বাংলাদেশের বয়স এখন ৫৫ বছর পেরিয়ে ৫৬ চলছে। ১৯৭৪ সালে দেশে প্রথম শিশু আইন হওয়ার পর আধুনিক যুগোপযোগী ‘শিশু আইন, ২০১৩’ প্রণীত হলেও চট্টগ্রাম অঞ্চলে আজও গড়ে ওঠেনি কোনো ‘কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র’। অথচ আইনের সাথে সংঘাতে জড়ানো শিশুদের সংশোধন ও পুনর্বাসনে এটি অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘ এই সময়েও কেন্দ্রটি না হওয়াকে চরম দুঃখজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞ ও শিশু অধিকার কর্মীরা।
চট্টগ্রাম বিভাগে অপরাধে জড়িয়ে পড়া বা বিচারাধীন শিশুদের আদালতের আদেশে বাধ্য হয়ে সুদূর গাজীপুরের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠাতে হয়। দূরে অবস্থিত এসব কেন্দ্রে সন্তানকে দেখতে যাওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য অনেক অভিভাবকেরই থাকে না। ফলে একদিকে যেমন আইনি লড়াই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে পারিবারিক যোগাযোগের অভাবে শিশুদের মানসিক সংশোধন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। তবে দীর্ঘ নিরাশার মাঝে কিছুটা আশার আলো দেখা দিয়েছিল ২০২৪ সালের এপ্রিলে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই সময়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)-এর সভায় চট্টগ্রামে একটি কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র (বালক) স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদন পায়। প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের রাউজানে ২ একর জায়গা ক্রয় করা হয়েছে এবং সেখানে প্রকল্পের সাইনবোর্ডও ঝুলানো হয়েছে। কিন্তু এরপর কাজের গতি স্থবির হয়ে পড়ে। বর্তমানে প্রকল্পটি কেবল সাইনবোর্ড সর্বস্ব অবস্থায় আটকে আছে। এখন পর্যন্ত এর টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ ছাড় করা হলেই পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট বা পিডব্লিউডি এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক টেন্ডার প্রক্রিয়া শুরু করবে বলে জানা গেছে। মন্ত্রণালয়ের অর্থ ছাড়ের ধীরগতির কারণেই মূলত নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে প্রশাসনিক পর্যায়ে দাপ্তরিক তথ্যের এক বড় শূন্যতা লক্ষ্য করা গেছে। চট্টগ্রাম আদালত, স্থানীয় সমাজসেবা কার্যালয় কিংবা গাজীপুরের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র–কোথাও নেই চট্টগ্রাম থেকে পাঠানো শিশুদের সুনির্দিষ্ট কোন পরিসংখ্যান। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো বলতে পারেনি ঠিক কত সংখ্যক শিশুকে প্রতি বছর এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। তবে ডেটার এই অনুপস্থিতি ও দাপ্তরিক উদাসীনতার মাঝেও চট্টগ্রাম আদালতে বিচারাধীন শিশু মামলার পাহাড় সমান জটই পরিস্থিতির ভয়াবহতা প্রমাণ করে। চট্টগ্রামে আইনের সাথে সংঘাতে জড়িত শিশুদের বিচার অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামের সাতটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। ট্রাইব্যুনালগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী– আইনের সাথে সংঘাতে জড়িত শিশু এবং সুরক্ষা ও যত্নের প্রয়োজন এমন শিশু সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা আড়াই হাজারের উপরে। ভিকটিম শিশু তথা সুরক্ষা ও যত্নের প্রয়োজন এমন শিশুদের রাখার জন্য চট্টগ্রামে চালু রয়েছে নিরাপদ আবাসন কেন্দ্র (সেফ হোম)।
হাটহাজারীর রৌফাবাদে ২০০৩ সালে ১.২ একর জায়গায় এ প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়। যেখানে চট্টগ্রামসহ বিভাগের অন্যান্য জেলার সুরক্ষা ও যন্তের প্রয়োজন এমন শিশুদের রাখা হয়। অন্যদিকে চট্টগ্রামসহ বিভাগের অন্যান্য জেলায় আইনের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে যারা তাদের পাঠানো হয় গাজীপুরে। গাজীপুরের টঙ্গী ও কোনবাড়িতে থাকা পৃথক দুটি (একটি বালক ও একটি বালিকা নিবাস) কেন্দ্রের পাশাপাশি যশোরেও একটি কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে। তবে সেখানে শুধুমাত্র যশোরসহ অত্র অঞ্চলের কিশোর–কিশোরীদের রাখা হয়।
সমাজসেবা অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগ ও চট্টগ্রাম জেলা সূত্র জানায়, শিশু আইনের অধীন সুরক্ষা ও যত্নের প্রয়োজন এমন শিশুদের হেফাজতে রাখার জন্য সেফ হোম থাকলেও চট্টগ্রাম কিংবা চট্টগ্রাম বিভাগের আইনের সাথে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া শিশুদের রাখার জন্য কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র না থাকার বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের নজরে রয়েছে। একনেক থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের জন্য রাউজানে যে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে–কয়েক মাস আগে সেটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রী পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনের সময় তিনি জানিয়েছেন, এ অঞ্চলের জন্য কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তোলা খুবই দরকার। বিষয়টি দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম দৈনিক আজাদীকে বলেছেন, চট্টগ্রামে কিশোর উন্নয়ন গড়ে তোলা হলে আর্থিকসহ সব রকম ভোগান্তি কমে আসবে। সেই অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি দ্রুত নজরে নিবেন এবং প্রকল্পের কাজ শুরু করবেন–এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা। চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে গাজীপুরে পাঠানো কিশোর–কিশোরীদের পরিসংখ্যান বিষয়ে তিনি বলেন, তথ্যটি আমাদের কাছে নেই। যদিও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, চট্টগ্রাম–২ এর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মাহমুদ–উল–আলম চৌধুরী মারুফ দৈনিক আজাদীকে বলেন, কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের অবস্থান অনেক দূরে হওয়ায় আইনের সাথে সংঘাতে জড়িত কিশোর–কিশোরীদের অভিভাকদের অনেক ভোগান্তির স্বীকার হতে হয়। আর্থিকসহ মানসিক সমস্যার সম্মুখীনও হতে হচ্ছে। সরকারও আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েন। এমন অবস্থায় প্রতিটি জেলার জন্য আলাদা আলাদা কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
মানবাধিকার আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসান দৈনিক আজাদীকে বলেন, শিশু আইনের মূল উদ্দেশ্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বরং শিশুদের অপরাধ জগৎ থেকে ফিরিয়ে এনে সংশোধন করা। সেই শিশুদের হাজার মাইল দূরে পাঠানো, আবার শুনানির সময় তাদেরকে আদালতে হাজির করা– এতে অভিভাবক যেমন ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন তেমনই শিশুদেরও মানসিক ক্ষতি হচ্ছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। আইন–আদালত সংক্রান্ত সব বিষয়ে ঢাকার পরেই চট্টগ্রামের অবস্থান থাকে। সেই চট্টগ্রামে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র না থাকাটা সত্যিই দুঃখজনক।











