হল্যান্ড থেকে

আমার সময়ে সাংবাদিকতা : যখন রিপোর্টার ছিলাম ২

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া

শনিবার , ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৪:১২ পূর্বাহ্ণ

মাস্টার্স শেষ না করে ‘ডেইলী লাইফে’ যোগ দিয়েছি শুনে বাবা গেলেন ভীষণ রেগে। বললেন, ‘লেখাপড়া সব উচ্ছনে গেল। ওর অর্থাৎ আমার মাস্টার্স আর দেয়া হবেনা’। তাকে আশ্বস্ত করতে বলি, ‘মাস্টার্স ঠিকই দেব। কাজে তো তেমন প্রেসার নেই। পাশাপাশি পড়াশুনা চালিয়ে যাবো’। বাবা মানতে রাজী নন। বাবার কাছে লেখাপড়া হচ্ছে জীবনের প্রথম ও শেষ লক্ষ্য। তার বদ্ধমূল ধারণা, লেখাপড়া ছেড়ে একবার চাকরীতে ঢুকলে লেখাপড়া আর হয়ে উঠে না। বাবার ভবিষ্যৎবাণী আমার ক্ষেত্রে ঠিক ছিল কিনা সে একটু বাদে লিখছি। বাবার সম্পূর্ণ অমতে সাংবাদিকতায় লেগে গেলাম। ইতোমধ্যে অনার্সের রেজাল্ট বের হলো। মাস্টার্স ক্লাস শুরু করেছি। সকাল সাতটা বিশে চট্রগ্রাম রেল স্টেশন থেকে ছেড়ে যায় চমৎকার একটি ট্রেন। বিশ্ববিদ্যালয়-গামী এই ‘শাটল’ ট্রেন ছিল ঝকঝকে, পরিষ্কার। স্টেশনের যাত্রী ও অন্যান্যরা বিশ্ববিদ্যালয়-গামী একদল ছাত্র-ছাত্রীদের দিকে তাকিয়ে থাকতো। আমাদের দিকে তাদের এইভাবে তাকিয়ে থাকা দেখতে আমাদের ভালো লাগতো। নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে হতো। আমাদের সময় (সত্তরের দশকে) শিক্ষাঙ্গনে আজকের মত এত নোংরা রাজনীতি ছিলনা। আজকের দিনের শিক্ষক-ভিসিদের মত রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করতো না। আমাদের সময় ভিসি ছিলেন সাহিত্যিক আবুল ফজল সাহেব। এরপর অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী। এনাদের ব্যক্তিত্ব ছিল ভিন্ন। দেখলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসতো আপনাতে। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলনা অস্ত্রের খেলা, ছিলনা রেগিংয়ের নামে টর্চার, হল-দখল কিংবা রগ-কাটা। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একবার আর্টস ফ্যাকাল্টি লাগোয়া কেন্টিনে দেখেছিলাম দু-গ্রূপ ছাত্রদের মারপিট। তা কেবল চেয়ার ছোড়াছুঁড়িতে ছিল সীমাবদ্ধ। কী যে ভালোলাগা পরিবেশ ছিল গোটা বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে, সে বলার নয়। আজকের অনেকের কাছে তা হয়তো স্বপ্নের মত লাগবে, অথচ সেটিই আজকেও হওয়ার কথা ছিল বাস্তবে। যাই হোক, ক্লাস শুরু হলো। দিনে দুটো, তিনটের বেশি ক্লাস থাকেনা। দুপুর দেড়-দুটোয় বাসায় ফিরি। তড়িঘড়ি করে মুখে কিছু গুঁজে দিয়ে সদরঘাট ডেইলী লাইফ অফিসের দিকে রওনা দেই – কখনো কয়েক মিনিটের হাঁটার দুরুত্বে রেল স্টেশনের ওভারব্রিজ পেরিয়ে হেঁটে, কখনো বা রিকশায়। দুপুর তিনটে থেকে রাত দশ/এগারটা তক। কাজের চাইতে আড্ডাটাই হতো বেশী অফিসে। অফিস করছি মনেই হতো না। ততদিনে আমরা (আমি, জিয়া, নূরু, ইলিয়াস) রীতিমত ঘনিষ্ট বন্ধু হয়ে গেছি। ইতোমধ্যে ওয়াহিদুল হকের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে একটি চমৎকার সাংস্কৃতিক আবহাওয়া সৃষ্টি হলো। তিনি ছিলেন ডেইলী লাইফের সহযোগী সম্পাদক। সম্পাদক ছিলেন আনোয়ারুল ইসলাম ববি। ইংরেজি পত্রিকা বাংলাদেশ অবজারভারের মালিক হামিদুল হক চৌধুরীর নাতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত এটি ছিল পাকিস্তান অবজারভার। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এর মালিকানা নিয়ে নেন। জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকার ১৯৮৪ সালের জানুয়ারি মাসে এর মূল মালিক হামিদুল হক চৌধুরীর কাছে ফিরিয়ে দেন। তিনি ছিলেন পাকিস্তান মুসলিম লীগের নেতা এবং প্রাদেশিক ক্যাবিনেটে মন্ত্রী। আবদুস সালাম ছিলেন এর দীর্ঘ দিনের সম্পাদক (১৯৪৯-১০৭২)। তবে এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন মোহাম্মদ শেহাবউল্লাহ। আবদুস সালামকে বরখাস্ত করার পর অবজারভারের সম্পাদক হিসাবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন প্রতিথযশা সাংবাদিক ওবায়দুল হক। এর পর কে এম এ মুনিম ও ইকবাল সোবহান চৌধুরী সম্পাদক হিসাবে কাজ করেন। দুঃখের বিষয় দেশের সব চাইতে বহুল পঠিত ও পরিচিত এই ইংরেজি দৈনিকটির প্রকাশনা ২০১০ সালের ৮ জুন বন্ধ হয়ে যায়। ডেইলী লাইফ বের করার আগে ববি ভাই (আনোয়ারুল ইসলাম) বাংলাদেশ অবজারভারের খুব সম্ভবতঃ ম্যানেজিং এডিটর ছিলেন। বছরের প্রায় সময়টা তিনি থাকতেন ঢাকা। বাংলার চাইতে ইংরেজিতে কথা বলতেন বেশি। ঠিক ওয়াহিদ ভাইয়ের উল্টো। কেন, তার বর্ণনা দেব পরে কোন এক সময়। ওয়াহিদ ভাই চট্টগ্রামে তাকে ঘিরে যে একটি বলয় তৈরী করলেন তার অন্যতম সঙ্গী ছিলেন দৈনিক আজাদীর প্রবীণ সাংবাদিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবী অরুণ দাশগুপ্ত। সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলতে পারেন এই সুদর্শন, অকৃতদার প্রবীণ সাংবাদিকটি। এর বাইরে ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক আবুল মোমেন, অধ্যাপক অনুপম সেন, অধ্যাপক তপন জ্যোতি বড়ুয়া এবং আরো জনা কয়েক। প্রবীণদের এই দলে মাঝে মধ্যে আমার সতীর্থ ও সমবয়েসী প্রলয়ও যোগ দিত। জিয়া, আমি, নুরু ছিলাম এই বৃত্ত থেকে একেবারে বাইরে না থাকলেও সম্পূর্ণ ভেতরের সেটিও দাবি করতে পারিনে। কেন, সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। ওয়াহিদ ভাই বেশ মজার মজার কথা বলতেন। আমাদের অফিসের সামনে রাস্তার ধারে শীতকালে একটি মাটির চুলা নিয়ে এক পিঠাওয়ালা ‘ভাঁপা পিঠা’ বানিয়ে বিক্রি করতো। দল বেঁধে একসাথে বসে ভাগ করে খাওয়া ছিল অফিসের অলিখিত রীতি। সে মুড়ি, কাঁচা লংকা, পেঁয়াজ আর সরিষার তেল মিশিয়ে হোক, কিংবা পেঁয়াজু বা সিঙ্গারা-সমুচা। একদিন আমাদের একজন ওই রাস্তার ধার থেকে ভাঁপা পিঠা কিনে আনলো। সবাই খাচ্ছে, ওয়াহিদ ভাই ছাড়া। ওনাকে খেতে বললে তিনি ‘না’ করেন। তখন কে একজন বলে উঠে, ‘ওয়াহিদ ভাই, খাননা, না-খেলে তো পয়সাটা নষ্ট হয়ে যাবে’। ওয়াহিদ ভাই তার স্বভাবসুলভ নীচু গলায় বলে উঠেন, ‘না খেলে তোমার পয়সা নষ্ট হবে, কিন্তু খেলে যে পয়সা এবং পেট দুটোই নষ্ট হবে। তাই একটাই কি নষ্ট হওয়া ভাল নয়’? আর একবার নিউজ ডেস্কে, ঢাকা থেকে আসা সাংবাদিক আনিস ভাই জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওয়াহিদ ভাই, অসিস (অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট টিম) কী’? খোঁটা-সূচক হাসি মুখে নিয়ে তিনি উত্তর দিলেন, ‘এইটাও জানোনা? আমার পাঁচ বছরের ছেলে, এশন সেও তা জানে’। তখন ওয়াহিদ ভাই তার স্ত্রী বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী, সানজিদা খাতুনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফ্লোরার সাথে (এশনের মা) সংসার করছেন। এক সময় ফ্লোরা ছিলেন তার গানের ছাত্রী। ওয়াহিদ ভাই তাকে গান শেখাতেন। আসকার দীঘির পাড়ে তার সুন্দর, পরিমাপটি করে সাজানো বাসায় কী এক কারণে একবার গিয়েছিলাম। একজন ব্যক্তির কত বহুমুখী প্রতিভা থাকতে পারে তা ওয়াহিদুল হকের সান্নিধ্যে না এলে জানা সম্ভব নয়। এত গভীর তার জ্ঞান, আক্ষরিক অর্থে সর্ব বিষয়ে। এখন মনে হয় সে কারণে তার কাছে যাবার, কাছে ভেড়ার, আড্ডা দেবার (যা তিনি চাইতেন আমাদের সবার কাছ থেকে) সাহস হতোনা। উনি চাইতেন আমরা তার কাছে যাই, তার সামনের চেয়ারে বসি, কথা বলি, আড্ডা দেই। আলোচনায় অংশ নেই। কিন্তু অংশ নেই কী করে। তার জন্যে যতটুক জানা দরকার, যে জ্ঞান থাকা দরকার তাতে যে ঘাটতি ছিল। একবার প্রলয়ের বোনের বিয়েতে আমরা সবাই মিলে ওর গ্রামের বাড়ি ধলঘাট গেলাম। ওয়াহিদ ভাইও, নুরুও ছিল সাথে। আঁধো অন্ধকারে গ্রামের মেঠো পথ ধরে হেঁটে যেতে যেতে ওয়াহিদ ভাই ঊর্ধ্বপানে তাকিয়ে বলে উঠলেন, ‘এমনি মুহূর্তে বিকাশকে ধুতি পরিয়ে দিলে কেমন হয়’? এর অনেক বছর পর। মাঝে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেছে ডেইলী লাইফে। ওয়াহিদ ভাই লাইফ ছেড়েছেন, বলা চলে ছাড়তে অনেকটা বাধ্য হয়েছেন। তিনি ফিরে গেলেন ঢাকা, জীবিকার প্রয়োজনে। একটা সময় স্কলারশিপ নিয়ে প্রলয় চলে গেল প্যারিস। আমি, নুরু, জিয়া – আমরা তিন জনই তখন ডেইলী লাইফ ছেড়ে ঢাকায় সাংবাদিকতা করছি। ঢাকায় আমরা তিনজন অনেকটা থিতু হয়ে বসেছি। প্রলয় এলো দেশে বেড়াতে। এক সন্ধ্যায় আমরা (জিয়া গিয়েছিল কিনা সঠিক মনে নেই) গেলাম ঢাকার আর কে মিশন রোডের কোনায় ইত্তেফাক ভবনে। দোতলার একদিকে ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ‘নিউ নেশন’। নিচে গেইটে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ওয়াহিদুল হক সাহেব কোনদিকে বসেন। আমাদের তিনজনকে দেখে অবাক ওয়াহিদ ভাই। তেমন কোন আলো নেই তার কামরায়। উনি বসে আছেন একা একটি কামরায়। সামনের টেবিলে কয়েকটা পত্রিকা, ম্যাগাজিন। আমাকে আর নুরুকে উদ্দেশ্য করে অনুযোগের সুরে বললেন, ‘দেখ, তোমরা কাছে থেকে আমার খবর নাওনা, অথচ প্রলয় এতদূর থেকে এসে, এলো আমার সাথে দেখা করতে”। প্রলয়ের মুখ থেকে শোনা এর পরের কাহিনী। তার ফরাসী স্ত্রীর সাথে সে ওয়াহিদ ভাইয়ের পরিচয় করিয়ে দেবার পর দেখা গেল ওয়াহিদ ভাই সমানে ওই ফরাসী মেয়ের সাথে বাংলায় কথা বলে যাচ্ছেন। তাকে ডাকছেন ‘কেতকী’ বলে, অথচ তার আসল নাম ‘ক্যাথরিন’। কেতকী তথা ক্যাথরিনের সাথে তিনি বাংলা বলছেন সেদিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ওয়াহিদ ভাই বলেন, ”কেতকী বলে ফরাসী, ইংরেজি বুঝে না। আমি ফরাসি জানিনে। অতএব, তার সাথে ইংরেজি বলা যা, বাংলা বলাও তা। অতএব, বাংলাই বলি”। এই ছিলেন নিজের মাঝে নিজেকে সব সময় গুটিয়ে রাখা এই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ওয়াহিদুল হক। সেই সন্ধ্যায় তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমি মনে-প্রাণে বাঙালি। অথচ বাঁচার জন্যে সারা জীবন ইংরেজি পত্রিকায় কাজ করে গেলাম। আজও বসে আছি এক ইংরেজি পত্রিকা অফিসের এক কোনায়”। কথাটা শুনে খুব খারাপ লেগেছিল। কত দুঃখ, কত হতাশা থাকলে জীবনের এই পর্যায়ে এসে এমন সফল এক ব্যক্তির মুখে এই ধরণের হতাশার কথা উচ্চারিত হতে পারে। তিনি সাংবাদিকতা শুরু করেন ইংরেজি পত্রিকার মধ্য দিয়ে। সে ছিল ডেইলী মর্নিং নিউজ। এর পর একে একে ‘দি পিপল’, ‘সাপ্তাহিক ওয়েব’, ‘ডেইলী নিউ নেশন’ এবং ‘ডেইলী স্টার’। সব কটি ইংরেজি পত্রিকা। তবে বাংলা দৈনিক জনকণ্ঠ এবং দৈনিক ভোরের কাগজেও নিয়মিত লিখতেন। তার কলাম, ‘অভয় বাজে হৃদয় মাঝে’ কলাম ছিল বেশ জনপ্রিয়। এক সময় রাজনীতিও করেছেন। কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে ছিলেন সংযুক্ত। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ‘স্বাধীন বাংলা শিল্পী সংস্থা’ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি ন্যাপের হয়ে নির্বাচন করেন। বাংলাদেশ, বাংলাকে তিনি ভালোবেসেছিলেন মনপ্রাণ দিয়ে। একটি কথা নিশ্চিন্তে বলতে পারি, তার মত খাঁটি বাঙালি, চিন্তায়, চেতনায়, মননে বোধকরি আর দ্বিতীয়টি নেই বাংলাদেশে। তিনি মারা যান ২০০৭ সালের ২৭ জানুয়ারি। নিজের দেহটি তিনি দান করে যান মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের জন্যে। জীবনে তো বটেই, মরণেও তিনি দিয়ে গেলেন তার সবটুকু। আমার পরম সৌভাগ্য যে এমন ব্যক্তিটিকে কাছ থেকে দেখা, কিছু শেখার সুযোগ পেয়েছি। তাকে জানাই পরম শ্রদ্ধা। চলবে। (১২-১২-২০১৯)
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

x