সমপ্রতি টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে চট্টগ্রাম শহরে হওয়া জলাবদ্ধতা ও বন্যা কবলিত বাঁশখালি, সাতকানিয়া, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থানের কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিগুলো দেখে প্রথমে মনে হবে এগুলো স্যাটেলাইট ইমেজ বা উঁচু কোনো স্থান থেকে তোলা। ছবিতে দেখা যায় জলাবদ্ধতায় পুরো চট্টগ্রাম নগরই অথৈ পানিতে পূর্ণ কেবল ফ্লাইওভার আর উঁচু স্থান ছাড়া, আর বাঁশখালি সাতকানিয়ায় ঘরের ছাদ সমান পানিতে মানুষজন আটকা পড়ে আছে। ছবিগুলোর সোর্স যাচাই–বাছাই ছাড়া অনেকে সেগুলো বিশ্বাস করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, হাতাশা ও মানসিক অশান্তি প্রকাশ করেছিল। সেরকমই একজন সাংবাদিকের শেয়ার করা পোস্টকে ‘দ্যা ডিসেন্ট’ নামে এক ফ্যাক্ট চেকিং প্লাটফর্ম চ্যালেঞ্জ করে দেখায় ছবিটি আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই জেনেরেটেড। এভাবে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বিষয়ে এআই প্রযুক্তিকে নেতিবাচক ব্যবহারে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে, ফলে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন সমস্যা।
সংবাদমাধ্যম ও তথ্য প্রবাহে এআই প্রযুক্তি আশীর্বাদ স্বরূপ এ কথা বলাবাহুল্য। এর মাধ্যমে এখন যেকোনো তথ্য–উপাত্ত সহজে সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে। তথ্যের প্রকৃত সূত্র বা রেফারেন্সও সংরক্ষণের সাথে তথ্যকে চাইলে যেকোনো গ্রাফ বা চিত্রের মাধ্যমে সহজে বোধগম্য ভাবে উপস্থাপন করা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই প্রযুক্তি গণমাধ্যমে সঠিক ও নির্ভুল তথ্য উপস্থাপন, প্রকাশ ও প্রচারকে গুরুত্ব দিয়ে সাধারণ মানুষের গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে সহায়ক।
কিন্তু এই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অবাধ তথ্য প্রবাহে বাধা দেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। দেশের বেশিরভাগ মানুষের মাঝেই এআই প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেই। ফলে এর ইতিবাচক বা নেতিবাচক ব্যবহার কোনোটিই সম্পর্কে তাদের ভালো ধারণা নেই। এতে করে অসৎ উদ্দেশ্যে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সৃষ্ট বিভ্রান্তিকর সংবাদ, বিকৃত উদ্ধৃতি, মিথ্যা তথ্য বা ছবি দিন দিন মানুষের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে। কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা সংবাদ তা বুঝায় যেন কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর উদ্দেশ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমের আদলে বানানো বিকৃত উদ্ধৃতিযুুক্ত ভুয়া ফটোকার্ডের সংখ্যা এক্ষেত্রে বেশি। অথচ এই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সংবাদের সত্যতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করা, তথ্য যাচাই ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য বের করা ও পক্ষপাতহীন গণমাধ্যম চর্চার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বোত্তম ব্যবহার করা যেত।
সামপ্রতিক সময়ে অপপ্রচার, মিথ্যা ও ভুল সংবাদ, অপতথ্য ছড়ানো ঠেকাতে দেশীয় কয়েকটি প্লাটফর্ম কাজ করছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল The Dissent, Dismislab, Rumor Scanner, Fact Watch প্রভৃতি। এরা মূলত ফ্যাক্ট চেকিং এর পাশাপাশি ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশনের মাধ্যমে মিথ্যা সংবাদ, বিকৃত উদ্ধৃতি, ভাইরাল গুজব, ভুয়া খবর, এডিটেড ফটো/ভিডিও, রাজনৈতিক অপপ্রচার ও সামাজিক ভুয়া দাবি ডিবাঙ্ক, মিডিয়া প্রোপাগাণ্ডা তদন্ত, অপপ্রচারের নেটওয়ার্ক ট্রেসিং, বিদেশি/অও–জেনারেটেড কন্টেন্ট এক্সপোজ, অ্যাপ ও ওয়েবসাইটে ফ্যাক্ট–চেক স্টোরি প্রকাশ প্রভৃতি প্রতিরোধে নিয়মিত কাজ করে অল্প সময়ে বেশ সুনাম কুড়িয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অফ লিবেরাল আর্টসের মিডিয়া স্ট্যাডিজ এন্ড জার্নালিজম বিভাগের ফ্যাকাল্টি জুলকারনাইন বলেন, আমরা এমন এক কৃত্রিম সমাজের দিকে ধাবিত হচ্ছি যেখানে গণমাধ্যমের উপর মৌলিক ধারণার পরিবর্তন হচ্ছে এরূপভাবে, ‘কোনো ঘটনা যতক্ষণ না তা মিথ্যা প্রমাণিত হয় তা সত্য‘ থেকে ‘কোনো ঘটনা যতক্ষণ না তা সত্য প্রমাণিত হয় তা মিথ্যা বা গুজব’। বেশিরভাগ মানুষ মোবাইল স্ক্রিনে কয়েক সেকেন্ডের স্ক্রলে যা দেখছে তাই যাচাই–বাছাই ছাড়া বিশ্বাস করছে বা ধারণা পাচ্ছে। ফলে সামনের দিনে মানুষের মাঝে এক ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হবে, সন্দেহপ্রবণতা বাড়বে এবং সংবাদের ফ্যাক্ট চেকিং এর পরিবর্তে নিজেদের বদ্ধমূল বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উৎসের সন্ধানে ঝুঁকে পড়বে। এছাড়া এআই প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা পরিহার করে সংবাদ, ছবি বা ভিডিও প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে জানিয়ে দেওয়া জরুরি। তিনি সতর্ক করেন যে, ডিপফেইক বিরোধী নিয়মগুলো কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার যেকোনো সরকার সাংবাদিকতা ও ভিন্নমত দমনের কাজে অপব্যবহার করতে পারে। জুলকারনাইন মনে করেন, বর্তমান মিডিয়া সাক্ষরতা কর্মসূচীগুলোর আধুনিকায়ন প্রয়োজন, যাতে মানুষ কনটেন্টের উৎস ও প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন করতে শিখতে ও জানতে পারে।
এভাবে সংবাদ প্রচারে বর্তমান প্রজন্মে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বোত্তম ব্যবহারের কার্যকর ফলাফল সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মাঝে একটা ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেওয়া যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে প্রতিটি ব্যবহারকারীর আরো সজাগ ও সচেতন থাকা জরুরি। এতে নানাবিধ বিভ্রান্তি, গুজব, মিথ্যা প্রপাগাণ্ডা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ন্যারেটিভ প্রচার রোধ করা সম্ভব হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক।











