হল্যান্ড থেকে

আজাদীর দীর্ঘ পথচলায় ৩৫ বছর বয়সী কলাম ‘হল্যান্ড থেকে’

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া | শনিবার , ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ

আজ দৈনিক আজাদীর ৬৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। পাঠক হৃদয়ে স্থায়ী আসন দখল করা দৈনিক আজাদীর এই দীর্ঘ পথচলার প্রায় অর্ধেকের বেশি সময় ধরে সুদূর ইউরোপে বসে ‘হল্যান্ড থেকে’ কলামটি লিখে চলেছি। গর্ব করে বলিআজাদীর মত এই ‘কলামটি’ এতটা দীর্ঘ সময় বেঁচে আছেএটি আমার গর্বের অন্যতম কারণ। সেই একানব্বই সালে দৈনিক আজাদীতে লেখা শুরু, এই উপসম্পাদকীয় পাতায়, যা এখনো চলমান। একি চাট্টিখানি কথা? পঁয়ত্রিশ বছর তো অনেকেই বাঁচে না। অনেক পত্রিকাও না। আমি এখনো বেঁচে রয়েছি। বেঁচে রয়েছে আমার কলাম, ‘হল্যান্ড থেকে’। আর মাথা উঁচু করে গৌরব এবং পরম উজ্জ্বলতায় বেঁচে রয়েছে চট্টগ্রামের গর্ব, দৈনিক আজাদী। বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতের ইতিহাস, বিবর্তনের দিকে তাকালে আমরা দেখি কত ঝানু ঝানু জাতীয় পত্রিকা, যার লেখনীতে স্বৈরশাসকরা তটস্থ থাকতো, অনেকের তখ্‌ত নাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই পাকিস্তান আমল থেকে, তার অনেকগুলি ইতিমধ্যে ঝরে গেছে। কিছু আছে বেঁচে, অনেকটা জীবনামৃত দশায়, ধুঁকে ধুঁকে। কিন্তু কী অবাক করা! বন্দর নগরী থেকে প্রকাশিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম দৈনিক পত্রিকা, দৈনিক আজাদী এখনো সমান দাপটে বেঁচে রয়েছে এবং আঞ্চলিক পত্রিকা হয়েও তথাকথিত অনেক জাতীয় দৈনিকের চাইতে এগিয়ে রয়েছেকী সার্কুলেশনে কী সাংবাদিকতার মানদণ্ডে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত কয়েকটি বাংলা এবং ইংরেজি দৈনিকে একটা সময় (নব্বই দশক) লেখালেখি করতাম। পরবর্তীতে তাতে লেখার উৎসাহে ভাটা পড়ে। কেননা লেখকের সাথে যদি পাঠকের যোগসূত্র না ঘটে, তবে সে জাতীয় হোক আর আন্তর্জাতিক পত্রিকা হোক, তাতে লেখকের মনোতুষ্টি ঘটেনা বলে ধারণা। দৈনিক আজাদীতে লেখার আনন্দ এই যে, তাতে পাঠকের সাথে লেখকের একটি মেলবন্ধন ঘটে। যোগাযোগ ঘটে। তার উপর যেশহরে আমার জন্ম, বেড়ে উঠা, শৈশব, কৌশোর, যৌবনের অনেকটা সময় কাটানো, যেশহরের সাথে নাড়ির যোগাযোগ সেই শহর থেকে প্রকাশিত পত্রিকার প্রতি তো একটি সহজাত মমতা, ভালোবাসা, টান থাকবেই। তার প্রতি তো একটু বাড়তি পক্ষপাতিত্ব থাকবেই। আজাদীর ক্ষেত্রে আমার সম্পর্কের ব্যাপারটি সেখানেই। দৈনিক আজাদীকে কিছুতেই আমার নিজের থেকে আলাদা করে ভাবতে পারিনে। সময়ের পরিক্রমায় আজাদী পরিবারের সাথে আমার একটা নৈকট্য গড়ে ওঠে। গড়ে ওঠে দৈনিক আজাদী সম্পাদকের পরিবারের সাথে।

দেশে সাংবাদিকতা করাকালীন নিজের যে যৎসামান্য পরিচিতি ছিল তার পরিধি দেশের বাইরে এসে অনেক বেড়েছে। সে কৃতিত্বের সিংহভাগ দৈনিক আজাদীর। চট্টগ্রাম থেকে কেউ এলে, সে পরিচিত হোক আর অপরিচিত, ‘হল্যান্ড থেকে’ কলামটির কথা তোলেন। প্রশংসা সে সত্যি হোক কিংবা মিথ্যে, কিংবা বাড়িয়ে বলা সে কার না ভালো লাগে। স্বীকার করতে বাধা নেই, আমারও ভালো লাগে। ভালো লাগে যখন কেউ বলেন, আপনার লেখা নিয়মিত পড়ি। কিংবা যখন কেউ বলেন, আপনার লেখা মাঝেমধ্যে পড়ি। বিনয়ের সাথে তাদের কাউকে কাউকে বলি, ‘শুনে ভালো লাগছে যে আমার লেখা আপনার চোখে পড়েছে।’ কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে অপর পক্ষ সাথে সাথে বলে উঠেন, ‘না, না আসলেই পড়ি।’ আমার ঐভাবে বলার কারণটা হলো, আজকাল মানুষের পড়ার সময় কই। সময়ের সাথে তো আমরা যুদ্ধ করে চলেছি। তার উপর মোবাইলকে সময় দিয়ে কুল পাইনে, তা আবার পত্রিকায় ‘ছাপা’ লেখা। ‘চাপা’ ছাড়া আর কী? তারপরও মানুষ পত্রিকা পড়েন। চোখ বুলান। আর চাটগাঁর পাঠক তো দৈনিক আজাদী পড়বেই। একটা বিষয় লক্ষ্য করি, প্রবাসে, সে ইউরোপ হোক, কিংবা আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য, তার যদি পত্রিকা পড়ার অভ্যেস থাকে তবে তিনি এক ফাঁকে অনলাইনে দৈনিক আজাদী পড়বেনই। এর কোন ব্যত্যয় নেই। আজাদীর যে একটা বিশাল অনলাইন পাঠক আছে তার প্রমাণ পাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করা লেখার উপর দেশবিদেশ থেকে যখন নানা মন্তব্যে পাই। অনেকের মনে প্রশ্ন বাঘা বাঘা জাতীয় দৈনিকগুলির অনেকের যখন অকাল মৃত্যু হয়েছে, দৈনিক আজাদী আঞ্চলিক পত্রিকা হয়েও কোন জাদুবলে এমন দাপটের সাথে এখনো টিকে রয়েছে? উত্তরে কোন কিছু না ভেবেই বলা যায়দৈনিক আজাদী পাঠকের ‘পালস’ পড়তে পারে। পাঠক কী চান, কোন সংবাদ দেখতে, পড়তে চানতা আজাদী, আজাদীর পরিচালনায় যারা আছেন তারা, আজাদীর সংবাদ কর্মীরা জানেন। আর জানেন বলেই ৬৬ বছর আগে জন্ম নেয়া দৈনিক আজাদী এখনো বহাল তবিয়তে স্বস্থানে অবস্থান করছে। কেবল অবস্থান করছে নয়, সে অবস্থান দৃঢ় করে চলেছে দিনদিন। দৈনিক আজাদীর পাতায় পাঠক যেমন হরমুজ প্রণালীর দখল নিয়ে ইরানআমেরিকার সংবাদ সম্পর্কে জানতে পারেন, ঠিক তেমনি সাতকানিয়া কিংবা খাগড়াছড়িতে বন্য হাতি বন, ক্ষেতখামার উজাড় করছে সে সংবাদও পান। নিজ এলাকা, গ্রামের খবর পাঠক আজাদীর পাতায় দেখতে পান।

আজাদী কি কেবল সংবাদ পরিবেশন করে? মালিককে আর্থিক সচ্ছলতা এনে দেয়া ছাড়া পত্রিকা হিসাবে দৈনিক আজাদীর অবদান কী? এর উত্তরে বলতে হয়, আজকের যে আজাদী নিজ পায়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে, তার পেছনে কম ঘাম ঝরেনি। খোদ আজকের যিনি সম্পাদক, এম এ মালেক শুরুর দিকে নিজ হাতে চেনাশোনাদের ঘরে ঘরে গিয়ে দিনের পত্রিকাটি পৌঁছে দিতেন। সে কথা তিনি তার বিভিন্ন লেখায়, বক্তৃতায় বলেছেন। অনেক চড়াইউৎরাই পার হয়ে তবেই তো আজকের দৈনিক আজাদী। কেবল নিজে বেঁচে থাকাটা আজাদীর একমাত্র চাওয়া হতে পারতো। কিন্তু অন্য পত্রিকার টিকে থাকার সংগ্রামেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন সম্পাদক এম এ মালেক। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত আর একটি দৈনিক পত্রিকা বিনা পয়সায় ছাপিয়েছেন। জানিনে এখনো সে কাজটি হচ্ছে কিনা। এই কথাটি খোদ সম্পাদক মালেক ভাই গেলবার দেশে গেলে তার অফিস কক্ষে আড্ডা দেয়ার এক মুহূর্তে বলেছিলেন। এর বাইরে বড় অবদান যা আমার দৃষ্টিতে তা হলো, পাঠক এবং লেখক সৃষ্টি। এই প্রসঙ্গে লেখক, সাংবাদিক নাসিরুদ্দিন চৌধুরীর একটি লেখা থেকে কিছু অংশ এখানে উল্লেখ করতে চাই। দৈনিক আজাদীর ৬০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ৪২৪ পৃষ্ঠার একটি চমৎকার সংকলন বের হয়েছিল পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেকের সম্পাদনায়। তাতে সুলেখক নাসিরুদ্দিন চৌধুরী লিখেছিলেন, “চট্টগ্রামের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ নিয়ে যারা ভাবেন, এবং তাদের ভাবনা অনুবাদ করেন কালিকলমে, আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করি একমাত্র আজাদী পত্রিকাকেই তারা আত্মপ্রকাশের বাহন হিসাবে অবলম্বন করেন।” কথাটা খুবই সত্যি। আজাদীর সাথে দীর্ঘ পথ চলায় লক্ষ্য করেছি, অনেক নতুন লেখকলেখিকা তাদের প্রথম লেখা এই পত্রিকার পাতায় প্রকাশ পাবার পর তাদের সে কী উচ্ছ্বাস, আনন্দ। এখনো মাঝে মধ্যে দেখি অতি দুর্বল লেখা ছাপা হয় দৈনিক আজাদীর পাতায়। কিন্তু এ যে নতুনদের আরো লেখার জন্যে অনুপ্রেরণা জোগায়। ডাকসাইটে লেখক, কবি, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকদের পাশাপাশি নবীনদের লেখা ছাপিয়ে আজাদী সাহিত্য অঙ্গনে একটি বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করি। যে সমস্ত ব্যক্তি, লেখক, বিশিষ্টজনেরা দৈনিক আজাদীতে লিখেছেন বা লিখতেন কিংবা এখনো লিখে চলেছেন তাদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দিয়েছেন সাংবাদিক লেখক নাসিরুদ্দিন চৌধুরী। এদের মধ্যে আমার পরম বন্ধু ও বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের সহকর্মী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের কথা উনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। তার দুই ভাইয়ের কথা লিখেছেন। এই যে আমার গত ৩৫ বছর ধরে দৈনিক আজাদীতে লেখা তার শুরুও বন্ধু মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের হাত ধরে। আজাদীর পাতায় যাদের লেখায় সমৃদ্ধ হয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, যোগেশ চন্দ্র সিংহ, ওহীদুল আলম (কলেজিয়েট স্কুলে আমার শিক্ষক), সাহিত্যিক অধ্যাপক আবুল ফজল, অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ, হুমায়ুন আজাদ, আবদুল হক চৌধুরী, মাহবুব তালুকদার, বিপ্রদাশ বড়ুয়া, মঈনুল আলম, সুব্রত বড়ুয়া। এই তালিকা আরো দীর্ঘ।

সাংবাদিক হিসাবে আমার সুযোগ হয়েছে দৈনিক আজাদীর কর্মরত সাংবাদিকদের কাছাকাছি যাবার, তাদের কারো কারো সাথে বয়সের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও অনেকটা বন্ধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর মধ্যে দুজনের নাম উল্লেখ না করলেই নয়। একজন বন্ধু, আমার চাইতে পেশায় ও বয়সে বড়, এম নাসিরুল হক। আর একজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, কবি, লেখক অরুণ দাশগুপ্ত। অরুণদা আমাকে কোনোদিন নাম ধরে ডাকেননি। দেখা হলেই মুখে হাসি মেলে ‘আরে এসো ভাই এসো’ বলে কাছে টেনে নিতেন। অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয়, এই জীবনে দেশেপ্রবাসে অনেকের সাথে আমার উঠবস, মেলামেশা করার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু খ্যাতির চূড়ায় অবস্থান হয়েও স্বভাবে, চলনেবলনে অধ্যাপক খালেদ সাহেব ছিলেন, যাকে ইংরেজিতে বলা যায় ‘ডাউন টু দ্য আর্থ’। তাকে দেয়া আমার একটা কথা এখনো রাখতে পারিনি। সেই জন্য নিজেকে অপরাধী মনে হয়। একবার দেশে গিয়ে শুনি তিনি অসুস্থ। অফিসে আসছেন না। তিনি তখন থাকতেন সিরাজুদ্দোউলা রোডের এক ফ্ল্যাটে, খুব সম্ভবত তিন কী চার তলায়। এক দুপুরে নাসির ভাই (নাসিরুল হক), তার স্ত্রী ও আমি সস্ত্রীক, সাথে ছোট্ট শিশু সপ্তর্ষি গিয়েছিলাম তাকে দেখতে। ছিমছাম, পরিপাটি ঘর, কোনকিছুর বাড়াবাড়ি নেই। অথচ তিনি কী নন। একটি জনপ্রিয় দৈনিকের সম্পাদক, ভূতপূর্ব সাংসদ, সংবিধান কমিটির অন্যতম সদস্য, তার উপর নানা সংগঠনের সাথে তার সম্পৃক্ততা। অথচ কত সাধারণ জীবন যাপন। সাদা পোশাক ছাড়া তাকে আমি ভিন্ন পোশাকে দেখিনি। সেদিন এক পর্যায়ে তিনি আমাকে বলেছিলেন, “আপনি হল্যান্ডের বাঁধ সম্পর্কে লিখবেন। ডাচরা কীভাবে পানিকে জয় করেছে, সে কাহিনী আমাদের জানা দরকার।” ডাচদের সমুদ্রকে জয় করার উপর বার কয়েক লিখেছি, কিন্তু তিনি যেবাঁধের কথা বলেছিলেন সেটি সম্পর্কে আজ অবধি লেখা হয়ে উঠেনি। যাব যাব করে এখনো ওদিকে যাওয়া হয়ে উঠেনি। ঠিক করেছি আগামী সামারে যাবো। সামার ছাড়া সেখানে যাওয়াটা ঠিক উপযোগী নয়, আবহাওয়ার কারণে। আজাদী সম্পর্কে লিখতে গেলে এই গোটা পাতাতে লিখে শেষ হবে না। আজাদী এই শহরকে উপহার দিয়েছে বেশ কয়েক পরিচিত মুখ সাহিত্যিক, কবি, লেখক, সাংবাদিক। আজাদীর তিন ব্যক্তিত্ব পেয়েছেন জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার : সাবেক সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ পেয়েছেন ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’, বর্তমান সম্পাদক এম এ মালেক পেয়েছেন ‘একুশে পদক’ এবং কবি সাংবাদিক রাশেদ রউফ পেয়েছেন ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’। তার চাইতেও বড় যে পুরস্কার দৈনিক আজাদী পেয়েছে, তা হলো পাঠকের অফুরান ভালোবাসা। ভালোবাসা ছাড়া মানুষ বলেন কিংবা পশু কেউ বাঁচতে পারে না। যেমনটি পারে না পাঠক ছাড়া কোনও পত্রিকা বাঁচতে। আজকের এই দিনে, দৈনিক আজাদীর ৬৭তম জন্মবার্ষিকীতে গোটা আজাদী পরিবার এবং পাঠকদের জানাই উষ্ণ ভালোবাসা। আবারো বলি, শুভ জন্মদিন দৈনিক আজাদী।

লেখক : কলামিস্ট, সাংবাদিক, সাহিত্যিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআজাদী বলছে চট্টগ্রামের কথা, আমাদের কথা
পরবর্তী নিবন্ধএনায়েত বাজার পূজা উদযাপন পরিষদের প্রস্তুতি সভা