স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেছেন, বর্তমান সরকার দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে চায়। শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা কথার ফুলঝুরি নয়, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান করতে চায় সরকার। গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের (চমেক) শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, গত দেড় দশকে স্বাস্থ্য খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও পরিকল্পনার অভাব ও দুর্নীতির কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলেনি। গত ১৫ বছরে অপরিকল্পিতভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা, দুর্নীতি এবং সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে দেশের অনেক সরকারি হাসপাতালে কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা যন্ত্রপাতি অচল অবস্থায় পড়ে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের উদাহরণ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ঐতিহ্যবাহী একটি প্রতিষ্ঠান। এটি বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল কলেজে ৫০টির মতো অধ্যাপক পদ এবং সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক পদে আরো ১৫০টি পদ শূন্য রয়ে গেছে। এটা দীর্ঘদিনের অবহেলার একটি চিত্র। আমাদের স্বাস্থ্য সমস্যাটা সামগ্রিক দিক থেকে দেখতে হবে। এই সংকটের মধ্যেই প্রতিদিন প্রায় পঁঁচ হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন, যেখানে হাসপাতালের ধারণক্ষমতা মাত্র ২ হাজার ২০০ শয্যার। একইসঙ্গে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে বেসিক সায়েন্সের শিক্ষকেরও তীব্র সংকট রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের সরকারি হাসপাতালে রোগীর তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা এখনো অনেক কম। তাই স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে দ্রুত চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের পাশাপাশি বিদ্যমান সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনো হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায় ১০ বছর আগে কেনা যন্ত্রের মোড়কও খোলা হয়নি। কোথাও যন্ত্র আছে, কিন্তু চালানোর জন্য প্রশিক্ষিত মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নেই। আবার কোথাও যন্ত্র থাকলেও রিএজেন্ট বা এঙ–রে প্লেটের অভাবে তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতের সংকট কেবল ভবন নির্মাণ বা নতুন মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দূর করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা। চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিস্টের সমন্বিত টিম ছাড়া আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, বিগত প্রায় ২০ বছর ধরে এই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো যে অবহেলার শিকার হয়েছে, দেশের জনগণ যে বঞ্চনার শিকার হয়েছে, সব সেক্টরে, সব প্রতিষ্ঠানে যে সংকট তৈরি করা হয়েছে, সেই পুঞ্জীভূত সমস্যার সমাধানে সরকার কাজ করছে।
তিনি বলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ৫ মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা দিন–রাত নিরলসভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছি কীভাবে দেশের মানুষকে একটু স্বস্তি দেওয়া যায়, মানুষের জন্য একটু ভালো কিছু করা যায়। তার মধ্যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সে কারণে এবারের বাজেটে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ স্বাস্থ্য খাতে দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন সিটি মেয়র ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন এবং সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান। বক্তব্য রাখেন চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন।
চমেক কিডনি রোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. ফয়েজুর রহমানের সঞ্চালনায় সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন হৃদরোগ বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইফতেখারুল ইসলাম। বক্তব্য রাখেন কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. আবদুর রব, সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মাসুদ করিম, হৃদরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. ইব্রাহিম চৌধুরী, কলেজের ৬৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাইদুল ইসলাম ইমন, ৩৬তম ব্যাচের (বিডিএস) শর্মী বড়ুয়া ও ৬৪তম ব্যাচের মোহাম্মদ নাজমুল সাকিব।
সভায় মেডিকেল কলেজের শিক্ষক–শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দাবি তুলে ধরেন। তারা চট্টগ্রামে একটি পূর্ণাঙ্গ ডেন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা এবং চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ‘চিকিৎসক নিরাপত্তা আইন’ প্রণয়নের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রতিমন্ত্রী এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন। মতবিনিময় সভা শেষে প্রতিমন্ত্রী চমেক হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি রোগী ও তাদের স্বজনদের সাথে কথা বলেন।












