হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল রোববার বিকালে ফটিকছড়ির আল–জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল বিকাল ৩টা ১৬ মিনিটে হেলিকপ্টারযোগে ফটিকছড়িতে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি পেলাগাজি সিঅ্যান্ডবি মাঠের অস্থায়ী হেলিপ্যাডে অবতরণ করে। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে ফটিকছড়িজুড়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। উল্লাসে মাতেন সকল বয়সি মানুষ। সকাল থেকে উৎসুক জনতা সিঅ্যান্ডবি মাঠের চারপাশ এবং রাস্তার দুই পাশে অবস্থান নেন। প্রধানমন্ত্রীকে এক পলক দেখার আশায় অনেককে গাছের ডালে এবং ভবনের ছাদে ভিড় করতে দেখা যায়।
হেলিপ্যাড থেকে বাবুনগর মাদ্রাসা পর্যন্ত যাতায়াতের সময় প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বাসের দুই পাশে সাধারণ জনতা ও বিএনপির নেতাকর্মীদের ভিড় ছিল। তারা স্লোগানে স্লোগানে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান। প্রধানমন্ত্রী হাত নাড়িয়ে শুভেচ্ছা জানান। বাবুনগর মাদ্রাসায় পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎ পর্ব শেষে তিনি হেফাজতের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন।
মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত নির্বাচনের সময় আমরা একসাথে থেকে যেভাবে কাজ করেছি, তার ফলেই দেশকে আমরা বিপদ থেকে রক্ষা করতে পেরেছি। বিগত ফ্যাসিবাদের কারণে সারা দেশে কীভাবে অর্থ–সম্পদ লুট করে দেশের বাইরে পাঠানো হয়েছে, তা আপনারা দেখেছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে আমি নানা সমস্যা প্রত্যক্ষ করেছি।
তিনি বলেন, আমরা ১৯৭১, ১৯৮৬, ১৯৯১ সালে দেখেছি। এমনকি বিগত নির্বাচনের সময়ও দেখেছেন, যাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে আমরা কাজ করেছিলাম, যারা দেশকে অন্যদিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, তারা বিগত কয়েকদিন ধরে দেশের মানুষকে বিভিন্নভাবে বিব্রত করতে চাচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে আমাদের সবাইকে একসাথে থাকতে হবে।
হেফাজতের দাবির জবাবে প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করে বলেন, আমরা পর্যায়ক্রমে আপনাদের সকল দাবিদাওয়া পূরণ করব। দেশের সকল মানুষ সমান সুযোগ পাবে। যেহেতু এদেশের বেশির ভাগ মানুষ ইসলাম ধর্মের, সেজন্য ইসলাম হিসেবেই দেশ চলবে। দেশে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চাচ্ছে, তারা যেন কোনো সুযোগ না পায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের দেশে উন্নয়ন করতে হবে, রাস্তাঘাট ও স্কুল–কলেজ করতে হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। আসুন সবাই একসাথে এমন কাজ করি, যে কাজ করলে দেশের মানুষ ভালো থাকবে। সম্প্রতি গ্যাসের যে সমস্যা হয়েছে তা আগামী ৫–৭ দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। আমরা চাই দেশটা এগিয়ে যাক এবং আমাদের সন্তানরা যাতে একটি সুষ্ঠু পরিবেশ পায়।
এর আগে মতবিনিময় সভায় হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৯টি দাবি সংবলিত স্মারকলিপি পেশ করা হয়। দাবিগুলো হলো, ১. মহান আল্লাহ, রাসুল (সা.), পবিত্র কুরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস করা। ২. কুরআন–সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক কোনো আইন পাস না করা। ৩. ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের রাতের আঁধারে নৃশংস গণহত্যা, ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের নারকীয় হত্যাযজ্ঞে জড়িত হুকুমের আসামি ও খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিতের মধ্য দিয়ে দেশে ন্যায়বিচার কায়েম করা। ৪. দাওরায়ে হাদিস মাস্টার্সের সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করার মাধ্যমে কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জন্য দেশ–বিদেশের সর্বত্র কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মোচন করা; বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে সরকারি চাকুরির বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে সরকারি মাদ্রাসার ডিগ্রির পাশাপাশি কওমি মাদরাসার দাওয়ারে হাদিস (মাস্টার্সের সমমান) ডিগ্রির উল্লেখ করা।
৫. শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা। ৬. চরম দ্বীন বিকৃতিকারী কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণা এবং হিজবুত তাওহিদকে নিষিদ্ধ করা। ৭. পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি–বিদেশি মিশনারিগুলোর যাবতীয় ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা বন্ধ করা। ৮. আলেমদের বিরুদ্ধে বিগত আওয়ামী সরকারের সময়ের করা সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে এদেশের আলেম–ওলামাকে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে অংশীদার করা।
৯. বাংলাদেশে তাবলীগ জামাতের কার্যক্রম ও টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা সব সময় এদেশের ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে এসেছে। ভারতের বিতর্কিত মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বাংলাদেশে আগমনে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থীদের ইজতেমার অনুমতি না দেওয়া।
মতবিনিময় সভার আগে আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ফটিকছড়ির জনগণের কল্যাণ ও সার্বিক উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ৩টি দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো ১. ফটিকছড়িতে ২৫০ শয্যার একটি আধুনিক মেডিকেল হাসপাতাল স্থাপন করা। ২. বিদ্যুৎ সমস্যা থেকে রক্ষা করতে ফটিকছড়িতে একটি বিদ্যুৎ গ্রিড স্টেশন স্থাপন করা। ৩. যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও দুর্ঘটনা রোধে চট্টগ্রাম–খাগড়াছড়ি সড়কটিকে চার লেনে উন্নীত করা।
মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও হেফাজতের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী ও হাটহাজারীর এমপি মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফটিকছড়ির এমপি সরোয়ার আলমগীর, রাউজানের এমপি গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী, রাঙ্গুনিয়ার এমপি হুম্মাম কাদের চৌধুরী এবং এমপি সাঈদ আল নোমান।











