স্মরণ : অধ্যাপক লোকমান হাকিম

এম নাসিরুল হক | সোমবার , ১০ আগস্ট, ২০২৬ at ১১:১২ পূর্বাহ্ণ

সরকারি চাকরির মাধ্যমে মানুষ যখন গাড়ি বাড়ি এবং স্বাচ্ছন্দ্য জীবনের আশায় দিন কাটায়, সে রকম সুযোগ পাওয়ার পরও মানুষের ভালোবাসার ডাকে সেই লোভনীয় চাকরিতে আচ্ছন্ন করতে পারেনি তিনি হচ্ছেন অধ্যাপক লোকমান হাকিম।

সাধারণ জীবন যাপন, অমায়িক ব্যবহার এবং সৌজন্যবোধে আবর্তিত একজন। তিনি ছিলেন রাউজানের প্রতিটি জনপদে পথচলা এবং সকলের গ্রহণযোগ্য একজন মানুষ। বছর ঘুরে আবার এসেছে ১০ই আগস্ট। রাউজানের প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ অধ্যাপক লোকমান হাকিমের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী।

রাউজান আর আর এ সি মডেল হাইস্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন, চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আই এসসি, বিএসসি অনার্স এবং ঢাকা বিশ্বাবদ্যালয় থেকে পদার্থ বিদ্যায় এমএসসি পাশ করে অধ্যাপনা জগতে প্রবেশ করেন চট্টগ্রাম সিটি কলেজের মাধ্যমে। মাঝে তিনি কিছুদিন চট্টগ্রাম মহিলা কলেজ (এনায়েত বাজারে অবস্থিত) ও অধ্যাপনা করেন। চট্টগ্রাম কলেজে পড়াকালীন সময়ে তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত হন।

চট্টগ্রাম কলেজে তখন শিক্ষা, শান্তি, প্রগতির মন্ত্রধারী ছাত্র সংগঠনের নাম ছিল যাত্রিক। তিনি এক সময় যাত্রিকের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে অর্থাৎ ১৯৬৮৬৯ সালে তিনি জাতীয় রাজনীতিক তোফায়েল আহমদ, আবদুর রাজ্জাক, মতিয়া চৌধুরীদের সাথেও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ৬৮৬৯ গণআন্দোলনে ভূমিকা রাখেন। ঐ সময় তিনি এস এম হলের ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন।

জনাব লোকমান হাকিম ১৯৭০ সালে দৈনিক আজাদী সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের সান্নিধ্যে আসেন, ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পরে রাউজান থানা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের কাজে সহযোগিতা করেন। ১৯৭০ এর জাতীয় নির্বাচনে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হলে তিনি লোকমান হাকিমকে তাঁর প্রধান নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব দেন। জনাব লোকমান সেই সময় রাউজানের ১৪টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মেম্বার এবং আওয়ামী লীগের সমর্থকদের মধ্যে যোগ সাজশের ভূমিকা পালন করেন। ঐ নির্বাচনে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের স্পীকার জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করেন। নির্বাচনে জয়ী হবার পর লোকমান হাকিম অধ্যাপক খালেদ সাহেবের অত্যন্ত প্রিয়জন হিসেবে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেন।

১৯৭১ এর শুরু থেকে রাজনৈতিক অবস্থা যখন উত্তপ্ত হতে থাকে তখন লোকমান হাকিম রাউজানের অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে পাকিস্তানী জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলায় প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেন।

১৯৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি কিছুদিন রাউজানে অবস্থান করে যুবকদের যুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে ভারত প্রেরণের কাজে সহযোগিতা করেন এবং আগস্টের দিকে তিনি নিজেও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে এক সম্মুখযুদ্ধে ইয়াছিন নগরের আরো উত্তরে কচুপাড়ায় পাকিস্তানীদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ কালে ডাবুয়ার আবু জাফর চৌধুরী শহীদ হন।

দেশ স্বাধীন হবার পর অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ লোকমান হাকিমের নেতৃত্বে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির সহযোগিতার জন্য কমিটি গঠন করে দেন। সেই সময় লোকমান হাকিম তার সহকর্মীদের নিয়ে প্রত্যেক ইউনিয়নে আলাদা আলাদ কমিটি করে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বাঁশ, টিনসহ অন্যান্য সামগ্রী সুচারুভাবে বিতরণ করেন।

১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হয়ে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ সংসদীয় নির্বাচনে অংশ নিলে তিনি লোকমান হাকিমকে আবারো তার নির্বাচন পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব দেন। সেবারও অধ্যাপক খালেদ জয়ী হন।

অধ্যাপক খালেদের পক্ষে আন্তরিকতার সাথে কাজ করার ফলে জনাব লোকমান হাকিমের গ্রহণযোগ্যতাও জনগণের কাছে আরো বেড়ে যায়। রাউজানের সকল উন্নয়নের সহযোগিতায় বিশেষ করে পানি ধরে রাখার মাধ্যমে বোরো চাষের ব্যবস্থা করেন। জমির মালিক, শ্রমিক এবং মূলধন সহযোগীদের একত্র করে তেভাগা আন্দোলনের সূচনা কাজেও লোকমান হাকিম ভূমিকা রাখেন। রাউজানের বড় হাসপাতাল নির্মাণেও লোকমান হাকিমের ভূমিকা রয়েছে।

লোকমান হাকিম দীর্ঘদিন রাউজান থানা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। অধ্যাপক খালেদের সহযোগিতায় লোকমান হাকিম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মুক্তির পথে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে সঞ্চয়ী হবার এবং উন্নয়ন কাজে অংশগ্রহণের উৎসাহ প্রদান করেন। অধ্যাপক লোকমান হাকিম বাংলাদেশের প্রথম বিসিএস এ (১৯৭৩ সালে) উত্তীর্ণ হয়ে বিডিআর এ সহকারী পরিচালক হিসেবে পদায়ন হয়েছিলেন। বিষয়টি অধ্যাপক খালেদকে জানানো হলে তিনি বলেন, ‘আপনারা রাজনীতি করবেন, নেতা হবেন, মানুষকে চাকরি দেবেন, সমাজের জন্য কাজ করবেন। এটাইত শিক্ষিত মানুষের কাজ।’ তিনি বারণ করায় লোকমান সাহেব আর চাকরিতে যোগদান করেননি।

আমার সাংবাদিক হওয়ার ব্যাপারে অধ্যাপক লোকমান হাকিমের সহযোগিতা ছিল। অধ্যাপক লোকমান হাকিম ‘দিন বদলের পালা’ হেডিং এ দৈনিক আজাদীতে কয়েকবছর উপসম্পাদকীয় লেখেন। পরবর্তীতে তিনি দৈনিক পূর্বকোণে ‘মাটি ও মানুষ’ নামে জীবন পরিবর্তনসূচক উপসম্পাদকীয় লিখে জনগণের প্রশংসা অর্জন করেন। ২০২৪ সালে ‘আঁধার পেরিয়ে আলোয়’ নামে তার লেখার একটি সংকলন বের করা হয়।

এরশাদের শাসনামলে তিনি উপজেলা চেয়ারম্যানের পদে প্রতিযোগিতা করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরশাদের শাসনামলের সমাপ্তি ঘটলে ৯১ এর পর তিনি কুমিল্লায় স্থানান্তরিত হন। সেখানে তিনি তাঁর পূর্বের পরিচিত প্রশিকা’র লোকজন নিয়ে ‘দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং লিঙ্গ সমতা’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সেই সংগঠনকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালিত করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জনগণের জন্য কাজ করেন।

নিবেদিত প্রাণ অধ্যাপক লোকমান হাকিম পরজীবনেও সম্মান এবং শান্তি লাভ করুন এই প্রার্থনা রইল মহান আল্লাহর দরবারে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কতোটা সহায়ক!
পরবর্তী নিবন্ধকেবল সবুজ নয়, চাই জীবন্ত প্রকৃতি