গেল সপ্তাহের একটি সংবাদ। টরেন্টো (কানাডা) থেকে বাংলাদেশ বিমানের ঢাকা–গামী একটি ফ্লাইট ইতালির রোম এয়ারপোর্টে প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে ৪০ ঘণ্টা আটকেছিল। প্লেনের ভেতরই ২৬০ যাত্রীকে প্রায় ৬/৭ ঘণ্টা বসে থাকতে হয়েছিল। ফলাফল চরম ভোগান্তি। এক পর্যায়ে বিমান থেকে নামিয়ে এয়ারপোর্টের ভেতর অবস্থানের অনুমতি মিললেও বাইরে হোটেলে যাবার অনুমতি মেলেনি সবার। যে সমস্ত যাত্রীদের ‘বাংলাদেশী‘ পাসপোর্ট ছিল তাদের এয়ারপোর্টে বেঞ্চে দীর্ঘ ৩০ ঘন্টার মত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। বাংলাদেশ বিমানের পক্ষ থেকে সব যাত্রীদের জন্যে হোটেলের ব্যবস্থা করা হলেও ‘আইনি বাঁধ’ থাকায় বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীদের বিমান বন্দরের বাইরে যাবার অনুমতি দেননি ইতালি কর্তৃপক্ষ। ফলে, কেবল কানাডিয়ান, আমেরিকান ও ইউরোপীয় পাসপোর্টধারী যাত্রীদের বিমানবন্দরের বাইরে হোটেলে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়।
২) বিদেশ যারা ভ্রমণ করেন বা করেছেন, বিশেষ করে যাদের রয়েছে বাংলাদেশি পাসপোর্ট তারা খুব ভালো করেই জানেন ভিসা এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট থাকা সত্ত্বেও ইউরোপ আমেরিকা সহ উন্নত দেশগুলিতে বিমানবন্দর ইমিগ্রিশনে কী হেনস্তারই মুখোমুখি হতে হয়। সবুজ পাসপোর্ট দেখেই প্রথমে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করবে আপনাকে। তারপর পাসপোর্টটি হাতে নিয়ে ভেতরের পাতাগুলি একটি একটি করে চেক করবে। তারপর শুরু হবে প্রশ্নের পালা। কোথায় যাবেন, কেন যাবেন, কী উপলক্ষে আসা, কদ্দিন থাকা হবে, সাথে কী পরিমাণ টাকা আছে, হোটেল বুকিং আছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। কোন সম্মেলন বা মিটিংয়ে অংশ নেবার জন্যে আমন্ত্রিত হয়ে এলে আমন্ত্রণ পত্র দেখান এবং ইমিগ্রেশন ডেস্কে বসা ব্যক্তিটি তার যা যা ইচ্ছে, সেই সমস্ত প্রশ্ন, প্রাসঙ্গিক না হলেও আপনাকে করবে। আজ থেকে ৩৫ বছর আগে প্রথম বিলেত যাবার সময় এই সবুজ পাসপোর্ট যখন ব্রিটিশ ইমিগ্রেশন কাউন্টারে দিয়েছিলাম, তখন আমাকে এমনতর জেরার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। কেবল বাংলাদেশী পাসপোর্ট হলে তাও না হয় মেনে নেয়া যায়, কিন্তু আমার সাথে ছিল হল্যান্ড থাকার রেসিডেন্ট পারমিট, অনির্দিষ্টকালের জন্যে। পাসপোর্টের রং তো আছেই। ভ্রমণকারীর গায়ের রংও এই ক্ষেত্রে বড় ফ্যাক্টর। সাদা চামড়াধারী না হলে আপনার পাসপোর্টকে বাজারে মাছ কিনতে গিয়ে ক্রেতা যেমন এপিঠ–ওপিঠ করে মরা মাছটাকে আরো মেরে ফেলে, ঠিক তেমনি ইউরোপ–আমেরিকা–কানাডার ইমিগ্রেশন কাউন্টারে আপনাকে যেতে হবে অনুরূপ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে, যদি না থাকে ইউরোপীয় পাসপোর্ট। সালটি খুব সম্ভবত ১৯৯১–৯২। হল্যান্ড এসেছি তার এক বছর আগে। বিবিসি থেকে ডাকযোগে চিঠি এলো। তখন ইন্টারনেট, ই–মেইল ছিলনা। ‘শ্যানগেন‘ ভিসা ব্যবস্থা চালু হয়নি। ব্রিটিশ ভিসা অফিস রাজধানী আমস্টারডামে। ট্রেনে পৌঁছুলাম সেখানে। ততদিনে আমার ‘পার্মানেন্ট স্টে–কার্ড‘ হয়ে গেছে। ভিসা পেতে কোন অসুবিধা হলোনা। কোন প্রশ্ন বা জেরার মুখোমুখি হতে হলোনা। এমনকি আমন্ত্রণ পত্রও দেখাতে হলোনা। কিন্তু জেরার মুখোমুখি হতে হলো ইংলিশ চ্যানেল পার হয়ে ওপারে ইংরেজদের দেশে পা দিতেই। সেটি ছিল সড়ক পথে। বেলজিয়াম পার হয়ে, ফ্রান্স, অতঃপর ফেরীতে ইংলিশ চ্যানেল পার হয়েই ব্রিটেন। ইমিগ্রিশনে পাসপোর্ট দেবার পর একই ধাঁচের জেরা। বিবিসি–র পাঠানো চিঠি দেখে বলে, যে–লেফাফায় এই চিঠি ডাকযোগে এসেছে তা দেখান। ভাগ্যিস তা ছিল। এর বছর খানেক পর যখন লাল পাসপোর্ট হাতে এলো তখন হাঁপ ছেড়ে বাঁচা।
৩) সমপ্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বাংলাদেশী যুবকের আক্ষেপ দেখলাম। তিনি লিখেছেন, এই সবুজ পাসপোর্টের কারণে তাকে অকারণে নাজেহাল করা হয়েছিল। ইউরোপ আমেরিকায় নয়, তুরস্কে। ভিসা এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে তিনি বেড়াতে গিয়েছিলেন ইউরোপ–এশিয়ার মাঝামাঝি অবস্থানরত এই দেশে। বৈধ ভিসা নিয়েই সে–দেশে ঢুকেছিলেন। ট্যুরিস্ট বাসে দেশের ভেতর ভ্রমণকালে যাত্রীদের পাসপোর্ট চেক করার জন্যে পথিমধ্যে বাহন দাঁড় করানো হয়। সবাই সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন। যাত্রীরা এক এক করে পাসপোর্ট বাড়িয়ে দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী দেখে ফেরত দেন। বাংলাদেশী এই তরুনের পালা যখন এলো, তারা পাসপোর্ট হাতে নিতেই তার দিকে সন্দেহভরা দৃষ্টিতে তাকে পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। যেন কোন আসামি। তার পাসপোর্ট কয়েকবার দেখার পর ওই কর্মচারীটি তার পাশে বসা সহকর্মীটির সাথে কী যেন আলাপ করলেন। এবার সেই সহকর্মীটি তার দিকে সেই একই সন্দেহভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। তরুণ আরো লিখেছেন, এদিকে আমার পেছনে লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। সবাই আমার দিকে কেমন যেন ভিন্ন দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন। আমি খুব অস্বস্তি ও অপমানিত বোধ করতে শুরু করি। তারপর আমাকে একপাশে দাঁড়াতে বলে, আমার পাসপোর্ট নিয়ে ভেতরে আর এক কামরায় চলে যান। আমি অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে থাকি। এক পর্যায়ে একে একে সব যাত্রী বাসে উঠে গেলেন। কেবল আমার জন্যে বাস দাঁড়িয়ে আছে। ইতিমধ্যে ঘণ্টা দেড়েক হয়ে গেছে। সবাই আমার জন্যে অপেক্ষা করছেন এটি ভেবে আরো খারাপ লাগছিলো। কিছুক্ষণ পর হাতে পাসপোর্টটি নিয়ে কর্মচারীটি ফিরে এলেন। আমার হাতে পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘সরি, আপনার এই ঝামেলা হয়েছে বলে, সব ঠিক আছে। আসলে কিছুদিন আগেও ভুয়া ভিসা নিয়ে কয়েকজনকে আমরা ধরেছিলাম। তাই এই বাড়তি সাবধানতা।‘ এই ধরনের অহেতুক সমস্যা ও ঝামেলার মুখোমুখি যে কতজনকে হতে হয়েছে এবং হচ্ছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। তবে এও সত্যি অনেকেই জ্ঞাতে–অজ্ঞাতে জাল ভিসা নিয়ে বিদেশ যাচ্ছে। যার খেসারত দিতে হয় ‘জেনুইন‘ যাত্রীদের।
৪) যেমন শিহাব মালেক। বছর কয়েক আগে শিহাব এসেছিল হল্যান্ড, বেড়াতে। উদ্দেশ্য সুইজারল্যান্ড, প্যারিসসহ ইউরোপ বেড়াবে। দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেকের কনিষ্ঠ পুত্র শিহাব। বৈধ ভিসা থেকে শুরু করে তার সব ডকুমেন্ট আছে। এমন কী স্পেনের যে সংগঠনের আমন্ত্রণ নিয়ে আসা তার কাগজও ছিল। সেই সময়টায় মালেক ভাই ও তার স্ত্রী কামরুন ভাবী লন্ডনে ছিলেন। ঠিক হলো শিহাব হল্যান্ড এসে পৌঁছুলে তারাও হল্যান্ড আসবেন। একসাথে ক‘টা দিন কাটাবেন। দেশ থেকে ফোনে মালেক ভাইয়ের বড় সন্তান, দৈনিক আজাদীর পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেক বলেন, শিহাব প্রথমবারের মত যাচ্ছে, ওকে রিসিভ করার জন্যে কাউকে এয়ারপোর্ট পাঠানো যায় কিনা। আমি নিজে যাব শুনে তিনি কিছুটা অবাক হয়ে বলেন, আপনি যাবেন? ওনাকে বলি, এখানে তো ড্রাইভার বা অন্য কেউ নেই, শিহাবকে রিসিভ করার জন্যে আমিই যাবো। যাই হোক, মালেক ভাই ফোনে জানিয়েছিলেন শিহাবের জন্য হোটেল বুক করতে। বুক করা হয়েছিল। তবে সেই হোটেল পরিবর্তন করতে হয়েছিল, কেননা ইতিমধ্যে মালেক ভাই তাদের জন্যে ভিন্ন আর একটি হোটেল বুক করেছিলেন। সবাই একই হোটেলে থাকা উত্তম ভেবে আগের হোটেল বুকিং বাতিল করি। কিন্তু হোটেল কর্তৃপক্ষ বুকিং এর ৪০০ ইউরো আর ফেরত দিলোনা। ভাগ্যিস এয়ারপোর্টে নিজে গিয়েছিলাম। না হলে যে শিহাবের ভাগ্যে কী হতো কে জানে। এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করছি। প্লেন অনেক আগেই ল্যান্ড করেছে কিন্তু শিহাবের দেখা নেই। ওদিকে লন্ডনে মালেক ভাই ও ভাবী উদ্বিগ্ন। ইমিগ্রেশনে কোন সমস্যা হলো কিনা এই ভেবে। এমন সময় শিহাবের ফোন। বলে, ইমিগ্রেশনে আটকিয়েছে। জেরা করছে, স্পেনে অনুষ্ঠান, হল্যান্ডে কেন এলেন, সাথে কত ইউরো আছে, কী কী কার্ড আছে। শিহাব জানালো তার কাছে ক্রেডিট কার্ড ছাড়াও সাত হাজার ইউরো ক্যাশ আছে। ইমিগ্রেশন পুলিশ সব ইউরো এক এক করে গুনলো। শিহাব ওদের বলে, রিসিভ করতে একজন বাইরে অপেক্ষা করছেন। শিহাবের ফোন এলো, ‘ভাইয়া, ওরা আপনার সাথে কথা বলতে চান।‘ ওদের প্রশ্নের উত্তরে বলি, ‘দেখো তোমরা যে বলছো দেশে ফেরত যাবে কিনা, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। তোমরা তাকে যদি এই দেশে জামাই আদরেও রাখো তাহলেও সে থাকবে না। মালেক ভাই সম্পর্কে যদ্দুর জানি তা ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাকে বলি। বলি, আমিও সেই পত্রিকার নিয়মিত কলাম লেখক। ফোন রেখে দেই। ক্ষণিক বাদে দেখি লাগেজ হাতে শিহাব হাসিমুখে এগিয়ে আসছে। মালেক ভাই, ভাবী বারবার ধন্যবাদ জানান, আর আমার সংকোচে সংকুচিত হবার দশা। বুঝুন সব কিছু ঠিক থাকার পরও সবুজ পাসপোর্টের কী অহেতুক হেনস্তা।
৫) কোন দেশের পাসপোর্টের মর্যাদা কতটুকু এই নিয়ে প্রতি বছর একটি ‘গ্লোবাল পাসপোর্ট ইনডেক্স‘ তৈরী করা হয়। এই বিচার্যে শীর্ষে রয়েছে,না সুইজারল্যান্ড নয়, নয় ইউরোপের কোন দেশ। এই স্কোরে শীর্ষে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সিঙ্গাপুরের পাসপোর্ট। আমেরিকার পাসপোর্ট নেমে এসেছে এই বছর ৯ম স্থানে। তৃতীয় স্থানে রয়েছে ডাচ পাসপোর্ট। এই দেশটির পাসপোর্ট জার্মানি, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, সুইডেন এবং অস্ট্রেলিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশের সাথে একই স্থান ভাগ করে নিয়েছে। কানাডার অবস্থান ৮ম স্থানে। ডাচ পাসপোর্টধারীরা আমেরিকা, ব্রিটেন সহ ১৩১টি দেশে ভিসা ছাড়া যেতে পারেন এবং বাংলাদেশ সহ আরো ৪৩টি দেশে ‘অন–অ্যারাইভাল ভিসা’ পেতে পারেন। বাংলাদেশের পাসপোর্টের অবস্থান গ্লোবাল ইনডেক্সে একেবারে খারাপ নয়। বিশ্বে বাংলাদেশের পাসপোর্টের র্যাঙ্ক ৯২, যা দিয়ে ৪৮টিরও বেশি দেশে প্রবেশের সুযোগ পাওয়া যায়। অন্যদিকে, আফগানিস্তানের অবস্থান ৯৬ স্থানে এবং ভিসা ছাড়া আফগান পাসপোর্টধারীরা কেবল তিনটি দেশে প্রবেশ করতে পারে। গ্লোবাল পাসপোর্ট ইনডেক্স অনুযায়ি, সিরিয়া, ইরাক, সোমালিয়া এবং পাকিস্তানের পাসপোর্টের অবস্থান বিশ্বে একেবারে তলানীতে। গ্লোবাল সিটিজেন সল্যুশন নামের এক ওয়েবসাইটে জানা যায়, বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীরা ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, বার্বাডোস, বাহামাস, ডোমিনিকা, ফিজি, ফেডারেল স্টেটস অফ মাইক্রোনেশিয়া, গ্রেনাডা এবং গাম্বিয়ার মতো দেশগুলোতে ভিসা–মুক্ত এবং ‘অন–অ্যারাইভাল‘ ভিসার সুবিধা পান। তবে, বাংলাদেশী পাসপোর্টধারীদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, চীন, জাপান এবং অ্যান্ডোরা সহ প্রায় ১১৬টি গন্তব্যে প্রবেশের জন্য ভিসার প্রয়োজন হয়। অনেকের প্রশ্ন– কীসের উপর ভিত্তি করে এই রেঙ্কিং করা হয়। মূলত এই র্যাঙ্কিংটি একটি গতিশীলতা স্কোরের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়, যা পরিমাপ করে পাসপোর্টধারীরা কতটা সহজে অন্য দেশে প্রবেশ করতে পারেন। এই স্কোরে সেইসব গন্তব্যস্থল আমলে নেয়া হয়, যেখানে ভিসামুক্ত প্রবেশ, অন–অ্যারাইভাল ভিসা, ইলেকট্রনিক ট্র্যাভেল অথরাইজেশন, অথবা তিন দিনের মধ্যে ইস্যু করা ই–ভিসা পাওয়া যায়। সে যাই হোক না, আমাদের দেশের সবুজ পাসপোর্ট আমাদের গর্বের। আমাদের সবার দায়িত্ব এই পবিত্র আমানতটির মর্যাদা রক্ষা করা। (১২–৮–২০২৬)।
লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্যিক, কলামিস্ট।












