সোহেল ও তার স্ত্রীর বিচার শুরু

আমি শুধু বাচ্চাটারে দুই টুকরো করেছি, ধর্ষণ করছে, মারছে ডলার : আদালতে সোহেল আরেকজনকে জড়িয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টায় সোহেল : পুলিশ

আজাদী ডেস্ক | মঙ্গলবার , ২ জুন, ২০২৬ at ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী স্কুল ছাত্রী রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দুই আসামি সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন ঢাকার একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। গতকাল সোমবার শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে আজ মঙ্গলবার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে। এদিন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা সাক্ষ্য দেবেন। খবর বিডিনিউজের। এদিকে রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার মামলার প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা এখন দায় চাপাচ্ছেন ডলার নামে এক ব্যক্তির ওপর। সোহেলের ভাষ্য, তিনি শুধু রামিসাকে দুই টুকরো করেছেন। ধর্ষণ এবং হত্যা করেছে ডলার নামের মিরপুরের সেই ধনাঢ্য ব্যক্তি। আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার পথে সোহেল সাংবাদিকদের উদ্দেশ্য করে ডলারের বিষয়ে কথা বলেন। আর পুলিশ বলছে, আরেকজনকে জড়িয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে সোহেল। ১৯ মে দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সেই ঘটনা সারা দেশে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়। পুলিশ বলেছে, ওইদিন সকালে পাশের ফ্লাটের বাসিন্দা ৩২ বছরের সোহেল শিশুটিকে গলা কেটে হত্যার পর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরপর ফ্ল্যাটের সাবলেট এই ভাড়াটে গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘরেই ছিল। পুলিশ বাসা থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। পরে সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

সেদিনই রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা করেন। আসামি সোহেল রানা দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। পাঁচ দিন তদন্ত করেই গত ২৪ মে দুজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান। দ্রুত বিচার শেষ করার জন্য সেদিনই মামলাটি বিচারের জন্য প্রস্তুত করা হয়।

অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য গতকাল সোহেলকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে এবং স্বপ্নাকে কাশিমপুর কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। তাদের ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। পরে শুনানির জন্য এজলাসে তোলা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য নিযুক্ত বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু অভিযোগ গঠনের পক্ষে শুনানি করেন। তিনি বলেন, শিশু রামিসা আক্তারকে বাসায় ডেকে নিয়ে বাথরুমে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়। রামিসাকে বেঁধে নির্যাতনের এক পর্যায়ে সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। পরে আসামি তাকে মৃত ভেবে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে শরীর থেকে গলা কেটে আলাদা করে। একই সঙ্গে বাথরুমের ভেতরেই তার হাতপা বিচ্ছিন্ন করা হয়।

তিনি বলেন, ঘটনার দিন ভুক্তভোগীর মা রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য ডাকাডাকি করলে তাকে খুঁজে পাননি। পরে একটি জুতা দেখতে পেয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। এ সময় আশপাশের লোকজন জড়ো হন। ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের দরজা খুললেও আসামিদের ফ্ল্যাটের দরজা না খোলায় সবার মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। পরে জানালা দিয়ে একজন ফ্ল্যাটের ভেতরে রক্ত দেখতে পান। এরপর দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, আসামি সোহেল রানা পালিয়ে গেছে। তার স্ত্রী তখন উপস্থিত লোকজনকে জানায়, তার স্বামী এমন ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে গেছে। পরে পুলিশ এসে তাকে গ্রেপ্তার করে এবং সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়, সকাল সাড়ে ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ আসামিদের অব্যাহতি চেয়ে শুনানি করেন। আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিয়ে আপত্তি জানান তিনি।

উভয়পক্ষের শুনানি নিয়ে বিচারক সোহেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পড়ে শোনান। এ সময় আদালতের অনুমতি নিয়ে কথা বলতে চান সোহেল রানা। তবে অনুমতি মেলেনি। পরে অপর আসামি স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ পড়ে শোনানো হয়। সেখানে বলা হয়, তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং রামিসাকে হত্যায় বাধা না দিয়ে রক্ত ও আলামত নষ্টে সহযোগিতা করেছেন, যা হত্যার অপরাধের সহায়তা হিসেবে গণ্য হয়।

পরে বিচারক স্বপ্না আক্তারের কাছে জানতে চান, তিনি নিজেকে দোষী মনে করেন কিনা। উত্তর দিতে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন স্বপ্ন। কাঠগড়ায় দাঁড়ানো স্বামী সোহেল রানাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, তুমি বলো আমি দোষী কিনা। এ সময় সোহেল রানা আদালতে দাবি করেন, স্বপ্না নির্দোষ।

শুনানি শেষে আদালত দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আজ মঙ্গলবার সাক্ষ্যগ্রহণের দিন রাখেন। পরে এজলাস ত্যাগ করেন বিচারক। এরপর কাঠগড়ায় একে অপরের সঙ্গে কথা বলেন সোহেল ও স্বপ্না। সোহেল তার স্ত্রীকে চিন্তা করতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, স্বপ্নার কোনো দোষ নেই। বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটের দিকে স্বপ্নাকে কাঠগড়া থেকে পুলিশি নিরাপত্তায় হাজতখানায় নেওয়া হয়। এ সময় স্বামী সোহেল রানার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন স্বপ্না। সোহেলও তাকে অভয় দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

স্ত্রী চলে যাওয়ার পর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সোহেল উপস্থিত আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, আমি ধর্ষণ করি নাই, শুধু লাশ কাটছি। ধর্ষণ করেছে ডলার নামে একজন। আমি পাপ করছি, আমাকে সেই পাপের শাস্তি দেন। সোহেল বলতে থাকেন, মেয়েটাকে এনে দিতে পারলে ডলার তাকে দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেছিল। এ সময় পুলিশ সদস্যরা তাকে থামিয়ে দেন।

আদালত থেকে নেওয়ার কারাগারে নেওয়ার পথে সোহেল সাংবাদিকদের উদ্দেশে জোরে জোরে বলতে থাকেন, মিরপুর১১ নম্বর লাইনে বাড়ি ডলারের। রামিসাকে ধর্ষণহত্যার মূল আসামি ওই ডলার। ধর্ষণও ডলার করছে, মারছেও ডলার। ওরে ধরেন আপনারা, সব পাবেন। তিনি বলেন, আমার ওয়াইফ আমাকে সাহায্য করেনি। আমার ওয়াইফের কোনো দোষ নাই। দোষ ডলারের আছে। আমার দোষ আছে, ডলারেরও দোষ আছে। আমি অত অপরাধী না। আমি শুধু বাচ্চারে দুই টুকরো করছি। ধর্ষণ করছে ডলার, মারছেও ডলার। আমার কোনো ডিএনএ টেস্ট নেয়নি। অটোমেটিক নিয়ে নিছে। ডলার আমাকে দুই লক্ষ টাকা দিছে। ডলার অনেক ধনী লোক, টাকাওয়ালা।

আরেকজনকে জড়িয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টায় সোহেল : রামিসা হত্যার ঘটনায় বিভ্রান্তি ছড়াতে এবং বিচারকাজ বিলম্বিত করতে আলোচিত এ মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা আরেকজনের নাম এনেছে বলে মনে করছে পুলিশ। এ হত্যার তদন্তে গিয়ে ঘটনাস্থলে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ছাড়া আর কারো অস্তিত্ব না পাওয়ার কথা আবারও বলেছে পুলিশ। পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির মনে করেন কৌশলে নজর আরেক দিকে সরাতেই সোহেল এখন এসব কথা বলতে পারে।

গতকাল আদালত থেকে কারাগারে নিয়ে যাওয়ার সময় আলোচিত এ মামলার অভিযুক্ত সোহেল রানা চিৎকার করে বলতে থাকেন, শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছেন ডলার নামের আরেক ব্যক্তি। সোহেলের এ দাবির বিষয়ে পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির বলেন, সেখানে সোহেল ও তার স্ত্রীর অস্তিত্বই পাওয়া গেছে তদন্তে। এখন বিচারকাজ বিলম্বিত ও বিভ্রান্ত করার জন্য সোহেল এসব কথা বলছে।

ডলার নামে কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা বিভিন্নভাবে নিশ্চিত হয়েছি ঘটনাস্থলে আর কেউ আসেনি। এখন সে (সোহেল) নিজেকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে এসব বলতে পারে। ও ভীষণ নৃশংস প্রকৃতির। একটা ছোট্ট শিশুকে কেটে টুকরো করে হত্যার পরও ওর মধ্যে কোনো অনুশোচনা এখনো আসেনি। যার কারণে ও খুব কৌশলে বিষয়টিকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে।

এখন ঘটনার মোড় অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য সোহেল নানা কথা বলছে দাবি করে ওসি বলেন, সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আমাদের স্পষ্ট করেছে যে ঘটনাস্থলে তার স্বামী ছাড়া আর কেউ আসেনি। সে এখন বিচারকাজকে বিলম্বিত করার জন্য বা ঘটনাটিকে অন্য দিকে নেওয়ার জন্য এসব করতে পারে। এ মামলায় ঘটনাস্থল থেকে সবরকম আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান ওসি।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ
পরবর্তী নিবন্ধঢাকায় ইসলামী ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ, পুলিশের টিয়ারশেল