ইদানীং বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ যা মূলত উচ্চমাত্রায় জ্বর, সর্দি কাশি, চোখ লাল হওয়া সহ নানান লক্ষ্মণ নিয়ে প্রকাশ পায়। এটি শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায় এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা করাতে ব্যর্থ হলে নিউমোনিয়া বা মস্তিষ্কের ক্ষয়ক্ষতি জনিত নানান জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। হাম বা রুবেলা নামে পরিচিত অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাস সংক্রমণ যা হাঁচির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাস বাতাসে বা ভূপৃষ্ঠে কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয় এবং সংক্রমণের কারণ ঘটায়। থালা বাসনের ব্যবহার, খাবার ও পানীয় ভাগ করে খাওয়া এবং একই ঘরে বসবাসের কারণেও শিশুদের মাঝে এ রোগের সংক্রমণ দ্রুত ঘটে।
বিলুপ্তপ্রায় হাম এ বছর সমগ্র দেশব্যাপী যেভাবে ধ্বংসাত্মক মহামারীর রূপ ধারণ করেছে তা আমাদের ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অংগুলি নির্দেশ করছে। প্রতিদিন শিশুমৃত্যুর মিছিল ভুক্তভোগী পরিবারগুলোতে ভীষণ উদ্যোগ ও হতাশার জন্ম দিচ্ছে। স্বাস্থ্যবিদদের মতে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুহার কমাতে হলে কমপক্ষে ৯০% শিশুকে টিকার আওতায় আনা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে অধিক সংখ্যক শিশু যদি টিকাদান প্রক্রিয়ার বাইরে থাকে তাহলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে সংক্রমণ কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়টি কঠিন হয়ে পড়বে। হামে কেন অধিক সংখ্যক শিশুর মৃত্যু হচ্ছে সরকার এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে যত্নবান হয়ে বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ইতিমধ্যেই সরকার হামের টিকার সংকটে শিশু মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেলেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দফতরের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের উদাসীনতা ও গাফিলতির কারণ খুঁজে বের করা সরকারের দায়িত্বশীল মহলের দায়িত্ব ও কর্তব্য। এক্ষেত্রে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় এনে ভবিষ্যতে যাতে জরুরি ভিত্তিতে স্বাস্থ্য সংকট এড়ানো যায় সে ব্যাপারে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচীর আওতায় বাদ পড়া শিশুদের হামের টিকা দানের বিষয়ে সরকারি নির্দেশনার
বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকলকে আরো বেশি তৎপর ও আন্তরিক হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের সচেতন ব্যক্তিবর্গ এবং শিক্ষক সহ অন্যান্য পেশার কর্মকর্তা–কর্মচারীদের সম্পৃক্ত করা গেলে সব শিশুদের টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে। ১৬ মে ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা ট্রিবিউন.কম পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ হাম নিয়ন্ত্রণে সরকারি–বেসরকারি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের পথে ভীষণ আতঙ্কজনক একটি খবর। পত্রিকার খবরে জানা গেছে
হাম আক্রান্ত শিশুকে হামের টিকার পরিবর্তে রেবিস (জলাতঙ্ক টিকা যা কুকুর বিড়ালের কামড়ের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়) টিকা দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে টাংগাইল জেলার ভুয়াপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ঘটনার বিবরণে জানা যায় মৌ খাতুন তার ১ মাস ৫ দিনের শিশু ফাতিয়াকে বুধবার দুপুরে টিকা দানের জন্য টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত স্বাস্থ্য পরিদর্শক মোহাম্মদ কাইয়ুম শিশুটিকে হামের টিকার পরিবর্তে রেবিস ভেকসিন টিকা দেয়। এতে শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আত্মীয় স্বজনের প্রতিবাদের মুখে বিষয়টি দ্রুত গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি ইতিমধ্যে উচ্চ আদালতে পর্যন্ত গড়িয়েছে। হাইকোর্ট বেঞ্চের বিচারপতি আহমদ সোয়েল এবং বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের রীট আবেদনের শুনানির প্রেক্ষিতে সরকারকে এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে শিশুটির সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
সরকারের ঐকান্তিক এবং জনগণের প্রত্যাশার বিপরীতে ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে আতংক ছড়িয়ে চলেছে। এই খণ্ড চিত্রটি দেশব্যাপী সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে। জনস্বাস্থ্যবিদ যে বলেছেন টিকার ব্যাপারে প্রচার প্রচারণায় ঘাটটি রয়েছে উল্লেখিত ঘটনার সাথে তাঁর বক্তব্যের সুস্পষ্ট মিল রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। টিকা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যোগাযোগ মাধ্যমে যথাযথ প্রচার প্রচারণা যে কম হচ্ছে বিষয়টি এর ইংগিত বহন করছে। যথার্থ জ্ঞান ও সচেতনতার অভাবে অভিভাবকরা আগেও শিশুদের টিকা দেওয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত ছিলেন এবং দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগেছেন। উপরের নেতিবাচক ও অপ্রত্যাশিত ঘটনাটি অনেক মা–বাবাকে নিরুৎসাহিত করবে যদি সরকার বা সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল থেকে দৃঢ় বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়। হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু রোধে সব শিশুকে অবশ্যই টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। আর এরজন্য সকল মহলের সমন্বিত উদ্যোগ ও কার্যকরী পদক্ষেপ প্রয়োজন।
অভিভাবকেরা যাতে সকল দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে শিশুদের টিকা দানে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত হন সে লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে প্রচার প্রচারণা বাড়াতে হবে। অনেকের ধারণা আছে অল্পবয়সী শিশুরা হামে আক্রান্ত হয়না। শিশুরা মাতৃগর্ভে হাম প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে জন্মায় এবং জন্মের পর মায়ের বুকের দুধ তাকে হাম থেকে সুরক্ষা দেয়। তবে এবারের হামের প্রাদুর্ভাব দেখে জানা যায় ১৯ দিনের ও ২৪ দিনের নবজাতকও হামে আক্রান্ত হয়েছে। বাংলাদেশে হামের সংক্রমণে যে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা শুধু সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা নয় বরং এটি একটি জটিল জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় অর্ধ লাখ হামে আক্রান্ত রোগীর বিশাল সংখ্যা জনমনে শঙ্কার সৃষ্টি করেছে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যদিও হামকে একটি সাধারণ রোগ হিসেবে দেখা হয় চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় দেখা যায় এই রোগের প্রভাব শুধু চামড়ার ফুসকুড়িতে সীমাবদ্ধ নয়। হামের ভাইরাসের একটি বৈশিষ্ট্য হলো এটির স্নায়ুতন্ত্রকে আক্রমণ করার ক্ষমতা যা আক্রান্ত শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে। গবেষণার তথ্যমতে জানা যায় হামের প্রভাবে যারা মস্তিষ্কের প্রদাহে আক্রান্ত হয় তাদের মধ্যে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ শিশু দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক সংকটের মুখোমুখি হয়। অত্যন্ত চিন্তার বিষয় হচ্ছে প্রাথমিকভাবে সুস্থ হওয়া অনেক শিশুর পরবর্তী জীবনে কথা বলতে না পারা, কিছু শেখার অক্ষমতা এমনকি স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাওয়ার মতো
স্থায়ী সমস্যার সৃষ্টি হওয়া। বাংলাদেশে বর্তমানে যে সমস্ত শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে তাদের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক রোগের শিকারে পরিণত হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। কাজেই হাম পরবর্তী জটিলতা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে শিশুদের শিশু বিকাশকেন্দ্রে বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ সুস্থ করে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। হাম পরবর্তী জটিলতার দীর্ঘ ভোগান্তি থেকে আক্রান্ত শিশুদেরকে সমন্বিত সেবাকেন্দ্রে রেখে চিকিৎসা সেবা দেওয়া জরুরি যা ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ যুগপৎভাবে চলমান রাখা প্রয়োজন। শিশুর বিকাশ জনিত বিষয় ও স্নায়বিক ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন হওয়া এখন সময়ের দাবি। শিশু বিকাশ কেন্দ্র গুলোর উন্নয়ন কাঠামোকে শক্তিশালী করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক, মানসিক, স্নায়বিক চ্যালেঞ্জের নিষ্ঠুর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে হবে। আমাদের সকলকে সচেতন থেকে সম্মিলিতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে যাতে হাম আক্রান্ত শিশুরা নিরাপদে থাকে এবং শিশুর হাম যেন নীরব মহামারী হয়ে না দাঁড়ায়।
লেখক: শিক্ষাবিদ, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট, প্রাক্তন অধ্যক্ষ রাংগুনিয়া সরকারি কলেজ ও বর্তমানে রেক্টর বনফুল আদিবাসী গ্রীনহার্ট কলেজ, মিরপুর, ঢাকা।












