অনুমোদন ছাড়াই সরকারি জায়গা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভাড়া

জড়িত যমুনা অয়েলের সাবেক ও বর্তমান দুজন কর্মকর্তা । ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রমাণ পান কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক । দ্রুত খালি করার নির্দেশ

হাসান আকবর | বৃহস্পতিবার , ২৫ জুন, ২০২৬ at ৫:৫৬ পূর্বাহ্ণ

রাষ্ট্রায়ত্ত্ব তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের মালিকানাধীন জমি কোন ধরনের অনুমোদন ছাড়াই বেসরকারি একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দিয়ে দেন যমুনা অয়েলেরই সাবেক এবং বর্তমান দুজন কর্মকর্তা। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি জায়গাটি ভাড়া দিয়ে তারা লাখ লাখ টাকা নিজেরাই পকেটস্থ করেছেন বলে অভিযোগ উঠলে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং শীর্ষ কর্মকর্তারা সরজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সরকারি জায়গার বেসরকারি ব্যবহারের প্রমাণ পান। বিষয়টিকে ‘পরের জায়গা পরের জমি ঘর বানাইয়া আমি রই’ অবস্থার চেয়ে অনেক ভয়াবহ বলে মন্তব্য করেছেন যমুনা অয়েল কোম্পানির কর্মকর্তা কর্মচারীরা। যমুনা অয়েল কোম্পানির সিবিএ নেতৃবৃন্দ এবং শ্রমিক কর্মচারীদের একটি দল গতকাল কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার (এইচআর) মোহাম্মদ জুবায়ের চৌধুরীর সাথে সাক্ষাৎ করে দুঃসাহসি এই ঘটনার সাথে জড়িত দু’জনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর কোম্পানির সর্বস্তরে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, হালিশহর বি ব্লক এলাকায় রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানির ৭০ শতাংশ মূল্যবান জায়গা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত জায়গাটিতে কোম্পানি সীমানা দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখে। খালি জায়গাটিতে ভবিষ্যতে যমুনা অয়েল কোম্পানি নিজেদের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু খালি জায়গাটিতে চোখ পড়ে হালিশহর এলাকায় বসবাস করা যমুনা অয়েলের সাবেক এক কর্মকর্তার। এম হোসেন নামের উক্ত কর্মকর্তা কোম্পানিতে কর্মরত ম্যানেজার (এইচআর) মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম মিলে ওয়াসার একটি প্রকল্পে কাজ করছে এমন একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে জায়গাটি ভাড়া দিয়ে দেয়। ভাড়া প্রদানকালে তারা নিজেদেরকে যমুনা গ্রুপের অফিসার বলে পরিচয় দেয় বলেও বেসরকারি ওই প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা স্বীকার করেন। ভাড়া নেয়া জায়গায় এস এ ইঞ্জিনিয়ারিং নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরণের নির্মাণ সামগ্রী এবং ইকুইপমেন্ট রেখে আসছিলেন। যমুনা অয়েল কোম্পানির কর্মকর্তারা বলেছেন, বেসরকারি কোম্পানিটি আমাদের সীমানা দেয়াল ভেঙে সেখানে মালামাল ও ইকুইপমেন্ট রাখছিল।

সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে যমুনা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ হোসাইন ভুঁইয়ার কাছে অভিযোগ করা হলে তিনি জেনারেল ম্যানেজার (এইচ আর) মোহাম্মদ জুবায়ের চৌধুরী এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে উক্ত জায়গা পরিদর্শনে যান। সেখানে গিয়ে তিনি সরকারি জায়গায় বিনে অনুমোদনে বেসরকারি কোম্পানির কার্যক্রম দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তিনি ওখানে দায়িত্বরত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে ডেকে তারা কিভাবে জায়গাটি ব্যবহার করছে জানতে চান। তখন তারা দুজনের ফোন নম্বর দিয়ে বলেন, জায়গাটি এদের কাছ থেকে ভাড়া নেয়া হয়েছে। এমডি মোহাম্মদ ইউসুফ হোসাইন ভুঁইয়া নিজের ফোন থেকে ওই দুইটি নম্বরের একটিতে ফোন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ফোন রিসিভ করেন এবং জায়গাটি তিনি ভাড়া দিয়েছেন বলে জানান। তখন এমডি উক্ত ব্যক্তিকে তার পরিচয় দিতে বললেন, তিনি বলেন আমি যমুনার অফিসার। এমডি বলেন, আমি যমুনার এমডি বলছি। তখন ওই কর্মকর্তা চুপ হয়ে যান এবং পরবর্তীতে নানা দেনদরবার ও আকুতির মাধ্যমে বিষয়টি চাপা দেয়ার তোড়জোড় শুরু করেন।

সরকারি জায়গা বিনা অনুমোদনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেয়ার ব্যাপারে অভিযুক্ত যমুনা অয়েল কোম্পানির ম্যানেজার (এইচআর) মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম দৈনিক আজাদীকে বলেন, জায়গাটি ভাড়া দেয়া হয়নি, ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন, জাইকা প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জায়গাটি ব্যবহার করতে দেয়া হয়েছে। তারা আমাদের জায়গার কিছু নিচু অংশ ভরাট করে দেবেএই শর্তে জায়গাটি ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন।

তিনি বলেন, এমডি সাহেব ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে জায়গা ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছে। তারা ইতোমধ্যে তাদের মালামাল সরিয়ে নিতে শুরু করেছে।’ এই ব্যাপারে যমুনা অয়েল কোম্পানির বোর্ডের অনুমোদন বা স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানে কিনা, ম্যানেজার (এইচআর) কাউকে জায়গা ব্যবহার করতে দিতে পারেন কিনা জানতে চাইলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।

এই ব্যাপারে এস এ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জুয়েল নামের একজন কর্মচারীর সাথে পরিচয় গোপন রেখে যোগাযোগ করা হলে তিনি জায়গাটি কোম্পানি ভাড়া নিয়েছে বলে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমাদের কোম্পানি অনেক বড় কোম্পানি। তারা কিভাবে ভাড়া নিয়েছে আমি জানিনা। তবে ভাড়া নিয়েই আমরা জায়গাটি ব্যবহার করছি। অবৈধভাবে কিছু করছি না।

কিন্তু কোম্পানির ম্যানেজার আলী রিয়ালের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমরা এমনিতেই ব্যবহার করছিলাম। ভাড়া নিইনি। আমাদেরকে জায়গা ছেড়ে দিতে বলেছে, আমরা কয়েকদিন সময় নিয়েছি। আমরা জায়গাটি ছেড়ে দেবো। তিনি বলেন, একটি চক্রের জায়গাটিতে চোখ পড়েছে। খালি জায়গা থাকলে যা হয় আরকি! তারাই আপনাদেরকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে যমুনা অয়েল কোম্পানিতে তোলপাড় চলছে। কোম্পানির সর্বস্তরের কর্মকর্তা কর্মচারীদের মাঝে চলছে ক্ষোভ, কানাঘুষা। গতকাল কোম্পানির সিবিএর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনের নেতৃত্বে সিবিএ এবং কর্মচারীদের একটি দল যুমনা অয়েল কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার (এইচআর) মোহাম্মদ জুবায়ের চৌধুরীর অফিসে গিয়ে ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে মোহাম্মদ জুবায়ের চৌধুরীকে ফোন করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সিবিএর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। আমাদের জায়গা মানে সরকারি জায়গা। এটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। অথচ সরকারি জায়গা বেহাত হয়ে যাচ্ছে, আমাদের স্টেট ডিপার্টমেন্ট আছে তারা কিছু জানে না। আমরা জিএম সাহেবের সাথে দেখা করে ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদের কঠোর শাস্তি দাবি করে এসেছি। একইসাথে যাদের অবহেলা আছে তাদেরকেও শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রীকে লাল গালিচা সংবর্ধনা
পরবর্তী নিবন্ধনাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণ, যুবকের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন