হল্যান্ড থেকে

বিশ্বখ্যাত ‘কৈকেনহফ’ ফুলের উৎসব : সুখে হোক কিংবা দুখে, ফুল আমাদের নিত্যসঙ্গী

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া | শনিবার , ৯ মে, ২০২৬ at ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ

ফুল প্রসঙ্গে ভিক্টর হুগো ১৮৬২ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত লা মিজারাবলে‘ (Les Miserables) উপন্যাসে বলেছেন– ‘A garden to walk in and immensity to dream in–what more could he ask? A few flowers at his feet and above him the starsবাংলায় কথাটাকে এইভাবে বলা যায়– ‘হাঁটার জন্যে একটি বাগান, আর স্বপ্ন দেখার জন্যে বিশালতাএর চেয়ে বেশি সে আর কী চাইতে পারে? তাঁর পায়ের কাছে কয়েকটি ফুল এবং মাথার উপরে তারারা।অন্যদিকে জাপানি পণ্ডিত ও শিল্প সমালোচক, ওকাকুরা কাকুজো ফুলকে দেখেছেন এই ভাবে -‘সুখে হোক কিংবা দুঃখে, ফুল আমাদের নিত্যসঙ্গী। কথাগুলি কতটা সত্যি তা আমরা আমাদের দৈনন্দিন কার্যকলাপের দিকে লক্ষ্য করলে টের পাই। সুখের দিনে প্রিয়জনকে আমরা ফুল উপহার দেই, আনন্দে উৎসবে ফুলের সমারোহ দেখা যায়। বিয়ে বাড়ি, মেলায়, পূজাপার্বণে। আবার তেমনি দুঃখের দিনে আমরা ফুল দেই সমাধিতে, প্রিয়জনের চিরবিদায়ের দিনে। ফুল ভালোবাসে না তেমন কাউকে কি খুঁজে পাওয়া যাবে? আমার ধারণা তেমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবেনা। আর কেবল এই ফুলকে ভালোবেসেই ফিবছর লক্ষ লক্ষ ফুলপ্রেমীপর্যটক বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ছুটে আসেন উত্তর সাগর পাড়ের অর্থনৈতিকভাবে অতি উন্নত দেশ, হল্যান্ডে। তারা আসেন বিশ্বখ্যাত কৈকেনহফফুলের উৎসবে সামিল হতে, উপভোগ করতে। আজ থেকে ৪৫ বছর আগে ১৯৮১ সালে ভারত থেকে ছুটে এসেছিলেন হিন্দী চলচ্চিত্রের অত্যন্ত সফল নির্মাতা, ইয়াশ চোপড়া তার সিলসিলাছায়াছবির বিখ্যাত রোমান্টিক গানের দৃশ্য ধারণ করতে। দৃষ্টিনন্দন কৈকেনহফেনানা ফুলের মাঝে ঘুরে বেড়িয়ে নায়ক অমিতাভ বচ্চন নায়িকা রেখার সেই মন ছুঁয়ে যাওয়া গান– ‘দেখে এক খাবতো সিলসিলে হুয়ে–‘ এখনো আমাদের নস্টালজিক করে তোলে। হল্যান্ডে বসবাসকারী বাঙালিরা, এমন কী দেশ এবং য়ুরোপআমেরিকাকানাডা থেকে হল্যান্ড বেড়াতে আসা বাঙালিরা কৈকেনহফের টিউলিপ ফুলের মেলায় সিলসিলাস্টাইলে নেচে গেয়ে ছবি, ভিডিও তৈরী করেন। এসবই ফুলকে ভালোবেসে করা।

কৈকেনহফে আমার প্রথম যাওয়া ১৯৯০ সালে, আজ থেকে ৩৬ বছর আগে। সে বছরই আমার হল্যান্ড আসা। এরপর আরো বার কয়েক যাওয়া হয়েছে। দেশ কিংবা ইউরোপ থেকে নিকটজন বছরের ওই সময়টায় এলে তাদের নিয়ে সেখানে যাওয়া হয়। মজার ব্যাপার হলো দৈনিক আজাদীতেআমার লেখালেখির শুরু ১৯৯০ সালে এবং প্রথম লেখাটা লিখেছিলাম কৈকেনহফে ফুলের উৎসবকেনিয়ে। আমার সেই প্রথম লেখা থেকে কিছু অংশ পাঠকদের জন্যে উদ্ধৃতি করার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না – ”সারি সারি ফুলের বাগান। নানা বর্ণ, নানা গন্ধের ফুল কাছে ডেকে এনেছে নানা দেশের নানা বর্ণ, নানা গোত্রের মানুষকে। নারীপুরুষযুবাবৃদ্ধবৃদ্ধাশিশুখোঁড়া, এমনকী দুচোখ হারিয়েছে তেমন অনেক দর্শনার্থী এসেছেন হল্যান্ডের কৈকেনহফ ফুলের উৎসবে, ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। কেবল দৃষ্টি দিয়ে নয়, অন্তর দিয়ে, অনুভূতি দিয়ে। সৌন্দর্য উপভোগ করতে তো আর দৃষ্টির প্রয়োজন পড়ে না।লেখাটি শেষ করছিলাম এই ভাবে -”ফুলের উৎসবে আলাপ হলো ইংল্যান্ড থেকে আসা এক ইংরেজ মহিলার সাথে। প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানালেন, ‘প্রতি বছর কৈকেনহফ ফুলের উৎসব তাকে চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে আসে। কেন জানো? তিনি নিজেই প্রশ্ন করলেন। এখানেই আমি আমার ভালোবাসার পাত্রকে যেমনি খুঁজে পেয়েছিলাম, ঠিক তেমনি আবার হারিয়েও ফেলি। প্রতিবছর আমি আসি যদি তার দেখা পাই এই আশায়,’ –বলে আমার দিকে না তাকিয়ে বিদায় নিলেন সেই মহিলা।অনুমান করি এদ্দিন সেই আধবয়েসী ইংরেজ মহিলা হয়তো আর বেঁচে নেই। জানিনে তিনি তার হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার ধনটিকে খুঁজে পেয়েছিলেন কিনা। দৈনিক আজাদীর এই পাতায় ৩৬ বছর আগে প্রকাশিত এই প্রথম লেখাটি পরবর্তীতে আমার ইউরোপ থেকেগ্রন্থে ঠাঁই পেয়েছিল। সেটিই আমার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। বইটি প্রকাশ করেছিলেন সাংবাদিক বন্ধু ওসমান গনি মনসুর, তার নিজস্ব প্রকাশনা সংস্থা থেকে, নিজস্ব অর্থায়নে। বন্ধু মনসুরের কাছে ঋণী। গ্রন্থটির পরিকল্পনা ও বিন্যাস করেছেন বন্ধু শফিকুল আলম খান ও এনায়েত হোসেন। প্রচ্ছদ করেছেন দীলিপ মন্ডল। সে ১৯৯৯ সালের কথা। যাই হোক

ফ্রান্সের যেমন আইফেল টাওয়ার‘, নিউ ইয়র্কের স্ট্যাচু অফ লিবার্টিকিংবা রোমের কলোসিয়াম‘, ঠিক তেমনি হল্যান্ড বলতে চোখের সামনে যা প্রথমে ভেসে আসে তাহলো টিউলিপ। এই টিউলিপ ফুলকে ঘিরে ফিবছর হল্যান্ডে আয়োজন করা হয় ফুলের উৎসব, যা কৈকেনহফ‘ (Keukenhof) নামে পরিচিত। এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো কিচেন গার্ডেনযা বাংলায় দাঁড়ায় রান্নাঘরের বাগান। কৈকেনহফ গার্ডেন অফ ইউরোপহিসাবেও পরিচিত। বিশ্বখ্যাত এই ফুলের উৎসবের ব্যাপ্তি এতো বিশাল ও চমকপ্রদ যে বলে কয়ে এর সৌন্দর্য বর্ণনা করা সম্ভব নয়। বছরের মাত্র দুই আড়াই মাস এই ফুলের উৎসব চলে, ১৯ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত। মোট ৭৯ একর (৩২ হেক্টর) খোলা জায়গায় গড়ে উঠে কৈকেনহফ। চারিদিকে নানা বর্ণের, নানা আকৃতির টিউলিপ তাদের রূপ সৌন্দর্য মেলে ধরে হল্যান্ড সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ফুলপ্রেমিকদের তৃপ্তি দেয়। ফুলের মধ্যে টিউলিপের প্রাধান্য হলেও আরো যে সমস্ত ফুলের সারি চোখ মন জুড়ায় তা হলো হায়াসিন্ট, ডেফোডিল, লিলি, গোলাপ, কার্নেশন, আইরিশ ইত্যাদি। এ ছাড়াও রয়েছে নানা প্রজাতির ছোটবড় গাছ। হেগ শহর থেকে ২০/২২ কিলোমিটার দূরে লিসে (Lisse) নামক ছাঁয়াঘেরা এক এলাকায় এই বাগানে প্রতি বছর ৭০ লক্ষ ফুলের বাল্ব‘ (bulb) রোপণ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, গেল বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে হল্যান্ড সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ১০ লক্ষ ৪০ হাজার দর্শনার্থী কৈকেনহফে আসেন ফুলের মেলা উপভোগ করার জন্যে। তার অর্থ প্রতিদিন ২৬,৫০০ দর্শনার্থী এখানে এসেছিলেন। হল্যান্ডের আর দুটি নামকরা দর্শনীয় স্থান হলো হল্যান্ড রাইক্স মিউজিয়াম এবং এফটেলিং বিনোদন পার্ক। এখানে প্রতিদিন গড়ে যথাক্রমে ৮ হাজার এবং ১৪ হাজার দর্শনার্থী আসেন। কৈকেনহফে মোট দর্শনার্থীর প্রায় ৪০% ভাগ আসেন জার্মানি, যুক্তরাজ্য ও বেলজিয়াম থেকে। ডাচ দর্শনার্থীর সংখ্যা হলো ২০% শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসেন ১০% শতাংশ। ফুলের উৎসবে ঘুরে বেড়ালে দর্শনীয়ভাবে চোখে পড়বে চীন থেকে আসা দর্শনার্থী। এরা সাধারণত দলবদ্ধ হয়ে ঘুরেন, কথা বলেন উচ্চস্বরে অন্যের বিরক্তি উৎপাদন করে, সাথে থাকেন স্থানীয় চাইনিজ ইন্টারপ্রেটার, তার হাতে থাকে উঁচু করে তুলে ধরা একটি কাপড়, যা লোকজনের ভিড়েও চোখে পড়ে যাতে দলের কেউ হারিয়ে না যায়। ফুলের বাগানে যে কেবল ফুলের মেলা তা নয়। এখানে রয়েছে বিশালাকৃতি গাছ ছাড়াও কৃত্রিম জলাশয়, ঝর্ণা, ক্লান্ত দর্শনার্থী যাতে খানিক বিশ্রাম নিতে পারেন তার জন্যে রয়েছে কাঠ ও পাথরের বেঞ্চ, রয়েছে রেস্টুরেন্ট, এক্সিবিশন হলঘর। টিউলিপ বাগান ছাড়াও কৈইকেনহফে আরও হরেক ধরনের বাগান রয়েছে। ইংলিশ ল্যান্ডস্কেপ গার্ডেনে রয়েছে আঁকাবাঁকা পথ এবং অপ্রত্যাশিত স্বচ্ছ দৃশ্য। আছে গুল্ম এবং বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদের সাথে কন্দজাতীয় উদ্ভিদ এবং জাপানি কান্ট্রি গার্ডেন। রয়েছে চারটি প্যাভিলিয়নে পর্যায়ক্রমিক ফুলের প্রদর্শনী। গোটা এলাকাটা এত বিশাল যে একদিনে দেখা কোনভাবেই সম্ভব নয়। যদিওবা কখনো হল্যান্ড বেড়াতে বা কাজে আসেন, চেষ্টা করবেন বছরের এই সময়টা যেন আসেন, তাতে ‘রথ দেখা কলা বেচা’ দুটোই সম্ভব হবে। (২৯২০২৬)

লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কলামিস্ট

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রসঙ্গ : অসাম্প্রদায়িক ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন
পরবর্তী নিবন্ধপানিতে ডুবে ধান, জোঁকের ভয়ে মাঠে নামছেন না কৃষক