একদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে আজ শনিবার কক্সবাজারে যাচ্ছেন সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার আগমণকে ঘিরে জেলাজুড়ে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শনিবার দিনভর ব্যস্ত সময় পার করবেন কক্সবাজার সদর, চকরিয়া, পেকুয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায়।
ভিত্তিপ্রস্তরের ফলক উন্মোচন করবেন চকরিয়া উপজেলা থেকে উপকূলীয় সাতটি ইউনিয়নকে আলাদা করে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার। এছাড়াও পেকুয়া সদর ইউনিয়নের কিছু অংশ নিয়ে নবগঠিত পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তরের ফলক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে এখানকার মানুষের দীর্ঘসময়ের লালিত স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেবেন।
এদিকে দীর্ঘ ২২ বছরেরও বেশি সময় পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের কক্সবাজার আগমনকে ঘিরে চারিদিকে সাজ সাজ রব পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো পর্যটন নগরী কক্সবাজারে আগমনী বার্তায় ব্যাপক উৎসাহ–উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে দলীয় নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সর্বসাধারণের মাঝে। চকরিয়া পৌরসভার বাস টার্মিনাল মাঠের জনসভায় লাখো মানুষের সমাগম ঘটাতে গত একসপ্তাহ ধরে ব্যাপক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পাড়া–মহল্লায় ঘরে ঘরে দাওয়াত পৌঁছানোসহ সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করা হয়। বিভিন্ন সড়ক সংস্কার, পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, সাজসজ্জা এবং নিরাপত্তা জোরদারের কাজও চলেছে পুরোদমে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একদিনের রাষ্ট্রীয় সফরের আগেরদিন গতকাল শুক্রবার সকালে কক্সবাজার এসে পৌঁছেছেন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার–১ (চকরিয়া–পেকুয়া–মাতামুহুরী) আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি কক্সবাজারে পৌঁছেই প্রধানমন্ত্রী যেসব স্থানে যাবেন সেখানকার সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে খোঁজখবর নেন এবং প্রশাসন ও দলীয় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন দিক–নির্দেশনা প্রদান করেন।
একইভাবে প্রধানমন্ত্রীকে নিরাপত্তা প্রদানকারী এসএসএফ সদস্যরা এবং গাড়ির বহর কয়েকদিন আগে থেকে কক্সবাজারে এসে অবস্থান করছেন এবং কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছেন।
কক্সবাজার জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক একেএম ইউছুপ বদরী দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘২০ বছরেরও বেশি সময় পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান কক্সবাজার আসবেন। এর আগে বিগত চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি কক্সবাজার এসেছিলেন। তাই দীর্ঘসময় পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকে কাছে থেকে দেখতে পাবেন, সেই উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছেন এ অঞ্চলের মানুষ। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে একগুচ্ছ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা শুনতে উন্মুখ হয়ে রয়েছি আমরা।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) অহিদুর রহমান দৈনিক আজাদীকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কক্সবাজার আগমণকে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এই সফরকে সফল, সুশৃক্সখল ও নির্বিঘ্ন করতে সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত সাফারি পার্কের সুসজ্জিত হাতি : প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশে স্থাপিত দেশের একমাত্র ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন শেষে পার্ক পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী। জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ দেশের চিরহরিৎ বন–পাহাড়, জলাধার আর উন্মুক্ত পরিবেশে বিচরণকারী শত শত প্রাণী নিয়ে এই সাফারি পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। অনন্য বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্রসমৃদ্ধ এই পার্কটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশি–বিদেশি পর্যটক–দর্শনার্থীদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠেছে। পার্কে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানো হবে সুসজ্জিত একদল হাতি দিয়ে। এজন্য পার্ক কর্তৃপক্ষ ব্যাপক প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছে।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল চট্টগ্রামের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা এবং ডুলাহাজারা সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘আমরা সকল ধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি প্রধানমন্ত্রীকে সাফারি পার্কে বরণ করে নিতে। অনেক বছর আগে তিনি পার্কে এসেছিলেন, তবে এবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই আসছেন।’
প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি যেগুলো : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আগমনকে ঘিরে নানা দাবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব রয়েছেন বিভিন্ন মহল। বিশেষ করে প্রতিনিয়ত মৃত্যুপুরীতে রূপ নেওয়া চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ককে ছয় লেনে রূপান্তর, চকরিয়ায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, লবণ চাষিদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করাসহ দেশিয় এই শিল্পের প্রসারে লবণের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা, ১০০ শয্যাবিশিষ্ট চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, ইক্যুইপমেন্ট সরবরাহ ও আইসিইউ স্থাপন, মাতামুহুরী উপজেলার একমাত্র বদরখালী কলেজ, চকরিয়া আবাসিক মহিলা কলেজ, পেকুয়া শহীদ জিয়াউর রহমান উপকূলীয় কলেজ, শহীদ জিয়া বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটকে জাতীয়করণ করাসহ উন্নয়নমূলক বিভিন্ন দাবি।
দিনব্যাপী কর্মসূচিতে যা রয়েছে : দলীয় ও জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শনিবার ঢাকা থেকে বিমানযোগে এসে সকাল দশটায় কক্সবাজার বিমানবন্দরে নেমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সোজা চলে যাবেন কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএমখালী ইউনিয়নে। সেখানে ৪৮ বছর আগে সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের খনন করা পাতলী খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন এবং সেখানে পথসভায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেবেন। সেখান থেকে দুপুর বারোটার দিকে উপস্থিত হবেন চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে। এখানে বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন এবং পার্ক পরিদর্শন করবেন। সোয়া বারোটার দিকে প্রধানমন্ত্রী চলে যাবেন পেকুয়া উপজেলার মেহেরনামা গ্রামে। সেখানে কবর জেয়ারত করবেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরামের। এর পর ওয়াসিম আকরামের বাবা–মাসহ পরিবার সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাত করবেন। এর পর সোয়া একটার দিকে নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার উদ্দেশ্যে যাত্রা এবং সেখানে মাতামুহুরী উপজেলার ভিত্তিপ্রস্তুরের ফলক উন্মোচন করবেন। সেখান থেকে ফের পেকুয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে ভিত্তিপ্রস্তরের ফলক উন্মোচন করবেন পেকুয়া পৌরসভার। এর পর বিরতি দিয়ে বিকেল চারটার দিকে উপস্থিত হবেন চকরিয়া উপজেলায়। এখানে চকরিয়া উপজেলা ও পৌরসভা বিএনপি আয়োজিত চকরিয়া পৌরসভার বাসটার্মিনাল মাঠের বিশাল জনসভায় যোগ দিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর পর বিকেল পাঁচটার দিকে রওনা হবেন কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়ক অভিমূখে। সেখানে মেরিন ড্রাইভ সড়ক ও সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য্য উপভোগ শেষে রাত আটটার দিকে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের লং বিচ হোটেল অডিটরিয়ামে আয়োজিত সুধী সমাবেশে যোগ দেবেন। কর্মসূচি শেষে রাত দশটার দিকে বিমানযোগে ঢাকার উদ্দেশ্যে কক্সবাজার ত্যাগ করবেন।











