী পুরস্কার এবং ১৯৮৩ ও ১৯৯৪ সালে আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘দেশিকোত্তম’ সম্মানে ভূষিত করে। এ ছাড়া বর্ধমান, রবীন্দ্রভারতী ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধি প্রদান করে। ২০০২ সালের ২৮ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএই দিনে
পরবর্তী নিবন্ধসুস্বাস্থ্য বিকিয়ে দিচ্ছেন না তো এক গ্লাস রঙিন শরবতে?